রোহিঙ্গারা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ

শনিবার , ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ
35

সম্প্রতি ঢাকা গ্লোবাল ডায়লগ-২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা মিয়ানমারের লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এ অঞ্চলের জন্যও নিরাপত্তার হুমকি।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে সাত লাখই এসেছে ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার পর। মিয়ানমার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ায় দুই দফা চেষ্টা করেও রোহিঙ্গাদের কাউকে রাখাইনে ফেরত পাঠানো যায়নি। রোহিঙ্গা সঙ্কট ব্যাপকতার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরেছেন। রোহিঙ্গাদের অনিশ্চয়তা যে আঞ্চলিক সঙ্কটে রূপ নিতে যাচ্ছে সেটি গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও তুলে ধরেছিলেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে গেলে আমি মনে করি এই সমস্যার (রোহিঙ্গা) আশু সমাধান হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব সমপ্রদায়কে বিষয়টা অনুধাবন করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি।
সারা বিশ্ব আজ অবগত যে, শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করতে গিয়ে বাংলাদেশ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর আগমন, তাদের নিরাপত্তা বিধান ও পরিচর্যার জন্য বড় ধরনের কর্মযজ্ঞের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সীমাবদ্ধতা, সম্পদের স্বল্পতা, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা ও পরিকাঠামোগত স্বল্পতা এবং একই সঙ্গে শরণার্থী মোকাবিলার প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের উচ্চতম পর্যায় থেকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে বেশ কিছু সেক্টর চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চাপ মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, যার সাড়া ইতিমধ্যে মিলছে।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে মাত্রার অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে এবং শরণার্থীরা যেভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাংলাদেশও ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’, ‘গণহত্যা’ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে বিশ্বজনমত গড়ে উঠেছে, তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর ওপর নির্ভর করছে তার অগ্রগতি। আমরা মনে করি, শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সমপ্রদায়ের যুক্ততার বিষয়টি জরুরি। আন্তর্জাতিক তদারকি থাকলে শরণার্থী ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কিছুটা হলেও সহজ হবে। আমরা মনে করি, মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনার পাশাপাশি শরণার্থী ফিরিয়ে নেওয়া ও রোহিঙ্গা সমস্যার একটি কার্যকর সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের চাপ প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিষয়টি এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু স্থান সংকট ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে এলাকার পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য এতদিন চীন, ভারত ও রাশিয়ার প্রশ্রয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মনোযোগ দেয়নি মিয়ানমার। এবার জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে এবং সেখান থেকে ত্রিপাক্ষিক কমিটি করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হেয়েছে। সেটা আশার কথা। বর্তমান সময়ে ক্ষুদ্র একটি জাতিগোষ্ঠীর জাতিগত নিপীড়নের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যেহেতু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেহেতু মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা এখনই সময়। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো বিবেচনায় আনতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

x