রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার নেপথ্যে সিন্ডিকেট

ইকবাল হোসেন

সোমবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ
182

নির্বাচন কমিশনের ভোটার এন্ট্রি করা ‘১৫৫৭-৪৩৯১’ কোডের ল্যাপটপটি হারিয়েছে ২০১৫ সালে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমেত ল্যাপটপটি ৪ বছর আগে হারিয়ে গেছে দাবি করলেও চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিস থানায় সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত করেননি। হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপটি উদ্ধারেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি নির্বাচন অফিস। কিন্তু ওই ল্যাপটপ দিয়েই প্রায় দুই হাজারের অধিক রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে বলে সন্দেহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। ওই ল্যাপটপ দিয়েই নির্বাচন অফিসের কিছু কর্মচারী সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের ভোটার করে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। দুদক কর্মকর্তারা মনে করছেন, রোহিঙ্গা ভোটার হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নির্বাচন অফিস কেন্দ্রিক একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। রোববার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ও জেলা নির্বাচন অফিসে অভিযান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের লিডার সহকারী পরিচালক রতন কুমার বিশ্বাস বলেন, ২০১৫ সালে হারিয়ে যাওয়া ‘৪৩৯১’ কোডের ল্যাপটপ দিয়েই রোহিঙ্গা ভোটার করার অপকর্মগুলো হয়েছে। ওই ল্যাপটপের হদিস মিললে অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে। রোহিঙ্গা ডাকাত নুরু, লাকির মতো অসংখ্য রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে। তাদের ভোটার এন্ট্রি হয়েছিল ওই ল্যাপটপ দিয়েই। ওই ল্যাপটপ দিয়ে বেশ কয়েকটি থানার ভোটার করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ভোটার হওয়ার জন্য কমপক্ষে থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা ভোটার এন্ট্রি করার কথা। নির্বাচন অফিসের লোকজন জড়িত না থাকলে এতো বড় অপকর্ম হওয়ার সুযোগ নেই। এখন প্রাথমিক অনসুন্ধান চলছে। নির্বাচন অফিস থেকে আমরা কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছি। অধিকতর অনুসন্ধানের অনুমতির জন্য আমরা কমিশনে প্রতিবেদন দেব।
এসময় টিমের আরেক সদস্য উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরিফ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ল্যাপটপটি হারিয়ে গেছে বললেও সেটির জন্য থানায় সাধারণ ডায়েরি কিংবা উদ্ধারে কোন পদক্ষেপ নেয়নি নির্বাচন অফিস। আমরা সন্দেহ করছি ওই ল্যাপটপটি দিয়ে দুই থেকে আড়াই হাজারের কাছাকাছি রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছে। ওই ল্যাপটপ দিয়ে ‘মোস্তফা আলী’ নামের একমাত্র বাঙালি ভোটার হয়েছেন। তার বাড়ি বাঁশখালীতে। মোস্তফা আলীর এক আত্মীয় চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসে চাকরি করেন।
রোহিঙ্গা ভোটার হওয়ার নেপথ্যের অনুসন্ধানে রোববার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিসে অভিযান চালিয়েছে চার সদস্যের দুদক এনফোর্সমেন্ট টিম। অভিযানে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের সদস্যরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোহিঙ্গা ভোটার হওয়ার পেছনে চট্টগ্রাম ও কঙবাজার নির্বাচন অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মচারি জড়িত। ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে একেকজন রোহিঙ্গাদের ভোটার করা হয়েছে। নজিবুল নামের এক দালালের মাধ্যমে কঙবাজার নির্বাচন অফিসের এক অফিস সহায়ক ভোটার হতে ইচছুক রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রাম নির্বাচন অফিসে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠান। চট্টগ্রাম অফিসের এক অফিস সহায়ক রোহিঙ্গাদের ভোটার করার পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী ওই অফিস সহায়কের পেছনে ৫ জন অস্থায়ী কর্মচারিও কাজ করে।
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ল্যাপটপ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো ২০১৫ সালের। তখন আমরা দায়িত্বে ছিলাম না। চন্দনাইশ ও পাঁচলাইশের কয়েকটি ল্যাপটপ হারিয়েছে। চন্দনাইশে হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপের বিষয়ে থানায় জিডি করা হয়েছিল। পাঁচলাইশের ল্যাপটপ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জেনেছি পরে। এখন রোহিঙ্গারা ভোটার হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসায় নির্বাচন কমিশন থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলবে তাদের বিরুদ্ধে কমিশন নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৫ সালে কয়েকটি ল্যাপটপ মিরসরাই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ওইখানে হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপটিও ছিল। ওইসব ল্যাবটপ বহন করেছিল মোস্তফা ফারুক নামের আমাদের অস্থায়ী একজন টেকনিক্যাল এঙপার্ট।’
পরে দৈনিক আজাদীর পক্ষ থেকে সেই মোস্তফা ফারুকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মিরসরাইয়ে যে ল্যাপটপ নেয়া হয়েছিল তার অফিস আদেশ সংরক্ষিত রয়েছে। ওই সময় ‘৪৩৯১’ কোডের ওই ল্যাপটপটি সেখানে ছিল না। তাছাড়া সাবেক জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের গঠিত কমিটি বিষয়টি তদন্ত করছেন। খোরশেদ আলম স্যার তদন্তের জন্য জেলা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীনকে ডেকেছিল। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার পেছনে কারা জড়িত, জেলা অফিসের সবাই জানে। কেউ ভয়ে মুখ খুলে না।’
রোহিঙ্গাদের ভোটার করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডবলমুরিং নির্বাচন অফিসে কর্মরত অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘অভিযোগ উঠলে অপরাধী হয় না। আমার বিরুদ্ধে শত্রুতাবশত কেউ অপপ্রচার চালাতে পারে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাথে আমার সুসম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আমি এসবে জড়িত নই।’
এব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের গঠিত তদন্ত দলের প্রধান খোরশেদ আলম তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার পরই নির্বাচন কমিশন থেকে বিষয়টি গণমাধ্যমে জানানো হবে।

x