রোদনভরা পুনশ্চঃ

শনিবার , ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ
83

এ শহরে একজন দিদি ছিলেন আমাদের। ভারী মায়াবতী এক দিদি। মিনতি বিশ্বাস। সেন্ট মেরিস স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন তিনি। ছিলেন চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘের সহসম্পাদিকা। নিজে লিখতেন, পড়তেন, লেখা ও পাঠে উৎসাহ যোগাতেন মেয়েদের। আমরা অনেকেই যোগেশভবনের (রহমতগঞ্জ) ছোট্ট দ্বিতল বাড়িটার প্রচুর বৃক্ষশোভিত ছায়াময় বাগানে অথবা দ্বিতলের ড্রয়িংরুম সংলগ্ন ছোট্ট বারান্দায় দিদির সঙ্গে একান্তে সময় কাটিয়েছি। দাদু স্বর্গীয় যোগেশচন্দ্র সিংহের স্মৃতিসংরক্ষিত কক্ষটি তাঁর নিত্য যত্নে ঝকঝক করতো। প্রতিদিন ঘরটি নিজের হাতে ঝাঁট দেওয়া থেকে দাদুর ছবিতে টাটকা ফুলের মালা পরানো, ধূপধূনোয় ঘরটাকে সুরভিত করে রাখা, দাদুর বইপত্র ঝাড় পোঁছ করা তাঁর প্রাত্যহিক কাজ ছিল।

একরকম নীরবে, নিঃশব্দে চলে গেছেন তিনি। যে রাতটি পোহালে তিনি নেই হয়ে যাবেন সেই সন্ধ্যায় ফোনে কথা বলেছি। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গিয়ে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। বললাম, আগামীকাল ভোরে দেখতে যাবো আপনাকে। শান্তকক্তে বললেন, আচ্ছা। সকালে গেলাম ঠিকই; দিদির তখন খুব তাড়া। সেজে গুজে পরিপাটি হয়ে শুয়ে আছেন গাড়িতে। বলুয়ার দীঘির পাড়ে শ্মশানঘাটে যাবার তাড়া। দিদির চেয়ে বড় অনেকে তাঁকে বিদায় দিতে এসেছেন। সেন্ট মেরিসের অবসরপ্রাপ্ত অনেক দিদিমনি ছিলেন। আমাদের জুলুকে পেলাম। কর্মতৎপর ছিলেন কবি নাজিম উদ্দিন শ্যামল। দিদি চলে গেলেন।

শ্যামল বলছিলেন তাঁর তরুণচোখে দেখা অসামান্য সুন্দর, পরিপাটি দিদির কথা। দিদিকে শাড়ির সঙ্গে স্যান্ডেলের রঙ মিলিয়ে পরতে দেখেছেন শ্যামলসেই সেকালে।

মিনতিদি আর নেই। লেখিকা সংঘের বর্তমান সভাপতি আনোয়ারা আলম বলছিলেন সালমা আপা, ফাহমিদা আমিন এবং দিদির উত্তাল কর্মমুখর লেখিকা সংঘের দিনগুলির কথা।

যোগেশভবনের একতলায় কোণার ঘরটিতে সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডায় মিলিত হতেন অনেকে। দিদির মুখে সেসব গল্প শুনতাম। এ শহরের অধ্যাপক গবেষক, কবিশিল্পী সাহিত্যিকেরা বসতেন। দিদিও যেতেন। ঠাট্টা করে একদিন বলেছি, আপনি ওখানে কি করেন? হেসে বললেন, আমি সাক্ষী গোপাল। আমি বললাম, ভুল হলো। আপনি সাক্ষী গোলাপ। গোপাল হতে যাবেন কেন? হায়, দিদির সেই গড়িয়ে পড়া হাসির ভঙ্গি আজও চোখে ভাসছে।

মিনতি দি আর নেই। কিন্তু তাঁর আগে পরে, কাছেপিঠে যাঁরা ছিলেন তাঁরা কি দিদি সম্পর্কে কিছু লিখবেন? লিখুন না। আমরা এই আদর্শ মানুষদের কথা জানতে চাই।

x