রেল দুর্ঘটনা: দুর্নীতি অনিয়ম ও লোকসান রোধ করবে কে

সৈয়দ দিদার আশরাফী

শনিবার , ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:০৪ পূর্বাহ্ণ
12

রেল দুর্ঘটনা নিয়ে সাম্প্রতিককালে দেশের নাগরিক সমাজকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। নিরাপদ এ বাহনটি হঠাৎ চলাচলে বিশাল দুর্ঘটনায় বিপর্যয় ঘটেছে গত ১১ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায়। এ নিয়ে ভ্রমণকারীরা আতঙ্কে আছে। চলতি মাসে নভেম্বরে একটি নয় কয়েকটি রেল দুর্ঘটনায় যাত্রীদের ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করেছে আপন মন মানসিকতা। যাপিত জীবনে দুর্ঘটনা হতে পারে। কিন্তু রেল চালক ঘুমিয়ে রেল চালালে এবং মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হবে এটি কোনোভাবে একজন সুস্থ নাগরিক মেনে নেবে না। বাংলাদেশ রেলওয়েকে অবকাঠামোর ভিত্তিতে প্রশাসনের নজরদারিতে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে এটি বিশিষ্ট জনদের মতামত।
জাতীয় উন্নয়নে নীরিখে রেলের পিছিয়ে পড়া, লোকসান, উন্নয়নের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। আমাদের মত জনবহুল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির দেশে রেলের বিদ্যমান অবকাঠামোর উন্নয়নের বিকল্প নেই। উজানে ভারতের বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের কারণে দেশের নৌপথ ক্রমে সঙ্কুচিত হয়েছে। পণ্য পরিবহনে নৌপথের পর সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠতে পারত রেলপথ। রেলের অনেক অবকাঠামো জরাজীর্ণ ও অব্যবহৃত হয়ে পড়েছে। অন্যান্য সেক্টরের মত জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে নতুন রেলপথ, রেলস্টেশন, অবকাঠামো, ইঞ্জিন ও বগি বৃদ্ধির মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর স্বাভাবিক উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সড়ক পথে বাড়বাড়ন্তের ডামাঢোলে রেলপথের উন্নয়নকে দীর্ঘদিন অগ্রাহ্য করার মাশুল দিচ্ছে জাতি। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে রেলপথকে ঢেলে উদ্যোগই দেখা যায়নি। উপরন্তু রেলের হাজার হাজার একর জমি প্রভাবশালী মহলের হাতে বেদখল হয়েছে। অন্যদিকে সড়কপথ ও সড়ক পরিবহনের উন্নয়নের নামে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি অপচয়ের মাধ্যমে লুণ্ঠিত হয়েছে। গত এক দশকে সরকারের পক্ষ থেকে রেলের উন্নয়নের অনেক প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে। রেল যোগাযোগ উন্নয়নে ৩০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনাও ইতিমধ্যে গৃহীত হয়েছে। তবে সে পরিকল্পনায় কোথায় যেন শুভঙ্করের ফাঁক রয়ে গেছে। যার কারণে রেলের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়লেও গত এক দশকে রেলের টিকিটের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়ার পরও রেলের লোকসান কমেনি। ই-টিকিটিং হলেও সেবার মান বা নিরাপত্তা বাড়েনি।
প্রসঙ্গত: গত এক দশকে রেলের উন্নয়নে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এর বিপরীতে রেলপথ থেকে আয় হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয়ের ১৫ শতাংশও উঠে আসেনি। অথচ রেলের প্রতি সব শ্রেণির মানুষের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি রেল যাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি হলেও এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তেমন কোনো বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ না থাকায় লোকসান বাড়ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নতুন ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহ, অটোমেশন ও আধুনিকায়নের নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও রেলের জনবল সংকট নিরসন এবং দক্ষ জনবল বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দুর্ঘটনা, মধ্যরাতে রেলের বগির দিকে ছুঁড়ে মারা পাথর নিক্ষেপে অনেক যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, শিডিউল বিপর্যয় এবং নিরাপত্তার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সারাদেশে ২০৯টি রেল দুর্ঘটনায় ২০৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। চালকের ভুলে রেল দুর্ঘটনা একটা অস্বাভাবিক ও বিরল নজির। প্রয়োজনীয় দক্ষ চালক ও জনবলের সংকট থাকায় চালকদের উপর বাড়তি চাপের কারণে হয়তো চলন্ত রেলের চালক ঘুমিয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রথমেই জনবল সংকট নিরসনের উদ্যোগ নিতে হবে। রেল চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামসহ জীবন যাপনের স্বাভাবিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ও সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যায় না। কসবা রেল দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত কমিটির সক্ষমতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তদন্ত রিপোর্ট অনুসারে রেলের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়ন করা। রেলের বেদখল হওয়া হাজার হাজার একর জমি পুনরুদ্ধার, হাজার হাজার শূন্যপদ পূরণ এবং দুর্নীতি-অনিয়ম রোধ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেলওয়েকে দেশের উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া লাভজনক এ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠানকে কেন প্রতি বছর লোকসান গুণতে হচ্ছে তা খতিয়ে দেখার জন্য সরকারের প্রতি আহবান রইল।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক

x