রেল দুর্ঘটনা কাম্য নয় : ধরে রাখতে হবে মানুষের আস্থা

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:০৭ পূর্বাহ্ণ
22

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় আমরা শোকাহত। এ ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে চালকদের প্রশিক্ষণ এবং রেল সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা এটি। এ ব্যাপারে আমাদের রেলের যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সতর্ক করা উচিত। রেল যোগাযোগ নিরাপদ সে কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রেলযোগাযোগ সবচেয়ে নিরাপদ এবং আমরাও এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা নতুন রেল সমপ্রসারণ করে যাচ্ছি। পণ্য পরিবহন, মানুষ পরিবহন, সবক্ষেত্রেই রেল নিরাপদ।
তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক, সহকারী এবং গার্ডকে গাফিলতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। রেলমন্ত্রী বলেছেন, ‘সিগন্যাল অমান্য করার কারণে হতে পারে। সিগন্যাল দেয়ার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি ছিল কিনা, সেটা বলতে পারছি না। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে ড্রাইভারকে দায় মনে করছি।’ তবে বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করছেন ভিন্নভাবে নানা গণমাধ্যমে। বাংলাদেশের রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা কতটা আধুনিক হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। অনেকে ট্রেনের চালকসহ রেলওয়েতে লোকবলের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘রেলওয়েতে এখন অবকাঠামো এবং ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এই বিভাগ অবহেলিত ছিল। জনবলের ঘাটতি কিন্তু ছিল। সে কারণে চালকদের বাড়তি চাপ বহন করতে হতে পারে। এই বিষয়টি বড় কারণ হতে পারে।’
বিপুল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে গণপরিবহন খাতে সমস্যার শেষ নেই। সড়ক যোগাযোগের ওপর অত্যধিক চাপের ফলে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের গতি অনেক কমে এসেছে। এই চাপ অনেকটাই কমে যেত, যদি আমাদের রেল সার্ভিস আরেকটু উন্নত হতো। পৃথিবীর জনবহুল দেশগুলোতে রেলপথের ভূমিকা বিরাট, কারণ একটি ট্রেনে একসঙ্গে অনেক যাত্রী চলাচল করতে পারে। আমাদের দেশে রেল খাত একসময় লাভজনক ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন তা পরিণত হয়েছে লোকসানি খাতে। মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক, জীর্ণ কারখানা, লোকবল-সংকট, সময়ানুবর্তিতার অভাব, টিকিট কেনায় দুর্ভোগ, ছারপোকাময় আসনই হচ্ছে রেলওয়ের বৈশিষ্ট্য।
ট্রেনে চড়লে সিট পাওয়া যায় না, এটা প্রতিদিনের ছবি। স্টেশন ও কোটাভিত্তিক টিকিট কেনাবেচার কারণে বছর বছর লোকসান বাড়ছে। যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করলেও কর্তৃপক্ষ শতভাগ টিকিট বিক্রি দেখাতে পারে না। নানা অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতায় চলছে রেল। হাজার কোটি টাকার রেললাইন সংস্কার, নতুন রেলপথ নির্মাণ ও অবকাঠামোয় ব্যয় হয়েছে। তবু ১৯৯০-এর দশকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যেখানে পাঁচ ঘণ্টা লাগত, এখন সেখানে লাগে ছয় থেকে আট ঘণ্টা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এখন ৭০-৭৫ শতাংশ ট্রেন সময়সূচি মেনে চলাচল করতে পারে। দশ বছর আগেও ট্রেনগুলোর তা মেনে চলার হার ছিল ৮৩ শতাংশ। এতো অবনতি, এতো যন্ত্রণা, তারপরও এখনো বিপুল মানুষ এই যাতায়াত ব্যবস্থাটির ওপর নির্ভরশীল, কেননা সত্যিকারের গণপরিবহনতো রেলই। যেই গাড়িতে একসাথে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যাতায়াত করতে পারে। রেল বিভাগের হিসাবে আমরা দেখি, গড়ে প্রায় ১৫ ভাগ হারে রেলের যাত্রী বাড়ছে বছরে। ট্রেন যে এখনো মানুষের কাছে কতটা কাঙ্ক্ষিত পরিবহন তা টের পাওয়া যায় বিভিন্ন মৌসুমে। যেমন ঈদের আগে। সেসময়কার ভেতরে আর ছাদে ঠাসা যাত্রীদের ছবি আসে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। কিন্তু ঈদের সেই টিকিট কাটতে গিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। মাঝরাতে লাইনে দাঁড়িয়ে দিন পেরিয়েও অনেকের টিকিটের দেখা মেলে না। গত কয়েক বছরে অনলাইনে আর ‘রেল সেবা’ নামের একটি অ্যাপসের মাধ্যমেও টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। কিন্তু ঈদে সেখান থেকে টিকিট মেলাটাও সৌভাগ্যের ব্যাপার। অগ্রিম টিকিট ছাড়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো উধাও হয়ে যায়। অনেকে অ্যাপস আর সাইটে প্রবেশের সুযোগই পান না।
মানুষ ভ্রমণের জন্য কেন রেলকে বেছে নেয়? একমাত্র কারণ যাতায়াত নিরাপত্তা। রেল ভ্রমণ অনেকটা নিরাপদ ভেবে এখনো বেশিরভাগ মানুষের আস্থার জায়গা দখল করে আছে রেল। তাই যে কোনো দুর্ঘটনা তার ওপর আস্থা নষ্ট করে। তাই রেলদুর্ঘটনার মাত্রাকে জিরো পজিশনে নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে ডাবল লাইন স্থাপন করতে হবে। রেলে যাত্রীসেবাও আরো বাড়াতে হবে।

x