রেলের জমি উদ্ধারে কঠোর মন্ত্রণালয়

চট্টগ্রামে দখলে ২২৩ একর জায়গা ।। উচ্ছেদে চলছে অভিযান

শুকলাল দাশ

বুধবার , ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ at ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
1138

দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলদার এবং রেলের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কব্জায় থাকা রেলের জমি উদ্ধার হতে চলেছে। মন্ত্রণালয়ের কঠোর নির্দেশনায় একের পর এক চলছে অবৈধ বস্তি-দোকান উচ্ছেদের অভিযান। বাদ যাবে না স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের খালি জায়গায় ঘর তৈরি করে ভাড়া দেওয়া অংশও। এর ফলে অবৈধ দখলদারদের মাঝে বিরাজ করছে আতংক। রেলের জমিতে অবৈধভাবে কোটি টাকার বাণিজ্য এবার বন্ধ হতে চলেছে। গত কয়েকদিনে রেলের দখলকৃত এলাকাগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দখলদারদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী আর রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় সমানে সমান। স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রেলের শত শত একর জমি দখল করে বছরের পর বছর বাণিজ্য করেন। তেমনি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যে যেদিকে পেরেছেন রেলের জমি লুটপাট করেছেন। এ ব্যাপারে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন দৈনিক আজাদীকে বলেন, রেলের জায়গায় কোনো অবৈধ দখলদার থাকতে পারবে না। আস্তে আস্তে সব অবৈধ বস্তি-দোকান উচ্ছেদ করা হবে। কোনোটাই বাদ যাবে না। রেলের স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের খালি জায়গায় অবৈধভাবে ঘর তৈরি করে ভাড়া দেওয়া বস্তিগুলোও উচ্ছেদ করা হবে। আমরা এরই মধ্যে অভিযান শুরু করেছি। যত প্রভাবশালীই হোক রেলের জমি কেউ অবৈধভাবে দখল করে বাণিজ্য করতে পারবে না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রেলের সদর কাচারির অধীনে পতেঙ্গা থেকে শুরু করে পশ্চিম মাদারবাড়ি, কদমতলী, আমাবাগান, পাহাড়তলী, অলংকার, ওয়ার্লেস, ফয়’স লেক, সীতাকুণ্ড; ষোলশহর কাচারির অধীনে ষোলশহর, কালুরঘাট, জানালি হাট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বোয়ালখালী ও পটিয়া পর্যন্ত একশ একর জমি ব্যক্তিগত অবৈধ দখলদারদের দখলে রয়েছে। এটা রেলের অফিসিয়াল হিসাব। প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রামে রেলের ২২৩ একর জায়গা অবৈধ দখলদারদের দখলে আছে বলে জানান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এর মধ্যে অবশ্য ১৫০ একর বিভিন্ন সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে। আর বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ৭৩ একর জমি।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল করিম আজাদীকে বলেন, রেলের জমি থেকে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ চলছে। ইতোমধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি বড় বড় বস্তি উচ্ছেদ করেছি। রেলের জমি উদ্ধারে অভিযান নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। নভেম্বরের পর নতুনভাবে উচ্ছেদের সিডিউল হলে আবার অভিযান শুরু হবে।
রেলওয়ে সূত্র বলেছে, সারা দেশে বর্তমানে রেলওয়ের মোট জমি ৩১ হাজার ৮৬০ একর। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১ হাজার ৪ একর এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩ হাজার ৩৮৭ একর জমি বেদখল হয়ে আছে। পূর্বাঞ্চলের দখল হওয়া জমির মধ্যে ৭৮০ একর জমি ঢাকা বিভাগে এবং ২২৩ একর জমি চট্টগ্রাম বিভাগে।
রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বলছেন, দখলকারীদের বেশিরভাগের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক আছে। এ কারণে অধিকাংশ সময় জায়গা দখলমুক্ত করা যায় না। তবে রেলওয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশেও জমি দখলের অভিযোগ আছে। বিশেষ করে রেলের শ্রমিকনেতাদের কারণে অনেক জায়গা দখলমুক্ত করা যায় না।
গত তিন দিনে রেলের ষোলশহর কাচারি অফিসের আশপাশে ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় আধ কিলোমিটার রেললাইনসহ কাচারি অফিসের দুই পাশে এবং পেছনে আরো আধ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী-পুলিশের এক ওসিসহ ১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট এক হাজারের মতো বস্তি-দোকান ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়েছে। ওখান থেকে সিআরপি পুলিশ ফাঁড়ি, রেলের কাচারি অফিসের সার্ভেয়ার, আমিন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব জমি দখল করে কোথাও মার্কেট, কোথাও বাজার, আবার কোথাও বস্তি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। অনেক জায়গায় আবার রাজনৈতিক কার্যালয়ও আছে।
ষোলশহর স্টেশনের সামনে রেলের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়। বিকেল হলেই প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে গোল করে চেয়ার নিয়ে বসে আড্ডায় মাতেন অবৈধ দখলদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা।
সিআরবি এলাকা থেকে ইস্পাহানি রেলগেট পর্যন্ত অবৈধ স্থাপনার পরিমাণ লক্ষাধিক। আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে খেলার মাঠ, এমনকি রেললাইনের দুই ধারেও বস্তি গড়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও সংগঠন অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে জড়িত রয়েছে। শুধু তাই নয়, রেলের বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও কোয়ার্টার সংলগ্ন খালি জায়গায় একসময় নিজেদের ব্যবহারে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গৃহ নির্মাণ করলেও সেখানে ভাড়া বাণিজ্য চলছে দীর্ঘদিন থেকে।

x