রেলপথে ঝরল ১৬ প্রাণ

আজাদী ডেস্ক

বুধবার , ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
230

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের ক্রসিংয়ে আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ও আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথার মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার কারণে প্রায় আট ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান বলেন, দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দশ জনের মৃত্যু হয়। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে আরো ছয় জন মারা যায়। আহত অর্ধশতাধিক যাত্রীকে কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মুন্না নামে ২০ বছর বয়সী এক তরুণকে পাঠানো হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। খবর বিডিনিউজের।
যেভাবে দুর্ঘটনা : রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মিয়া জাহান বলেন, সিলেট থেকে ছেড়ে উদয়ন এক্সপ্রেস যাচ্ছিল চট্টগ্রামে। আর তূর্ণা নিশীথা চট্টগ্রাম থেকে যাচ্ছিল ঢাকায়। তূর্ণা নিশীথার চালকের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি আমরা। তিনি বলেন, মন্দবাগে দুই ট্রেনের ক্রসিং হচ্ছিল। সিগন্যাল
পেয়ে উদয়ন মেইন লাইন থেকে লুপ লাইনে প্রবেশ করছিল। ট্রেনের নয়টি বগি লুপ লাইনে চলে যাওয়ার পর দশম বগিতে হিট করে তূর্ণা নিশীথা। ওই ট্রেনের লোকোমাস্টার সিগন্যাল অমান্য করায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে আমরা জেনেছি।
সংঘর্ষের পর তূর্ণা নিশীথার একাধিক বগি উদয়নের কয়েকটি বগির ওপর উঠে যায়। এর মধ্যে দুটি বগি ভীষণভাবে দুমড়ে মুচড়ে যায়। সেখানে আরও মৃতদেহ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকর্মীরা। দুর্ঘটনার পরপরই রেল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে। পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তিনটি ইউনিট এবং পুলিশ সদস্যরাও যোগ দেন।
দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ এবং আহতদের ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার হবে বলে জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এছাড়া নিহতদের মরদেহ দাফনে সহযোগিতার জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন।
স্বজনদের আহাজারি : দুর্ঘটনার খবর পেয়ে চাঁদপুর থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আবদুস সামাদ নামে একজন। তিনি জানান, তার বাবা-মা ছিলেন উদয়নের যাত্রী, সিলেট থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে তার বাবার ফোন থেকে এক লোক কল করে দুর্ঘটনার খবর দেয়। সামাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে জানতে পারেন, তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আহত যাত্রী বলেন, তাদের বগির অধিকাংশ যাত্রী ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ বিকট আওয়াজ হয় আর তিনি আসন থেকে ছিটকে পড়ে যান। পরে দেখি ট্রেন একবারে ছিন্নভিন্ন হইয়্যা গেছে। খালি চিৎকার আর চিৎকার মানুষের। হাসপাতালে ভর্তি আরেক কিশোর জানায়, মা, ভাই, দুই বোন আর নানীকে নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল তারা। দুর্ঘটনায় নানী আর এক বোন পায়ে আঘাত পেয়েছে। হট্টগোলের মধ্যে মায়ের খোঁজ পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা মেডিকেলে ভর্তি উদয়নের এক যাত্রী বলেন, তার বাড়ি চাঁদপুরের হাইমচরে, সিলেট গিয়েছিলেন মাজার জেয়ারত করতে। ফেরার পথে দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়েছেন।
তূর্ণা নিশীথার চালক বরখাস্ত : দুই ট্রেনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেসের চালককসহ তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন জানিয়েছেন। পাশাপাশি দুর্ঘটনা তদন্তে রেলের পক্ষ থেকে মোট চারটি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রেলপথমন্ত্রী বলেন, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের লোকোমাস্টার তাহের উদ্দিন, সহকারী লোকোমাস্টার অপু দে ও গার্ড আব্দুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আমরা মনে করছি, ড্রাইভারের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তারপরও রেল মন্ত্রণালয় থেকে তিনটি, রেলওয়ে থেকে একটি এবং জনপ্রশাসন থেকে একটিসহ মোট পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।
রেলমন্ত্রী বলেন, ওই রেলের লাইনে কোনো ত্রুটি ছিল না। ওই জায়গায় ট্রেন চলে সিঙ্গেল লাইনে। তূর্ণা নিশীথা বিরতিহীন ট্রেন। সে কারণে ওই স্টেশনে তূর্ণাকে পাস দিতে গিয়ে উদয়নকে লুপ লাইনে প্রবেশের সিগন্যাল দেওয়া হয়েছিল। ওই ট্রেনটি লুপ লাইনে ঢোকার সময় তূর্ণা নিশীথা উদয়নকে ধাক্কা দেয়। তখনও ওই ট্রেনের চারটি বগি প্রধান লাইনে ছিল। তাকে পাস দিয়েছে তার সিগন্যাল দেখার কথা। কিন্তু সে দেখেনি। আমরা মনে করছি, এটা চালকের অসচেতনতার জন্য হয়েছে।
৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু : ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে প্রায় আট ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত বগিগুলো সরিয়ে মূল লাইন মেরামত করে সকাল সোয়া ১০টার দিকে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করা হয়। বেলা পৌনে ১১টায় আবার ট্রেন চলাচল শুরু হয়। উদয়ন এক্সপ্রেস সামনের দিকের অক্ষত নয়টি বগি নিয়ে বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রামে পৌঁছায়। আর মূল লাইন মেরামত শেষে বেলা পৌনে ১১টার দিকে তূর্ণা নিশীথা ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, তূর্ণা নিশীথার ইঞ্জিন সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বগিতে তেমন ক্ষতি হয়নি। আরেকটি ইঞ্জিন লাগিয়ে ট্রেনটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। এদিকে এ দুর্ঘটনার ফলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও সিলেটের পথে বেশ কয়েকটি ট্রেনের যাত্রা বিলম্বিত হয়েছে। ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস সকাল ৭টায় নির্ধারিত সময়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে গেলেও রাস্তায় আটকে থাকে দীর্ঘ সময়। চট্টগ্রাম থেকে অন্যান্য ট্রেনের সময়সূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়। পূর্ব রেলের ডিভিশনাল কমার্শিয়াল অফিসার (ডিসিও) আনসার হোসেন বলেন, আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেস সকাল ৯টায় সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ছাড়েনি। সাড়ে ১২টার মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রাও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকাগামী মেইল ট্রেন কর্ণফুলী এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম ছেড়ে গেছে সকাল ১০টায়।

x