রেফারী সমিতিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে সিজেকেএস এর চিঠি ।। এতদিনের অপকর্মের শাস্তি দাবি করলেন ক্রীড়া সংগঠকরা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:১৫ পূর্বাহ্ণ
196

ফুটবলে রেফারীরা হচ্ছেন বিচারক। যারা মাঠে সবচাইতে বড় এবং শক্তিশালী ভুমিকা পালন করে থাকেন। বিশ্বের যত বড় তারকা ফুটবলারই হোকনা কেন রেফারীর কাছে তারা মাথা নিচু করেই থাকে। আর রেফারীরা যখন অনৈতিক কাজ করেন তখন তার প্রভাবটা পড়ে মাঠে। রযেন সে পথেই হাটছে। কারন চট্টগ্রামের রেফারীরা নাকি এখন অনৈতিক কাজে লিপ্ত। গত ৮ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এক চিটিতে চট্টগ্রাম জেলা ফুটবল রেফারী এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান মিরনকে তাদের কার্যালয়ে মদ, জুয়া সহ সকল অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। উক্ত চিটির প্রেক্ষিতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাহলে নিশ্চয়ই রেফারী সমিতির কার্যালয়ে মদ, জুয়া সহ অনৈতিক কার্যক্রম চলে। নাহয় সে সব বন্ধের প্রশ্ন আসবে কেন। একই সাথে এ প্রশ্নও দেখা দিয়েছে যে, এসব অনৈতিক কার্যক্রম কি তাহলে মাত্র কদিন থেকে চলছে নাকি দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসছে? চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থা এই আদেশ দেওয়া কারণও রয়েছে। আদেশটা যে তারা স্বপ্রনোদিত হয়েই দিয়েছে তা কিন্তু নয়। চট্টগ্রাম ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক পারভেজ মান্নান গত ৭ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক এবং সিটি মেয়র বরাবর একটি পত্র দেন। তিনি তার পত্রে উল্লেখ করেন রেফারীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রতিদিন গভীল রাত পর্যন্ত মদ ও জুয়ার আসর বসিয়ে রেফারী নামক শব্দটিকে বিতর্কিত করেছে। তিনি তার চিঠিতে আরো উল্লেখ করেণ এ সমস্ত কারনে রেফারির মান এখন নিন্মমুখি। আর খেলোয়াড়দের কাছে রেফারী সমাজ আজ তুচ্ছরূপে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন জুয়ারী রেফারী কর্তৃক খেলার নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পারিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পারভেজ মান্নানের এই চিঠির প্রেক্ষিতে সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক আ.জ.ম.নাছির উদ্দিন এসব অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধের নিদেশ দিয়ে চিটি দিয়েছেন। একই সাথে সরেজমিনে রেফারী সমিতিতে গিয়ে সেখানে কি হয় তা দেখে একটি রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বলেছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে। গতকাল সিজেকেএস প্রশাসনিক কর্মকর্তা সৈয়দ সরওয়ার আলম জানান তিনি সিজেকেএস সাধারন সম্পাদকেন নির্দেশনা মোতাবেক চিটি দিয়েছেন। তবে তিনি সরেজমিনে তদন্ত করতে যাননি। তবে তিনি বলেন ওখানে কি হচ্ছে সেটা অনেক দিন ধরেই তিনি শুনে আসছেন। তবে সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ.জ.ম.নাছির উদ্দীন জানান তাকে এই বিষয়ে কখনো কোন কিছু জানাননি। না হয় তিনি তখনই ব্যবস্থা নিতেন। সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক আবার রেফারী সমিতিরও সভাপতি। তাই কারো কারো মতে রেফারী সমিতি নিয়ে কেউ তেমন কথা বলতে চাইতেননা। তবে সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক বলেন আমি সভাপতি তার মানে এই নয় যে, আমার নাম বিক্রি করে কেউ অনৈতিক কাজ করবে। আমি সে জন্য সভাপতি হইনি। এরকম যারা করবে তাদের আমি নিজে গিয়ে ধরিয়ে দেব। তিনি জানান তাকে এই সব কথা কেউ আগে বলেনি। তিনি বলেন আমি স্টেডিয়ামে যাই কেবল কিছুক্ষনের জন্য নিজস্ব কিছু কর্মসূচিতে অংশ নিতে। যে কারণে বেশি সময় আমার সেখানে থাকা হয়না। তবে রেফারী সমিতির বিষয়টি আমার কাছে এতদিন জানা ছিলনা। যখনই আমি জেনেছি সাথে সাথে সে সব বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। এখন সরেজমিনে তদন্ত করে আরো কি কি অনিয়ম সেখানে হয় সে সব বের করা হবে। প্রয়োজনে তৃতীয় পক্ষ দিয়েও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন স্টেডিয়াম কম্পাউন্ডে কোন ধরনের অনৈতিক কাজ করতে দেওয়া হবেনা।
আসলে কি হয় রেফারী সমিতির কার্যালয়ে। দীর্ঘ দিন ধরে রেফারীদের একটি অংশ এবং খেলোয়াড়রা অভিযোগ মরে আসছিল রেফারী সমিতিতে মদ এবং জুয়ার আসর বসে। কিন্তু কেউ সেটাতে তেমন কর্ণপাত করেনি। গত এক বছর আগেও ফুটবল খেলোয়াড় সমিতিতে জুয়ার আসর বসতো। কিন্তু সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক সে সব বন্ধ করে দেন। এরপর যারা খেলোয়াড় সমিতিতে খেলতেন তারা উপরের তলায় রেফারী সমিতিতে গিয়ে খেলতে শুরু করে। গত ৮ আগস্ট সিজেকেএস এর পক্ষ থেকে চিটি দিয়ে এসব অনৈতিক কাজ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর গতকাল মুখ খুলেছেন অনেকেই। একাধিক ফুটবল রেফারী বলেন গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে জুয়ার আসর বসছে। দীর্ঘ দিন ধরে এই রেফালী সমিতিতে জুয়া খেলেন তেমন একজন জানালেন রেফারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া দুটি কক্ষে স্টিল স্ট্রাকচারের মাধ্যমে ছাদ দিয়ে ডুপ্লেক্স করা হয়েছে। যেখানে নিচে দুটি রুম থাকলেও উপরে কিন্তু পুরোটাই একটি কক্ষ। আর সে কক্ষে বড় একটি টেবিল বসানো হয়েছে। সেখানে খেলেন যারা বড় অংকের জুয়া খেলে। আর নিচে উত্তর পাশের কক্ষটিতে রয়েছে তিনটি বোর্ড। সেখানেও চলে জুয়া মাঝরাত পর্যন্ত।
একটি সরকারী স্থাপনায় আবার নতুন করে অভ্যন্তরীন স্থাপনা নির্মাণ করা যায় কিনা তেমন প্রশ্নের জবাবে সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক বলেন কখনোই নয়। তিনি বলেন আর সেটি করতে হলে অবশ্যই সিজেকেএস এর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। আর তেমন অনুমতি নিয়েছেন কিনা রেফারী সমিতি সেটা জানে না সিটি মেয়র। তিনি বলেন যেহেতু রেফারী আমাদের ফুটবলের একটি অংশ, সেহেতু তাদেরকে ব্যবহারের জন্য দুটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, তারা সেখানে নতুন করে কনস্ট্রাকশন করবে কিংবা দ্বিতল করতে ছাদ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেটা হয়েছে। আর সে সব হয়ে সিটি মেয়রকে সভাপতি বানিয়ে তার নাম ভাঙ্গিয়ে। তেমনটি বলেছেন গতকাল একাধিক রেফারী। তবে সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক বলেন এ ধরনের কোন অনৈতিক কাজ আমার কাছে প্রশ্রয় পায়নি কখনো আর পাবেওনা। তিনি বলেন আমি সবকিছু তদন্ত করে ব্যবস্তা নেব। গতকাল একাধিক ফুটবলার এবং রেফারী বলেন একটি অফিসে কেন পেছনে দরজা রাখতে হবে। এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গেইটের ভেতরের অংশে রয়েছে ফুটবল খেলোয়াড় সমিতি, ক্রিকেট খেলোয়াড় সমিতি, আন্তঃ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং ব্লাইন্ড ক্রিকেট এসোসিয়েশেনের কার্যালয়। আর দ্বিতীয় তলায় রয়েছে হকি সম্পাদকের কার্যালয়, ক্রিকেট আম্পায়ার এসোসিয়েশন, ফুটবল রেফারী এসোসিয়েশন, এবং বিজয় মেলা পরিষদের কার্যালয়। কিন্তু কোন কার্যালয়ে পেছনে কোন দরজা নেই। তাহলে রেফারী সমিতিতে কেন পেছনে দরজা রাখার প্রয়োজন পড়ল। তার কোন সদুত্তর দিতে পারেনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমিতির বর্তমান নির্বাহী কমিটির এক কমর্কতা। তিনি বলেন আমি জানিনা কেন অফিসের পেছনে দরজা কাটতে হলো।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে রেফারীরা রাত্রি যাপন করেন সমিতিতে। অথচ সিজেকেএস সাধারন সম্পাদক স্টেডিয়াম কম্পাউন্ড থেকে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের সরিয়ে দিয়েছেন অন্যত্র। যারা থাকতেন স্টেডিয়ামের গ্যালারীর নিচে। সেখানে রেফারীরা রাত্রি যাপন করছেন স্টেডিয়াম কম্পাউন্ডে দ্বিতল ভবনে। যা নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছেন অনেকেই। গতকাল একজন রেফারী জানালেন প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে অন্তত ১৫ জন রেফারী রাত্রি যাপন করেন সেখানে। বলা হচ্ছে শুক্রবার সকালে তারা অনুশীলন করে। তাই বলে তারা স্টেডিয়াম এলাকায় রাত্রি যাপন করবে কেন ? তেমন প্রশ্ন করেছেন গতকাল ফুটবলাররা।
বলা হয়ে থাকে রেফারীরা হচ্ছে বিচারক। আর বিচারকরা কখনোই আম জনতার সাথে মিশেন না। ফুটবল মাঠে রেফারীরা যেহেতু বিচারক সেহেতু খেলোয়াড়দের সাথে তাদের কেন সখ্যতা কিংবা বন্ধুত্ব থাকবে তেমন প্রশ্ন করেছেন গতকাল একাধিক ফুটবল কোচ। তারা অভিযোগ করে বলেন সিজেকেএস ফুটবল লিগে এমন দল গুলোর কাছ থেকে স্পন্সর নিয়ে রেফারীদের জন্য ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। আর সেটা রেফারীদের কাজ কিনা তেমন প্রশ্নও করেছেন অনেকেই। আর যে সব দলের কাছ থেকে স্পন্সর নেওয়া হয় মাঠে গিয়ে তাদের পক্ষে বাঁশি বাঁজানো হয় বলেও অভিযোগ রেফারীদের বিপক্ষে। আর চট্টগ্রামের ফুটবলে পক্ষপাতিত্ব মুলক রেফারিং এর অভিযোগ নতুন কোন বিষয় নয়। সংস্থার বর্তমান কমিটির একাধিক কর্মকর্তা গত ৮ আগস্ট সিজেকেএস কর্তৃক প্রদত্ত চিটির পর জানান সমিতিতে মুলত কারো কোন কতৃত্ব নেই। এখানে একজনের ইশারায় সব চলে। তিনি সমিতির সাধারন সম্পাদক আবদুল হান্নান মিরন। গতকাল তার বিরূদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতার বিষয়ে জানতে তাকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যানি। তবে অন্য কর্মর্র্তারা কোন ধরনের মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে চট্টগ্রামের ফুটবলার এবং ক্রীড়া সংগঠকরা বলছেন স্টেডিয়াম এলাকায় যেন কোন ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হতে না পারে। যে কাজটি এতদিন যাবত করে আসছিল রেফারী সমিতি তা বন্ধ করে দিয়ে যারা এ ধরনের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত তাদের বিরদ্ধে যে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেটাই দাবি করছেন তারা।

x