রেপ কালচার, প্রতিবাদ নিয়ে দুই কথা

আনন্দময়ী মজুমদার

শনিবার , ১১ জানুয়ারি, ২০২০ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
37

১) বিষয়টা নিয়ে মুখ খোলা কঠিন। আমি এক্সপার্টের জায়গা থেকে নিশ্চয়ই বলতে চাই না। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে শঙ্কিত হই সবার মতো।
চিলিতে এক দল মেয়ের প্রতিবাদ দেখলাম রাষ্ট্র আর পুলিশকে দায়ী করছে। বিশ্বে রেপ নিয়ে এখন প্রতিবাদ চলছে প্রতি নিয়ত। সব জায়গায় মি টু আন্দোলনের ঝড় উঠেছে। এর ফলে ডিবেট তৈরি হয়েছে। ডিবেটের কাজ প্রশ্ন তোলা আর প্রশ্ন না তুললে কিছু পালটায় না। নিজেদের পথ বের হয়ে আসে না। আর ছোটো ছোটো প্রশ্ন থেকে আরও গভীর প্রশ্ন এসে যায়। এই কারণে এই ডিবেট আর প্রতিবাদ সমীহের ব্যাপার।
২) বিজ্ঞানের দৃষ্টি থেকে, রেপিস্টদের একটা মন আছে। এই মনের তল দেখতে পেলে আমরা বুঝতে পারি সে কেন রেপ করে, বা করতে চায়।
সামপ্রতিক একজন পৎরসরহধষ ঢ়ংুপযড়ষড়মরংঃ- এর লেখা পড়ে বুঝতে পারলাম, রেপিস্টদের শাস্তি দিলে রেপিস্টদের অপরাধপ্রবণতা চলে যাবে না।
আপনি মশা মারার ওষুধ ছিটালেন কিন্তু জলাশয় একরকম থাকল, মশা আবার ডিম পাড়বে। আরো নতুন ব্র্যান্ডের মশা আসবে।
নাপা খেলে জ্বরের সিম্পটমস চলে যাবে ঠিক। কিন্তু অসুখটা সারবে না।
কেমোথেরাপি ক্যান্সারকে একটু সাময়িক ঠেকাবে ঠিক, কিন্তু ক্যান্সার রোগ মুছে দেবে না।
আমরা তো ক্যান্সার থেকে মুক্তি চাই। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি থামাতে চাই।
৩) পলিটিশানরা করবে না জেনে ১৬ বছরের গ্রেটা থারনবারগ উঠে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের নিজেদের বুঝতে হবে আমরা কী করতে পারি, প্রতিবাদের পাশাপাশি, যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়।
৪) এ প্রশ্নের কী উত্তর আমরা দেব- সম্মিলিত সমাজে রেপিস্ট মন কেন তৈরি হচ্ছে? কোনো শিশু তো রেপিস্ট হয়ে পৃথিবীতে আসে না।
বিজ্ঞান জানায় যে রেপ কোনো জেনেটিক ডিসঅর্ডার না। বরং রেপ করার প্রবণতা সম্পূর্ণ সামাজিক পরিমণ্ডল তৈরি করে। পরিমণ্ডল মানে আসলে কাউকে বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।
আমরা ক্যান্সার চাই না, কিন্তু আমাদের কথা আর কাজ ক্যান্সার লালনের জন্য উপযোগী এমন কি হতে পারে?
৫) যৌন তাড়না থেকে না, রেপিস্টদের কাজ হল নিজেদের ঢ়ড়বিৎ ধংংবৎঃ করা বা ঢ়ড়বিৎ ৎবধংংঁৎব করা কারণ তারা ভিতরে ভিতরে খুব রহংবপঁৎব আর দুর্বল, সুতরাং আসল কাজ, পুরুষদের এম্পাওয়ার করা এবং ংবষভ বংঃববস তৈরি করা – একদম ছোটো থেকে।
৬) যে কোনও এবিউজ, বা ংযধসব এই ংবষভ বংঃববস ভেঙে দিতে পারে।
আমরা যারা না বুঝেই অন্যদের লজ্জিত করি অভিভাবক, শিক্ষক, বন্ধু, পরিবার হিসেবে, তাদের কি ভূমিকা এখানে নেই? ছেলেদের যে ইমেজ আমরা বহন করে চলি, সেই ইমেজের মধ্যেই কি নেই আমাদের লজ্জা দেবার বীজ? (আমরা বহন করি সেটা আমাদের দোষ না, কারণ আমরাও তো এই ব্যাপারে অচেতন।)
৭) সফল ‘পুরুষালি’ শক্তিধর ইত্যাদির বিপরীতে একজন পুরুষের ব্যর্থ, দুর্বল, অপদার্থ, ‘মেয়েলি’, রহপড়সঢ়বঃবহ: ইত্যাদি বিশেষণ একটা মনকে লজ্জায় বিষাক্ত করে দিতে পারে।
লজ্জা দেবার ঘটনা কাউকে এম্পাওয়ার করে না সেটা বৈজ্ঞানিক সত্য।
লজ্জা দেওয়া আর জবাবদিহিতা চাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় (ব্রেনে ব্রাউন লজ্জা নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁর কাছে জেনেছি)।
৮) মনোবিজ্ঞানীরা আমাদের শেখান যে পুরনো চাবির গোছা দিয়ে নতুন দরজা খোলা যায় না।
সুতরাং রাষ্ট্রকে রেপিস্ট লালন করার দায়িত্ব ধরিয়ে আঙ্গুলি নির্দেশ করে সত্যি রেপ বন্ধ হবে কী করে?
আমাদের দরকার এই ব্যাপারে পড়াশুনো করে আমাদের হাতে যা আছে অর্থাৎ এম্পাওয়ারমেন্টের যা যা অস্ত্র, সব কিছু, বিশেষ করে পুরুষদের এম্পাওয়ার করতে ব্যবহার করা। সেটা বাদ দিয়ে সত্যি চেঞ্জ আসবে না।
৯) পাওয়ারটা শরীরের না যতটা চেতনার। একজন সুস্থ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, বসঢ়ধঃযবঃরপ সচেতন পুরুষমানুষ অপরাধী হয় না।
১০) দেখছি যে, সামাজিক ঢ়ৎবলঁফরপব, লজ্জা দেবার কারণে, শিশুদের ংবষভ ড়িৎঃয ঘরে ঘরে আর ইস্কুল কলেজ মাদ্রাসায় ভেঙে যায় ছোটবেলায় বা তরুণ বয়সে। কখনো নঁষষরবফ হয়, কখনো ধনঁংবফ, কখনো অত্যাচারিত হয়, কখনো শীতলতা পায়। প্রত্যেকটা লজ্জা, আঘাত, জাজমেন্ট আর প্রেজুডিস, তাদের মধ্যে ংবষভ বংঃববস এর অভাব, নিজেকে ভালোবাসার অভাব হয়ে দেখা দেয়। এভাবেই তারা রহংবপঁৎব আর একা হয়ে পড়ে। রহংবপঁৎরঃু হল অপরাধের জন্মভূমি।
এবার তাহলে চিন্তাটা সেখানে জড় হয় যে এই এইসব জটিল বিষয় অস্বীকার না করে, কীভাবে এগোতে পারি।