রূপ-লাবণ্য

দীপক বড়ুয়া

শুক্রবার , ১ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
31

– এই জিত,আমার শার্টটা ইস্ত্রী করে দে,অনেক দেরী হলো অফিসের।
– দিচ্ছি দাদা।
বলেই শার্ট ইস্ত্রী দিতে ছুটে যায়। আইরনে ইস্ত্রী শুরু করেছে।ডাক এলো বড়দিদির।বড়োদিদি বলে,
-জিত একটু দোকানে যা ভাই,শ্যাম্পুটা এনে দে। স্নান সেরে ব্যাংকে যাবো।
– যাচ্ছি বড়দি।
প্রতিদিন সকাল হয়।আর এভাবে জিত সবার কাজে ব্যস্ত থাকে।এসব আমার পছন্দ নয়। সবাই আমার সন্তান।অনুলিপি, অভিজিত,রূপজিত।
অনুলিপি সবার বড়ো।ব্যাংকে চাকরি করে।অভিজিত বিদেশি অফিসে।ছোট রূপজিত। লেখাপড়ায় কাঁচা।বেশিদূর লেখাপড়া হয়নি। তারপরও সরল সহজ সে।
সাধারণের মতো নয়, ভোলা। মনে থাকেনা কিছুই। জিত সবার কাজের বন্ধু।
সবাই জিতকে কাজের লোক ভাবে। দ্বীপান্বিতা নেই।আমার স্ত্রী। গত হয়েছে কয়েক বছর। ভীষণ ভালোবাসতো জিতকে। দ্বীপান্বিতার ভয়ে কেউ কিছুই বলতোনা।তখন আমার ও চাকরি ছিলো।সবাই পড়তো। চোখ রাঙানিতে থাকতো সবাই।
দ্বীপান্বিতা চলে যাবার সময় বলেছিলো,
– আমার জিতকে তোমাকে দিয়ে গেলাম। ও বড্ডো অবুঝ। কিছু বোঝেনা,জানেনা।দেখো।
দ্বীপান্বিতা যাবার পর
আজ সব এলোমেলো।আমার কোনও কাজ নেই।সারদিন বাসায় থাকি।
অভিজিতের বউ বীনাপানি। রাগী। সে ও জিতকে নানা কাজ দেয়।কাপড় ধুতে বলে।অভিজিত বারণ করে। বলে,
– ছিঃ ছিঃ জিতকে অন্য কাজ দাও।তোমার কাপড় ধুতে বলছো!ও আমার ভাইতো!
– ভাইতো জানি,তাই বলে বসেবসে খাবে? একজন নয়, দুইজন? সেটা সম্ভব নয়।আমি মানতে পারবোনা।
– বৌদি, আমি ধুইয়ে দেবো। জিত বলে।
আমি শুনি, চুপ থাকি। অফিসে যায়,মেয়ে- ছেলে।ওরা চলে যাবার পর বাসায় চিত্র পাল্টে যায়।সব ঘরে বীনাপানির কথা। এটা কর। ওটা ধর।
একদিন অনুলিপিরও বিয়ে হয়।
দ্বীপান্বিতার মতো অনুলিপিও বলে,
– বাবা,জিতকে দেখো। মা নেই,আমিও নেই। জিত সবার ছোটো।বড্ডো সরল।চলে যাবার আগে জিতকে জড়িয়ে খুব কেঁদেছে লিপি।
বাজারে পাঠায় জিতকে। বৌমা হিসাব নেয়।কথার সাথে বাজারের মিল নেই।টাকার হিসেব দিতে পারে না। জিতকে গালাগাল করে।হাতও তোলে।
অসহ্য যন্ত্রণা দেখে বলি,
– বৌমা কাল থেকে আমিও যাবো বাজারে। জিতকে মেরো না,বকো না।
– ঠিক তাই যেন হয় কাল থেকে।
আজকাল আমাদের খাওয়া হয় ছেলে- বৌমার পরে।ওদের খাওয়া শেষে আমি, জিত খেতে বসি।খাওয়া পরে রান্না ঘরের সব থালাবাসন ধোওয়া মোছা করতে হয়।
তারপর বিছানায় যাওয়া।
আজকাল অভিজিত এসব দেখে কিছু বলে না। ওকে আবার দোষ দিই কিভাবে! বউমার সাথে কথায় পারে না।
শুধুশুধু বাজে কথা বলে।
রাত বাড়ে। বৌমা বলছে,অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
– শোনো,আমি রান্না করতে পারবো না।আর পারছি না।একটা কাজ করো। জিতের বিয়ে দাও। তা’হলে রান্নার, কাজের কথা ভাবতে হবে না।
জিত বৌমার কথা শুনে বলে,
– বাবা আমি বিয়ে করবো না।
অভিজিত বলে,
– বৌকে জিত খাওয়াতে পারবে? জিততো বেকার।
– জিত খাচ্ছে না? একটি কাজের মেয়ে রাখলে খেতো না!
সেভাবেই চলবে। জিত কাজ করবে বাইরের,বউ করবে রান্না। আমি স্বস্তি পাবো। বিশ্রাম পাবো।
অভিজিত খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে বলে,
– বাবা, একটি কথা বলবো?
আমি জেনেও বলি,
– কি কথা বাবা,বলো।
– জিতের বিয়ে দেবো।
– সেকি কথা! সে কিছু করে না। বউকে কি খাওয়াবে? তা’ ছাড়া জিততো স্বাভাবিক নয়।বউ কি, জানবে? বউয়ের দায়দায়িত্ব বুঝবে?
– সেই নিয়ে তুমি ভেবো না। বিয়ের পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
– তোমার একজনের আয়,আমরা এতজন লোক! বসেবসে খাবো? পারবেতো!
– বাবা তোমার পেনশনের পনের হাজার টাকা আছেনা! আমারও বেতন বেড়েছে।ছোটখাটো একটি ব্যবসা শুরু করেছি। তেমন কোনও অসুবিধে হবে না।
আমি হ্যাঁ, না কিছুই বললাম না।অভিজিত বলেই চলে যায়।
আমি ভাবছি।
কি হচ্ছে এসব? আমার পেনশনের টাকায় চলি। জিতকে দিই। আমার ওষুধ লাগে। অন্যান্য কতো কি খরচ আছে। অভিজিত থেকে কোনদিনও চাইনি।
আমার ছেলের চোখে পেনশনের টাকাই পড়লো! কি হবে আগামীতে?
শেষ পর্যন্ত জিতের বিয়ে হলো।
ধুমধাম নয়,সাধাসিধে।
লাবণ্য! জিতের বউ। ভারি মিষ্টি। ভীষণ ভালো। গুণবতীও।
প্রথমদিনেই জিতের নাম পাল্টে দেয় ছোট বউমা।
সবার সামনে বলে,
– বাবা,আজ থেকে জিতকে রূপ বলে ডাকবেন। জিততো অনেকদিন ডেকেছেন,আর নয়।
– প্রথমদিনেই এসে এতো কি কথা! একেবারে নাম পাল্টিয়ে দিলে? নাম পাল্টালে মানুষটি বদলে যাবে! বড়ো বউমা লাবণ্যের কথার পিঠে বলে।
লাবণ্যও ছাড়ে না।বলে,
– বড়দি, পৃথিবীতে সবকিছু পরিবর্তনশীল। কোনকিছুই স্থিতিশীল নয়। সব অনিত্য। আজ এরকম,কাল অন্যরকম। এটা পৃথিবীর নিয়ম।
বড় বউ কথা বাড়ায় না। সে বুঝতে পারে ছোট বউমা কি ধরনের! আমি মনেমনে হাসি। ভাবি, এবার সত্যিই জিতের! ধ্যুত! জিত নয় রূপের একটা কিছু হবে।
অনেক স্বস্তি পাই আমি।
আমি ড্রইংরুমে শুতে যাই রাতে। এতোদিন রূপ,আমি এক ঘরে শুতাম। ছোটবউমা আসার পরে ড্রইংরুমে থাকি।
আজ আমি একা। ভাবি, ছোট বউমা ঠিকইতো বলেছে,- পৃথিবীর সব পরিবর্তনশীল। কিছুই নিত্য নয়, অনিত্য। এসব তথাগত বুদ্ধের কথা।
প্রতিদিনের মতো সকাল হয়।
সকালের নাস্তা আসে।রূপ তখনও বিছানায়। ছোট বউমা নাস্তা- চা এনে বলে,
– বাবা,খেয়ে নিন।
– রূপ কোথায় বউমা?
– ঘুমুচ্ছে।
– সেকি! ঘুমুচ্ছে? বড়ো বউমা বকবে।
– বড়দা ওতো ঘুমুচ্ছে।বকবে কেন বাবা?
– কি বলছো তুমি লাবণ্য? হনহন করে ড্রইংরুমে এসে বড়ো গলায় বড়ো বউমা বলে।
– ঠিকই বলেছি বড়দি।এক ঘরে দুইজনের জন্য দু’টো নিয়ম হবে কেন?একটি নিয়মই হবে। ছোট বউমা উত্তর দেয়।
– জিততো কিছু করে না।বসেবসে খায়,অন্ন ধ্বংস করে।
– ও জিত নয় বড়দি।গতকাল থেকে সে রূপ নামে পরিচিত।আর সে বসে খায় না।ঘরের সব কাজ করে।তারপর খায়।
– ও, সে কথা। বাজারে যাবে কে শুনি?
– এখন থেকে আমি যাবো।
– রান্না?
– আমি করবো।
ছোট বউমার কথায় বড়ো বউমা চুপ হয়ে যায়। একটুপর আবারো বলে,
-সংসারের খরচ কে দেবে?
আমি চুপ থাকতে পারলাম না।বললাম,
– আমি পেনশনের সব টাকাতো দিচ্ছি। বড়ো বউমা ঐ নিয়ে আর কথা নয়।
রূপ-লাবণ্য!
ওদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখতে দারুণ লাগে। ভগবান আমার, দ্বীপান্বিতার কথা শুনেছে।আমার রূপ সারাটা জীবন সবার কথা শুনেছে, কাজ করেছে, লাঞ্ছিত হয়েছে। এবার আর চিন্তা নেই রূপের।
সেই সময় লাবণ্য আসে। কাছে ডাকি। পাশে বসতে বলি।
বসে।আমার চোখে জল। চেপে ধরি। পারি না। যেন ঝুপঝুপ ঝরছে। চোখের জল দেখে ছোট বউমা জল মুছে বলে,
– বাবা,আপনি কাঁদছেন? কেন কাঁদছেন?
-আমার রূপের জন্য!
– আমি এসেছি বাবা।আমি আছিতো! ওর জন্য ভাববেন না।
– জানো মা? ও ভীষণ সহজ। কি বলে, কি বলছে,কি করছে, কিছুই বুঝে না। জোর করেই বিয়ে দিয়েছি অভিজিত,আমি।
– বাবা আমি সব জেনেই বিয়ে করেছি। আমি মা- বাবার এক মাত্র সন্তান। লেখাপড়া করেছি। আমার স্বপ্ন ছিলো রূপের মতো একটি ছেলেকে বিয়ে করবো। যে কিছুই জানবে না। আমি আমার মনের মতই তৈরি করবো তাকে।
সে হবে সাধারণের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আলাদা।
তখনই রূপ আসে।
আমাকে, বউমাকে দেখে লজ্জা পায়। ফিরে যায়। লাবণ্য ডাকে,
– কোথায় যাচ্ছো?
উত্তর দেয় না। ছোট বউমা রূপের হাত ধরে আমার পাশে বসিয়ে বলে,
– কিছু বলবে? কিছু চায়? বলো।
একটু হাসে। টুক করে বলে,
– একটা কথা আছে।
– বলো।
– বাবার সামনে নয়!
– ও সেই কথা! ঠিক আছে চলো, আমাদের ঘরে।
ছোট বউমা রূপের হাত ধরে নিজের ঘরে যায়।আমি ওদের যাওয়া দেখি। ভীষণ ভালো লাগে আমার। রূপকে লাবণ্য কতো ভালোবাসে।
সত্যিই আমার রূপ- লাবণ্যেই পরিপূর্ণ!

x