রিজিয়া রহমান

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:৩১ পূর্বাহ্ণ
10

খবরটা পেয়ে মেয়েকে ফোন দিলাম, বললাম রিজিয়া রহমান আর নেই। মেয়ে চিনতে পারল না। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হলো ইংরেজি মাধ্যমে পড়িয়ে ছেলেমেয়েদের বাংলা সাহিত্যের রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত করেছি দায়ী তো আমরাই! ওরা রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল এক-আধটু পড়েছে। ওরা জীবনানন্দ কিংবা শামসুর রাহমানকে জানে না। ওরা সুনীল পড়েনি সমরেশ পড়েনি। রিজিয়া রহমান কিংবা সেলিনা হোসেন তো পড়েইনি। মহাশ্বেতা দেবী-ও না। হুমায়ূন আহমেদ দু-একটা পড়লেও পড়তে পারে।
গল্প উপন্যাস পড়ার প্রচণ্ড নেশা ছিল এক সময়। কেমন করে যেন এই মধুর নেশা কেটে গেল। ঠাকুর মা-র ঝুলি দিয়ে হাতে খড়ি। ক্রমশ নিহাররঞ্জন ছেড়ে শরৎ বাবু তারপর ক্রমাগত ডুবেছি সুনীল, মহাশ্বেতা, সমরেশ, রিজিয়া রহমান, সেলিনা হোসেন মোটামুটি বাংলাদেশের সব উপন্যাসিকের লেখায় আগ্রহী ছিলাম। হুমায়ূন আহমেদ একসময় বুকশেলফ দখল করে নেন। কিন্তু রিজিয়া রহমানদেরও ছাড়িনি। ঈদ সংখ্যার জন্য আমাদের অস্থির প্রতীক্ষা তাই প্রমাণ করে। রিজিয়া রহমান ছিলেন প্রথা বিরোধী লেখক। তাঁর প্রতিটি লেখা ছিল গবেষণাধর্মী ও সাহসী। তিনি তাঁর লেখায় বহু মাত্রিকতা ও দেশজ আখ্যানের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। উত্তর পুরুষ, রক্তের অক্ষর, রং থেকে বাংলার ধবল জ্যোৎস্নার মত আরো একটি কালজয়ী উপন্যাস লিখেছেন। বাঙালি জাতি সত্তার স্বরূপ খুঁজতে তিনি বার বার ইতিহাসের দ্বারস্থ হয়েছেন। মৃত্যুর আগে ৭১-র স্মৃতিকথা লিখে গেছেন দুঃসময়ের স্বপ্ন সিঁড়ি। যেটি প্রকাশিত হয় নি। সত্তর ও আশির দশক জুড়ে রিজিয়া রহমানের সগর্ব উপস্থিতি ছিল গল্প ও উপন্যাসে। মার্কিন গবেষক ও লেখক ক্লিন্টন বুথ, গিলি তাঁর ইংরেজি বই বরিশাল এন্ড বিয়ন্ড-এ দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন কথা শিল্পী রিজিয়া রহমানের ওপর। এই গ্রন্থটি জীবনানন্দের ওপর পূর্ণাঙ্গ গবেষণাধর্মী লেখা এই গ্রন্থের সিরিয়াস সাহিত্য দ্য প্রোজ। ‘ফিকশন অব বাংলাদেশ’জ রিজিয়া রহমান। পরিচয় অনুসন্ধান প্রবলভাবে আধুনিক সাহিত্যের আওতার মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে কথা সাহিত্যে রিজিয়া রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ছয় বছর পর ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তার উত্তর পুরুষ উপন্যাসে পরিচয়ের সংকটের একটি দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে বাংলাদেশের ধমনী দিয়ে বহু ধরনের মানুষের রক্ত প্রবাহমান সেইসব মানুষ এই অঞ্চলে এসেছে পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ থেকে। পতুর্গিজেরা এসেছে তাদের জাহাজে চড়ে। একইভাবে বাংলাভাষা সম্পর্কে রিজিয়া রহমান লিখেছেন বাংলা ভাষা ক্রমাগতভাবে অর্থাৎ যুগ যুগান্তর ধরে নানা বিদেশি শব্দ চয়ন করে তার শ্রী এবং গতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে। (বং থেকে বাংলা)
শৈশব থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর গল্প কবিতা ছাপা হতো। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ অগ্নি সাক্ষর প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও ক্লেদ নিয়ে রচনা করেন, ঘরভাঙা ঘর। ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত তাঁর উত্তর পুরুষ উপন্যাসে তিনি চট্টগ্রামের হার্মাদ জলদস্যুদের অত্যাচার ও পতুর্গিজ ব্যবসায়ীদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেন। এতে বর্ণিত হয়েছে আরাকান রাজসন্দ সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতার বীরত্ব। পতুর্গিজদের গোয়া, হুগলি ও চট্টগ্রাম দখলের ইতিহাস। নিষিদ্ধ পল্লীর নারীদের নিয়ে মানবেতর দৈনন্দিন জীবন নিয়ে লিখেছেন রক্তের অক্ষর। তার অদম্য সাহসী লেখা আমাদের জানিয়ে দেয় লেখার জন্য পরিশ্রম করতে হয়, গবেষণা করতে হয়, প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়।
তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। একুশে পদক, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার ছাড়া আরও বহু পুরস্কার অর্জন করেন। রিজিয়া রহমান ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতার ভবানিপুরে এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল জোনাকি। তার বাবা আবুল খায়ের মোহাম্মদ সিদ্দিক ছিলেন একজন চিকিৎসক মা মরিয়ম বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তাঁরা বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) চলে আসেন।
বাবার বদলির চাকরির কারণে তার শিক্ষা জীবন নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাগ্রহণ শুরু হয়। বাবার মৃত্যুর পর চাঁদপুরে মামার বাড়িতে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি। প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে মেট্রিক পাস করেন। বিয়ের পর পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান স্বামীর সাথে। পরবর্তীতে তিনি ইডেন মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। আরও পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর স্বামী মিজানুর রহমান একজন ভূতত্ত্ববিদ এবং একমাত্র ছেলে আব্দুর রহমান। রিজিয়া রহমান বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথা সাহিত্যিক তাঁর উপন্যাস ও গল্প বিষয়-বৈচিত্র্যে অনন্য। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে আধুনিক বাংলাদেশের জন্মকথা, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-লড়াই তিনি গল্প উপন্যাসে বিষয়গুলো অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। রিজিয়া রহমানের উপন্যাস অনেক দিন পড়া হয়নি। হঠাৎ করে তাঁর মৃত্যু সংবাদটি বুকের মধ্যে শূন্যতায় ভরে দিল পাঠক লেখকের মধ্যে একটা অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়। কোন প্রিয়জন হারানোর মত এক ধরনের হাহাকারও তৈরি হয় চারপাশটায় কোন প্রিয় লেখকের মৃত্যুতে। আগেও সেটা অনুভব করেছি। আমাদের চর্চায় ও ভালোবাসায় বেঁচে থাকুক প্রিয় কথাশিল্পী রিজিয়া রহমান। তাঁর সাহিত্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিস্তৃতি পাক। জানুক আমাদের শেকড় ও অস্তিত্বের ইতিহাস।

x