রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র শাফা’য়াত

শুক্রবার , ২২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:১৫ পূর্বাহ্ণ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি ঈমানকে আমাদের কাছে প্রিয় করেছেন ঈমান দ্বারা আমাদের অন্তরাত্না সজ্জিত করেছেন। কুফরি পাপাচার ও অবাধ্যতা আমাদের নিকট অপ্রিয় করেছেন। আমরা আল্লাহর প্রশংসা করছি, তারই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করছি, তাঁরই উপর ভরসা করছি, আমাদের আত্মার অনিষ্ঠতা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। মন্দ কাজের প্রভাব থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যাকে হেদায়ত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারেনা। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন কেউ তাকে হেদায়ত করতে পারে না।
হে মানব মন্ডলী! আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সর্বশেষ নবী সৈয়্যদিল মুরসালীন ও শফিউল মুজনেবীন হিসেবে প্রেরণ করেছেন আল্লাহ তা’য়ালা স্বীয় বাণী “ হে মাহবুব! আমি আপনার জন্য আপনার স্মরণকে সুউচ্চ করেছি। (সূরা: ইনশিরাহ)
পবিত্র কুরআনের আলোকে রাসূলুল্লাহ’র শাফায়াত: মহান আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন, (হে রাসূল) আশা করা যায় আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, মাকামে মাহমুদ-এ অর্থাৎ প্রশংসিত স্থানে (সূরা: বনী ইসরাইল: ৭৯)
হাদীস ও তাফসীর বিশারদগণের বর্ণনা মতে “মাকামে মাহমুদ” দ্বারা শাফায়াত বুঝানো হয়েছে,
হাদীস শরীফের আলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র শাফায়াত:
বিশ্বনবী শাফায়াতের কান্ডারী মুক্তির দিশারী সৃষ্টিকূলের সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক গুনাহগার উম্মতের জন্য শাফায়াত করার বিষয়টি কুরআন সুন্নাহর আলোকে মুজতাহিদ ইমামগণের ঐক্যমতের ভিত্তিতে প্রমাণিত। কিয়ামতের সংকটময় মুহূর্তে ঈমানদার পাপী-তাপী গুনাহগার বান্দাদের পাপরাশি ও শাস্ত্তি ক্ষমার জন্য প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মহান আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে সুপারিশ করার নামই শাফা’আত, তিনিই প্রথমে শাফাতের দরজা উন্মূক্ত করবেন, যেহেতু তিনিই মাকামে মাহমুদ তথা সুউচ্চ প্রশংসিত স্থানে সুমহান মর্যাদার অধিকারী। হযরত কা’ব বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “কিয়ামতের দিন লোকদের যখন উঠানো হবে, তখন আমি ও আমার উম্মত সম্মানিত স্থানে অবস্থান করবো। আমার প্রতিপালক আমাকে বেহেস্তী সবুজ পোশাক পরিধান করাবেন। অত:পর আমাকে শাফায়াতের অনুমতি দেয়া হবে। অত:পর আমি আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী আমার কথা বলবো সেটাই “মাকামে মাহমুদ”।
কবীরা গুনাহকারী উম্মতের জন্য নবীজির সুপারিশ থাকবে: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার শাফা’আত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারী উম্মতের জন্য। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং: ২৪৩৫, আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং ৪৭৩৯)

নবীজিকে শাফা’আতের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে: প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবু মুসা আশআরী এরশাদ করেছেন, আমাকে এখতিয়ার দেয়া হয়েছে, আমি কি শাফায়াতের মর্যাদা গ্রহণ করবো, না আমার অর্ধেক উম্মতকে জান্নাত দিব এ দু’টি হতে আমি শাফা’আত কে গ্রহণ করেছি। কেননা এটি ব্যাপক এবং (আমার সকল উম্মতের জন্য যথেষ্ঠ হবে) তোমরা কি শাফা’আত শুধু মুত্তাকীদের জন্য মনে করেছো, বরং সেটা হবে গুনাহগার পাপীদের জন্য, অন্যায়ে লিপ্তদের জন্য হবে।
(ইবনে মাযাহ, হাদসি নং: ৪৩১১)
কিয়ামত দিবসে জান্নাতীরা আবেদনকারী জাহান্নামীদের সুপারিশ করবেন: হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন লোকেরা সারিবদ্ধ হবে। ইবনে নুমাইর বলেন, একজন দোজখী লোক জান্নাতী লোকের নিকট দিয়ে অতিক্রম করবে, সে বলবে হে অমুক, তোমার কি স্মরণ আছে যে তুমি একদিন আমার কাছে পানি যাচনা করেছিলে আমি তোমাকে পানি পান করিয়েছি। বর্ণনাকারী বলেন, তখন সে জান্নাতী লোকটি দোজখী লোকটি’র জন্য সুপারিশ করবেন, আরেকজন ব্যক্তি দ্বিতীয় আরেক জনের নিকট দিয়ে গমন করবে সে বলবে তোমার কি স্মরণ আছে আমি তোমাকে পবিত্রতার জন্য পানি দিয়েছিলাম। তখন তিনিও তার জন্য সুপারিশ করবেন। আরেক ব্যক্তি বলবে হে অমুক তোমার কি স্মরণ আছে যে তুমি আমাকে সেই কাজের জন্য প্রেরণ করেছিলে আমি তোমার কাজের জন্য গিয়েছিলাম। অত:পর তিনিও তার জন্য সুপারিশ করবেন। (ইবন মাযাহ হাদীস নং: ৩৬৮৫)
কিয়ামতের ময়দানে নবীজি হবেন প্রথম শাফায়াতকারী: কিয়ামতের ময়দানে সম্মানিত নবীগণ আলাইহিস সালাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তবে তাবেঈন, আহ্‌লে বায়তে রাসূল,শুহাদায়ে কেরাম, হক্কানী ওলামায়ে কেরাম সুপারিশ করবেন, বিভিন্ন স্তরে শাফায়াত হবে।
শাফায়াতে কোবরা তথা প্রধান ও বৃহৎ শাফা’আত নবীজির জন্য নির্দ্দিষ্ট হবে। নবীজির অনন্য অসাধারণ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব কিয়ামতবাসী অবলোকন করবেন। তাঁর অনন্য উচ্চতায় অন্য কেউ উপনীত হতে পারবেন না। এরশাদ হয়েছে, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছে আমি রাসূলগণের সরদার, সর্বশেষ নবী এতে আমার কোন অহংকার নেই। আমি প্রথম শাফায়াতকারী এবং প্রথমে আমার শাফায়াত কবুল করা হবে। এতে আমার কোন অহংকার নেই। (দারমী, আল-মুসনাদ, হাদীস নং: ৫০)
বিশুদ্ধ অন্তরে কলেমা পাঠকারীর জন্য নবীজির সুপারিশ: তাওহীদ ও রিসালতে বিশ্বাসী। বিশুদ্ধ অন্তরে একনিষ্ঠভাবে কলেমা পাঠকারী ব্যক্তিকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাফায়াত দানে ধন্য করবেন। এরশাদ হয়েছে, সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, ঐ ব্যক্তি আমার শাফায়াত দ্বারা সৌভাগ্যবান হবে। যে বিশুদ্ধ অন্তর দিয়ে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু পাঠ করবে। (বোখারী শরীফ, হাদীস নং: ৯৭)
নবীজি আল্লাহর আদেশক্রমে সুপারিশ করবেন: কিয়ামতের ময়দানে কঠিন ক্রান্তিকালে সংকটময় মুহূর্তে অসহায় গুনাহগার উম্মতদের কল্যাণকামী ও পাপী বান্দাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে পবিত্রানের জন্য শাফায়াতের কান্ডারী হিসেবে নবীজি আল্লাহর আদেশক্রমে সিজদা থেকে শির উত্তোলন করত: আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবেন, এরশাদ হয়েছে, প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু কর্তৃক বর্ণনায় এরশাদ হয়েছে অত:পর বলা হবে হে মুহাম্মদ! সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার মস্তক উত্তোলন করুন, আপনি প্রার্থনা করুন, আপনার সুপারিশ গৃহীত হবে। আমি আমার মস্তক উত্তোলন করে বলবো, হে প্রতিপালক! আমার উম্মত, আমার উম্মত, তখন আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে আদেশ দেবেন, জান্নাতের ডান পাশের সমস্ত লোকদের বিনা হিসেবে বেহেশতে প্রবেশ করান। (আশ-শিফা, ১ম খণ্ড, শাফায়াত অধ্যায়)
উম্মতের জন্য নবীজির সংরক্ষিত দুআ: প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহর দরবারে প্রত্যেক নবীদের একটি দুআ ছিলো যা নবীগণ আল্লাহর সমীপে নিবেদন করতেন, আমার দুআকে কিয়ামতের দিনে আমার উম্মতের শাফায়াতের জন্য আমি সংরক্ষণ করে রেখেছি। (শিফা শরীফ)
মদীনা মনোয়ারায় মৃত্যুবরণকারীদের জন্য নবীজির শাফায়াত: পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহর, নবীজির পদধূলিতে ধন্য বরকতমন্ডিত নূরানী শহর, নবীজির হিজরতের স্থান, আসমানী প্রত্যাদেশ অহী অবতরণ স্থল। মদীনা মুনাওয়ারায় ইন্তেকালকারী ব্যক্তি সৌভাগ্যবান হিসেবে বিবেচিত। তাঁর জন্য নবীজির শাফায়াত’র শুভ সংবাদ রয়েছে এরশাদ হয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যার মৃত্যু মদীনায় এসে পৌঁছে সে যেন মদীনাতেই মৃত্যু বরণ করে। কেননা মদীনায় মৃত্যু্লবরনকারীদের জন্য আমি সুপারিশকারী হব।
হে আল্লাহ! আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন, আমাদের কাজ সহজ করে দিন, ইহকাল পরকালে আমাদের মকসুদ পূর্ণ করুন। ইয়া রাব্বাল আলামীন, হে আল্লাহ! আপনার ভালবাসা ও আপনার প্রিয় হাবীবের মহব্বত আমাদেরকে নসীব করুন। হে দয়াময় প্রভূ আপনার নবী ও প্রিয় রাসূলের ওসীলায় আমাদের দুআ কবুল করুন। কিয়ামতের দিবসে নবীজির শাফায়াত আমাদের দান করুন, নিশ্চয় আপনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না। আমাদের সকলকে কুরআনের বরকত দান করুন, কুরআনের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দানশীল সৃষ্টি জগতের অধিপতি পূণ্যময় অনুগ্রহশীল, দয়ালু, আমীন।
লেখক : খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

x