রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুদ্ধতা প্রসঙ্গে

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৮ পূর্বাহ্ণ
39

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনার কার্যকর নির্দেশনায় সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের অনড় পরিক্রমায় দেশের রাজনীতি নিয়ে অতিসম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতির মন্তব্য নতুন মাত্রিকতায় সমৃদ্ধ হয়েছে। সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে দেশ ও বিশ্বপরিমন্ডলে প্রশংসিত দেশের বর্তমান উন্নয়ন-অগ্রগতির অবস্থান সুসংহত ও টেকসই করার লক্ষ্যে পরিশুদ্ধ রাজনীতি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন অপরিহার্য। দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক রাষ্ট্রপতির ভাষণে এই সত্যটি অনবদ্য ও সাবলীল নতুন বার্তার সুদৃঢ় উচ্চারণ।
ইতোমধ্যে দেশবাসী অবলোকন করছে যে, রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে দ্রুততার সাথে অনৈতিক ব্যবসা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের জন্য পেশী-তদবির-অপকৌশলের মাধ্যমে বেশ কিছু রাজনীতিক দেশকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। দারুণভাবে কলুষিত হয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘রাজনীতিতে এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও আগ্রহ কমে যাবে। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হবে। রাজনীতি তখন আর রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না, যা কোনভাবেই কাম্য নয়।’
এটি সর্বজনবিদিত যে, রাজনীতির উদ্দেশ্য মূলতঃ সৎ ও সুন্দর কর্ম দিয়ে জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করা। এটি কোনভাবেই আরোপিত নয়, অবশ্যই অর্জিত একটি মহৎ গুন। হয়তোবা বংশ পরম্পরায় যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে নেতৃত্বের শিখরে পৌঁছুনো অনেকের পক্ষে সম্ভব, কিন্তু তা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ন্যুনতম মেধা, ত্যাগ, যোগ্যতা অর্জন না করে চলচাতুরীর মাধ্যমে রাজনৈতিক বদান্যতায় সাময়িক বিভিন্ন পদ-পদবী দখল করা যায়, তবে তা সততা, সত্যবাদীতা, আদর্শের বিপরীত স্রোতে প্রবাহমান – এটিই ইতিহাস স্বীকৃত। সভ্যতার বাস্তবতা এই যে, আপামর জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও সমর্থন ব্যতীত অশুভ নেতৃত্বের বিকাশ দেশকে অনগ্রসরতার পথেই এগিয়ে নেবে, আধুনিক, মানবিক ও প্রাগ্রসরতার পথে নয়। এই ধরণের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিস্তার ব্যক্তি স্বার্থকেই প্রাধান্য দেয় এবং জনগণের সম্পদ লুন্টনে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রবক্তা গ্যাব্রিয়েল এ আলমন্ড এর ধারণায়, এটি একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা সুনির্দিষ্ট কর্মযজ্ঞের অনুশীলন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণকে আচরণগত শিক্ষায় পরিশীলিত করে। সংস্কৃতির অনন্য উপাদান – মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষা, নৈতিকতা, আদর্শ ইত্যাদিকে ধারণ করেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আত্মশুদ্ধি ও আত্মমর্যাদায় বলিয়ান ব্যক্তিত্বের সমন্বয় রাজনৈতিক সংসৃ্কতির বিকাশমানতাকে ঋদ্ধ করে। লুসিয়ান পাই এর মতে, “The nation of political culture assumes that the attitudes, sentiments and cognitions that inform and govern political behaviour in any society are not just random congeries but represent coherent pattern which fit together and are mutually reinforcing. In spite of the great potentialities for diversity in political orientations, in any particular community there is a limited and distinct political culture which gives meaning, predictability and form to the political process.”

উল্লেখিত সংজ্ঞায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া যায়। সমাজ-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিক রৌউই, রেই ম্যাকরিডিস্‌সহ প্রায় মনীষী একই ধরণের ধারণা পোষণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির জীবনোপায় বা জীবননির্বাহের পর্যাপ্ত সক্ষমতা। অন্যের উপর নির্ভরশীল জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত কোন ব্যক্তির পক্ষে আদর্শিক, সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্বের গুনাবলী অর্জন করা খুবই দূরূহ ব্যাপার। মনীষী কার্ল মার্কসসহ অনেকেই এই বক্তব্যে বিশ্বাসী অর্থাৎ জীবননির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বা আর্থিক প্রণোদনা (ংঁনংরংঃবহপব বপড়হড়সু) ব্যতিরেকে ত্যাগী নেতৃত্বের বিকাশ সম্ভব নয়। মোদ্দাকথায় `a subsistence economy is a non-monetary economy wherein basic needs are fulfilled by the acquisition and use of natural resources on the personal, family, or local level. এই বাস্তব ভিত্তির অভাব কখনো যোগ্য নেতৃত্বের অনুকূলে পরিবেশিত নয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মহান বাবা শেখ লুৎফর রহমান সাহেব তাঁকে বলেছিলেন, “বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না । আর একটা কথা মনে রেখ, ‘ংরহপবৎরঃু ড়ভ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব ধহফ যড়হবংঃু ড়ভ ঢ়ঁৎঢ়ড়ংব্থ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।” বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে অত্যন্ত আবেগজড়িত বাক্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তাঁর পিতার এই অমর উপদেশবাণীকে রাজনৈতিক জীবনের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে শহরের কতিপয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর বাবাকে তাঁর জীবন নষ্ট হওয়ার সংশয়ে কিছু বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন, “দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছেনা; যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে; তাতে আমি দুঃখ পাব না। জীবনটা নষ্ট নাও তো হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দিব না। আমার মনে হয়, পাকিস্তান না আনতে পারলে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না।”
পরিশুদ্ধ রাজনীতিকের জন্য ংঁনংরংঃবহপব বপড়হড়সু্থর গুরুত্বের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর পিতার বক্তব্য অতীব প্রদ্যুতিত। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, “আমাদের জন্য কিছু করতে হবে না। তুমি বিবাহ করেছ, তোমার মেয়ে হয়েছে, তাদের জন্য তো কিছু একটা করা দরকার।” আমি আব্বাকে বললাম, “আপনি তো আমাদের জন্য জমিজমা যথেষ্ট করেছেন, যদি কিছু না করতে পারি, বাড়ি চলে আসব। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া চলতে পারে না।” কোন এক সময় গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।”
স্বপ্রতিষ্ঠিত স্বাধীন দেশকে আত্মনির্ভর ও আত্মমর্যাদায় সমাসীন অর্থাৎ স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বঙ্গবন্ধুর এই দৃষ্টান্ত এই বিশ্বে দ্বিতীয়টি আছে কিনা আমার জানা নেই। সেজন্য তিনি বিশ্ব-ইতিহাসের অধ্যায়ে রাজনীতির এক মহান কবি, শুদ্ধ রাজনীতির অমর অক্ষয় পথিকৃত এবং কালজয়ী এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। দলের জন্য কাজ করতে গিয়ে যে আদর্শিক চেতনা বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, আজকের দিনে রাষ্ট্রপতির বার্তায় বঙ্গবন্ধুর সেই জীবন-আদর্শকেই নির্দেশিত করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিতকে অনুসরণ এবং পরিপূর্ণভাবে ধারণ করে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পরিচ্ছন্ন করার অভিনব সুযোগের সন্ধান দিয়েছেন তাঁর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।
দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালের ৩০ মে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগের দৃষ্টান্ত অতীতেও বঙ্গবন্ধু স্থাপন করেছিলেন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিস্বার্থ, অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা-আধিপত্য নয়; বরং দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণে আত্মত্যাগের মহিমায় অভূতপূর্ব ভাস্বর বঙ্গবন্ধুর জীবনপ্রবাহ। কোন এক সময় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “আমাকে জেল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করল অনশন ধর্মঘট না করতে তখন আমি বলেছিলাম, ছাব্বিশ-সাতাশ মাস বিনাবিচারে বন্দি রেখেছেন। কোনো অন্যায়ও করি নাই। ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব, হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায় না হয় মৃত অবস্থায় যাব। Either I will go out of the jail or my dead body will go out.” এই ধরণের মরণ-পণ রাজনৈতিক আদর্শের প্রয়োজনীয়তা কত যে অনিবার্য হয়ে পড়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। সত্য, সততা, আদর্শেরই জয় হোক – আজকের দিনে দেশবাসীর এটিই একমাত্র কামনা।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x