রামকৃষ্ণ রবিবাউল ও মহাত্মা লালন

ইকবাল হায়দার

শুক্রবার , ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৩৮ পূর্বাহ্ণ
67

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ তথা ১৮৯০ সাল পর্যন্ত কোলকাতার সকল মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণী ও সমাজের কাছে এই বিশ্বাস প্রগাঢ় ছিল যে দাক্ষিণাত্যের কালীবাড়ীর পৌরহিত্য শ্রী রামকৃষ্ণ পরহিংসের (জন্ম ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৬ – মৃত্যু ১৬ই আগস্ট, ১৮৮৬) চেয়ে মহাত্মা, ব্রহ্মজ্ঞানী, তত্ত্ববিধ, জ্ঞানতাপস, গুণধর ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, যোগসাধক ও দার্শনিক আর এই বাংলায় নেই। অর্থাৎ ১৮৭০ এর দশকের মধ্যভাগ থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের নিকট তিনি হয়ে ওঠেন হিন্দু পুনঃজাগরণের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার কিছু দার্শনিক ও তত্ত্ববাক্য তৎকালীন সমাজে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিল।
যেমন- ‘আমার ধর্ম ঠিক আর অপরের ধর্ম ভুল, এমন মত ভাল নয়’।
‘ঈশ্বর এক বৈ দু নেই, তাকে ভিন্ন ভিন্ন লোকে ভিন্ন নামে ডাকে। কেউ বলে গড, কেউ বলে কৃষ্ণ, কেউ বলে আল্লাহ্‌, কেউ বলে শিব, কেউ বলে ব্রহ্ম’।
যেমন- পুকুরের জল, এক ঘাটের লোক বলছে ‘জল’, আরেক ঘাটের লোক বলছে ‘ওয়াটার’, অন্য ঘাটের লোক বলছে ‘পানি’।
হিন্দু বলে জল, খ্রিস্টান বলে ওয়াটার, মুসলমান বলছে পানি, কিন্তু বস্তু এক।
‘একেকটি ধর্মের মত একেকটি পথ ঈশ্বরের দিকে বয়ে যায়। যেমন- নদী নানা দিক থেকে এসে সাগরে মিশে যায়’।
কেশবচন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪) নামে ঊনিশ শতকের একজন বাঙালি বুদ্ধিজীবী, ব্রহ্মনেতা ও সমাজ সংস্কারক কলকাতায় রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে পরিচিত করে দিয়ে তৎকালীন সমাজে বিপুল সাড়া জাগান।
তখন রামকৃষ্ণকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন, ‘তিনি বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের ঠাকুর, ভারতের শেষ অবতার, কল্পভারতাত্মা, নির্লোভ নিরহংকার নিরাভরন, নিরক্ষর অথবা স্বল্পাক্ষরজ্ঞানী, তার কথামৃত, সে এক অপার বিস্ময়। শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমে বাকরুদ্ধ হয়ে যান পৃথিবীর জ্ঞানীগুণীরা। তার যুক্তি ধারা সেতো যুক্তিবাদী বিজ্ঞানের অতীত, যেন অলৌকিক মহিমা বিস্তার করে হয়ে উঠেছেন ভক্তের ভগবান। যুগে যুগে ঈশ্বর প্রেরিত মানবগণ যেমন মুহাম্মদ (সঃ), যীশু, বৌদ্ধ, শ্রী চৈতন্য, কনফুসিয়াস, মহাবীর নানদ কবির, জরস্ট্রুষ্টরা চিরকাল মানব সভ্যতার বিস্ময় তেমনি অন্য এক সাধারণ নিঃসন্তান গ্রাম বাংলার গরীবঘরের একজনের কাছে ছুটে এসেছেন বিশ্বের মহা গুণীজন।’
এই যখন আবহ, কৃষ্ণভক্তি, তখন হঠাৎ মীর মোশার্‌রফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী পত্রিকায়’ ১৮৯০ এর ৩১শে অক্টোবর রাইচরণ দাশের একটি লেখা শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভক্তপূর্ণ কলকাতার ব্রহ্মসমাজ, সচ্ছল শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, প্রভাবশালী অংশকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে দারুণ শোরগোল তোলে। তিনি লিখলেন, “লালন ফকির নামে বাউলদের মধ্যে একজন বড় মহাত্মা ছিলেন তিনি আর ইহলোকে নেই। তিনি ধর্ম জীবনে বিলক্ষণ উন্নত ছিলেন, নিজে লেখাপড়া জানিতেন না কিন্তু তাঁহার রচিত অসংখ্য গান শুনিলে তাহাকে পরম পণ্ডিত বলিয়া মনে হয়। তাঁহার অন্তদৃষ্টি খুলিয়া যাওয়ায় ধর্মের সারতত্ত্ব জানিবার অবশিষ্ট ছিল না। সকল ধর্মের লোকে তাকে আপন বলিয়া জানিত।” এই লালনের মতো এক গেঁয়ো অথচ প্রকৃত মহাত্মার আবিষ্কারে একটা শোরগোল পড়ে গেল।
মজার বিষয়, শ্রী রামকৃষ্ণের যে সকল গুণ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি প্রভাবশালী অংশকে আকর্ষণ করেছিল, সে সমস্ত গুণ লালনের মধ্যেও যে ছিল, তা উদ্ধৃত লেখায় বেশ জোর দিয়ে বলা হল।
এই বিবরণেঃ-
প্রথমতঃ লালনের ‘ভদ্র’- লোকায়ত নীতিহ বোধ,
দ্বিতীয়তঃ চূড়ান্ত নিরক্ষরতা সত্ত্বেও চূড়ান্ত পাণ্ডিত্য,
এবং
তৃতীয়তঃ তার অন্তর্দৃষ্টি খুলে যাওয়া খুবই গুরুত্ব পেয়েছে।
এই ধরনের কথা তো পরমহংস রামকৃষ্ণ সম্বন্ধে আগে থেকে প্রচলিত ছিল। মধ্য-‘ভিক্টরীয়’ ‘ভদ্র’ – লোকায়ত নীতিবোধের সঙ্গে, নৈতিক ব্যবহারের সঙ্গে অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার সহাবস্থান প্রমাণিত, এবং প্রচারিত না হলে তো ভদ্র-অভদ্র কোনও গুরুর পক্ষেই ভদ্রসমাজে কল্কে পাওয়া আদৌ সম্ভব ছিল না। ‘হিতকরী’ লালনের জন্য এই কাজটি করলেন। ভৌগোলিক বিচারে যাকে ‘মধ্যবঙ্গ বলা যায়, সেখানকার কয়েকজন বুদ্ধিজীবী লালন ও তার বাউল-সম্প্রদায়ের খোঁজখবর রাখতেন। তারা হলেন হরিনাথ মজুমদার, মীর মোশার্‌রফ হোসেন (‘হিতকরী’ পত্রিকার সম্পাদক), জলধর সেন, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এবং রাইচরণ দাস। লালনের মতো এক গেঁয়ো, অথচ প্রকৃত ‘মহাত্মা’-র আবিষ্কারে একটা হতবাক বিস্ময় ও অভাবিত চাঞ্চল্য পড়ে গেল। এমন পরিস্থিতি দক্ষিণেশ্বরের ‘পুরোহিত’ রামকৃষ্ণের আবিষ্কারের পরেও দেখা গিয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রে ব্রহ্মজ্ঞানীদের ভূমিকা লক্ষ্যণীয় হয়ে ওঠে।
শ্রী রামকৃষ্ণকে যেমন পরিচিত করালেন কেশবন্দ্র সেন। তেমনি লালনকে বাঙালির সংস্কৃতি ঐতিহ্যে সু-প্রতিষ্ঠিত করলেন জোড়াসাঁকোর ব্রহ্মজ্ঞানী ঠাকুর পরিবার। একথা বেশ জোর দিয়েই বলা যায় যে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির এবং বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের অম্বেষণ এবং সুদৃঢ় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে, মধ্যবঙ্গীয় বুদ্ধিজীবীদের প্রচার সত্ত্বেও, হিন্দু-পুনরুত্থানবাদের ধ্যানে তারকাচক্ষু বাঙালি হিন্দু-ভদ্রলোকরা লালনকে দেখতেই পেতেন না। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে উৎসারিত জোরালো প্রচার বাউল গানকে, এবং লালনকে অমরত্ব দান করল। লালন ফকির মরণেই অমর হয়ে গেলেন।
১৮৯০ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত লালন সম্বন্ধে গ্রন্থ রচনা করেছেন ৪৪ জন লেখক; প্রবন্ধ রচনা করেছেন ১৫০ জন লেখক। গ্রন্থের এবং প্রবন্ধের সংখ্যানুসারে লালন যে রামকৃষ্ণের প্রায় কাছে উঠে এসেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। যারা ‘লালন চর্চা’ করেছেন তাদের মধ্যে আছেন অন্নদাশংকর রায়, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, কেরোল সোলোমন, চিত্তরঞ্জন দেব, তুষার চট্টোপাধ্যায়, তৃপ্তি ব্রহ্ম, বসন্তকুমার রায়, রাহুল পিটার দাস, শক্তিনাথ জা, সনৎকুমার মিত্র, সুধীর চক্রবর্তী এবং সোমেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। এখন তো বোধোদয় হয়েছে যে, পশ্চিমী হাওয়ার সংস্পর্শে না আসতে পারলেও গ্রামের সাধক ও মরমী কবিদের প্রভাবে এই উপেক্ষিত জনসাধারণের মনোজগৎ কলকাতার শিক্ষিতদের তুলনায় কম সমৃদ্ধ ছিল না।
“এমনও ভাব যায় যে, জোড়াসাঁকো পরিবারের একজন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ অঞ্চলে বিস্তীর্ণ জমিদারির সূত্রে লালনের এবং স্থানীয় অন্যান্য বাউলদের খবর পেতেন। তাঁর পুত্র জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনের যে স্কেচ এঁকেছিলেন সেই পবিত্র মূর্তি বৃদ্ধ সাধকের স্কেচ এখনও দেখা যায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র নন্দনাল বসুও লালনের একটি অসামান্য স্কেচ আঁকেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে অবস্থানকালে স্থানীয় বাউলদের সন্ধে পরিচিত হয়েছিলেন। বাউল ধর্ম, বাউলদের আধ্যাত্মিক সাধনা এবং বাউল গান সম্বদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শেষ পর্যন্ত বহু কথা লিখেছেন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এক কথাই বার বার বলেছেন। বাউলদের মধ্যে কারো কারো ইন্দ্রিয় পরায়ণতার বিরোধী হলেও তিনি বাউল সাধনার এবং গানের গুণগ্রাহী। তিনি লিখেছেন: ‘আমার লেখা যাঁর পড়েছেন, তাঁরা জানেন, বাউলপদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা সাক্ষাত ও আলাপ-আলোচনা হত। আমার অনেক গানে আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে’। মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন ‘হারামণি’ (ঢাকা, ১৯৭৬) প্রথম খণ্ড “আশীর্বাদ”।
‘হারামণি; ১.পৃ. ৫৮: রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন; “ . . . এ জিনিস হিন্দুমুুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি.. এই মিলনে গান জেগেছে। সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু মুসলমানদের কন্ঠ মিশেছে, কোরানে পুরাণে ঝগড়া বাঁধে নি।”
রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিক রচনাবলী পড়ে এই মনে হয় যে,
প্রধানত তিনটি কারণে তিনি বাউল বা আধ্যাত্মিক সঙ্গীত এবং সাধনার দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
প্রথম কারণ ছিল বাউল গানের সরল, অথচ সুগভীর অর্থসম্পন্ন ভাষা এবং চিত্তাকর্ষক ছন্দ এবং সুর। রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাউল বা আধ্যাত্মিক সুরের প্রভাব সুবিদিত।
বাউলদের প্রতি রবীন্দ্রাথের আকর্ষণ বোধ করার দ্বিতীয় কারণ ছিল বাউলের ধর্মচিন্তায় উদারতার এবং অসাম্প্রদায়িক বিচারধারণার প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথ এটা জানতেন যে, বাউল ধর্মে বহু ভাল উপাদান সংমিশ্রিত হয়েছে। বাউলসাধনা হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত সাধনা। এই উদারতাকে তিনি খুব পছন্দ করতেন।

বাউল ধর্মে ‘বস্তুবাদ’ রবীন্দ্রনাথের বিচারে অভাবনীয় ছিল।
বাউল ধর্ম আত্মোপলব্ধির ধর্ম, এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বাউল ধর্মে রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধার তৃতীয় কারণ।
তিনি লিখেছিলেন:
ঙহব ফধু ও পযধহপবফ ঃড় যবধৎ ধ ংড়হম ভৎড়স ধ নবমমধৎ নবষড়হমরহম ঃড় ঃযব নধঁষ ংবপঃ ড়ভ ইবহমধষ … ডযধঃ ংঃৎঁপশ সব রহ ঃযরং ংরসঢ়ষব ংড়হম ধিং ধ ৎবষরমরড়ঁং বীঢ়ৎবংংরড়হ যিরপয ধিং হবরঃযবৎ মৎড়ংংষু পড়হপৎবঃব, ভঁষষ ড়ভ পৎঁফব ফবঃধরষং, হড়ৎ সবঃধঢ়যুংরপধষ রহ রঃং ৎধৎবভরবফ ঃৎধহংপবহফবহঃধষরংস … ওঃ ংঢ়ড়শব ড়ভ ধহ রহঃবহংব ুবধৎহরহম ড়ভ ঃযব যবধৎঃ ভড়ৎ ঃযব উরারহব যিরপয রং রহ গধহ হড়ঃ রহ ঃযব ঃবসঢ়ষব, ড়ৎ ংপৎরঢ়ঃঁৎবং, রহ রসধমবং ধহফ ংুসনড়ষং.
১৯২৫ সাল এ কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনের সভাপতিরূপে রবীন্দ্রনাথ গঠিত “ঞযব চযরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ ড়ঁৎ ঢ়বড়ঢ়ষব” শীর্ষক অভিভাষণে বাউল জীবন দর্শনের ভাববাদী ব্যাখ্যা বিদগ্ধ শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। নিরক্ষর বাউলকবি এবং সুপ্রাচীন বৈদিক ঋষি যে একই অপরিবর্তনীয় আনন্দময় উপলব্ধিতে চিন্ময় এবং রসময় তা তিনি এই অভিভাষনে বলতে চেয়েছেন।
অধ্যাপক অমিয়রতন মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথের আদর্শ হইতেছে পরম মানুষ। মনের মানুষকে বাউলরা খোঁজ করেন ত্যাগে, সেবার মহত্ত্বে, দুঃখের গৌরবে এবং প্রেমের বৈরাগ্যে। বাউলদের কথা এই মন সাধনায় হইতে হইবে পরম মানুষ। রবীন্দ্রনাথের কথা “এই প্রেম সাধনায় হইতে হইবে পরম মানুষ”। বাউলরা তত্ত্ব সাধনায় জৈব প্রেম হইতে উত্তীর্ণ হইতে চাহেন, তবে জৈবপ্রেমকে আচম্বিতে অস্বীকার করিয়া বসেন না। বাউলের নিকট বিশ্ব, বিশ্বমানব ও বিশ্বপ্রকৃতি চৈতন্য জাগরণের আনন্দাগার; রবীন্দ্রনাথের নিকট বিশ্বপ্রকৃতি প্রেমোদ্বোধনের আনন্দাগার। আমরা সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘বাংলার বাউল ফকির’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা নং ৬৫-৬৬ তে উল্লেখ পাই, “এমনও বলা হয়েছিল যে, লালনের ভাবসম্পদ না পেলে রবীন্দ্রনাথ কি আর নোবেল পুরস্কার পেতেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ‘রবি বাউল’; ঊফধিৎফ.ঈ.উরসড়পশ এর ভাষায় “জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব- ঞযব এৎবধঃবংঃ ইধঁষ ড়ভ ইবহমধষ”।
রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে অনুষ্ঠিত একটি ছাত্র সভায় বলেন: ‘এই লালন ফকিরের মতে মুসলমান হিন্দু জৈন (জোর আমার দেওয়া) মত সকল একত্র করিয়া এমন একটি জিনিস তৈয়ার হইয়াছে যাহাতে চিন্তা করিবার অনেক বিষয় আছে। অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, অনেককাল পরে ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের অমূল্য সঞ্চয় থেকে এমন বাউলের গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না’ ‘হারামণি’ প্রাগুক্ত, পৃ.৫৬;
প্রমথনাথ বিশী তার বই ‘রবীন্দ্র নাট্য প্রবাহ’তে উল্লেখ করেছেন, “রবীন্দ্রনাথ নিজেই ‘ফাল্‌গুনী নাটকে’ অন্ধ বাউলের ভূমিকায় অভিনয় করেন।”
রবীন্দ্রনাথ আরো বলেন, “যাকে সকলের চেয়ে জানবার তাকেই সকলের চেয়ে না-জানবার বেদনা-অন্ধকারে মাকে দেখতে পাচ্ছে না যে শিশু তারই কান্নার সুর- তার কন্ঠে বেজে উঠেছে। ‘অন্তরতর হৃদয়াত্মা’ উপনিষদের এই বাণী এদের মুখে যখন ‘মনের মানুষ’ বলে শুনলুম, আমার মনে বড়ো বিস্ময় লেগেছিল। ক্ষিতিমোহন সেন মহাশয়ের অমূল্য সঞ্চয়ের থেকে এমন আরো গান শুনেছি-তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব তেমনি কাব্যরচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে। লোকসাহিত্যে এমন অপূর্বতা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করি নে।
অধিকাংশ আধুনিক বাউলের গানের অমূল্যতা চলে গেছে, তা চলতি হাটের সস্তা দামের জিনিস হয়ে পথে পথে বিকোচ্চে। তা অনেক স্থলে বাঁধি বোলের পুনরাবৃত্তি এবং হাস্যকর উপমা তুলনার দ্বারা আকীর্ণ- তার অনেকগুলোই মৃত্যুভয়ের শাসনে মানুষকে বৈরাগীদলে টানাবার প্রচারকগিরি। এর উপায় নেই, খাঁটি জিনিসের পরিমাণ বেশি হওয়া অসম্ভব- খাঁটির জন্য অপেক্ষা করতে ও তাকে গভীর করে চিনতে যে ধৈর্যের প্রয়োজন তা সংসারে বিরল। এইজন্য কৃত্রিম নকলের প্রচুরতা চলতে থাকে। এই জন্যে সাধারণত যে-সব বাউলের গান যেখানে-সেখানে পাওয়া যায়, কী সাধনার কী সাহিত্যের দিক থেকে তার দাম বেশি নয়।
মুসলমান শাসনের আরম্ভকাল থেকেই ভারতের উভয় সম্প্রদায়ের মহাত্মা যারা জন্মেছেন তারাই আপন জীবনে ও বাক্যপ্রচারে এই বিরুদ্ধতার সমন্বয়-সাধনে প্রবৃত্ত হয়েছেন। সমস্যা যতই কঠিন ততই পরমাশ্চর্য তাদের প্রকাশ। বিধাতা এমনি করে আনেন। ভারতবর্ষে ধারাবাহিক ভাবেই সেই শ্রেষ্ঠের দেখা পেয়েছি, আশা করি আজও তার অবসান হয় নি। যে-সব উদার চিত্তে হিন্দু-মুসলমানের বিরুদ্ধ ধারা মিলিত হতে পেরেছে, সেই-সব চিত্তে সেই ধর্মসংগমে ভারতবর্ষের যথার্থ মানসতীর্থ স্থাপিত হয়েছে। সেই-সব তীর্থ দেশের সীমায় বদ্ধ নয়, তা অন্তহীন কালে প্রতিষ্ঠিত। রামানন্দ, কবীর, দাদু, রবীদাস, নানক প্রভৃতির চরিত্রে এই-সব তীর্থ চিরপ্রতিষ্ঠিত হয়ে রইল। এদের মধ্যে সকল বিরোধ সকল বৈচিত্র্য একের জয়বার্তা মিলিত কন্ঠে ঘোষণা করেছে।
আমাদের দেশে যারা নিজেদের শিক্ষিত বলেন তারা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাদের শিক্ষা। কিন্তু, আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল-সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি-এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েই; একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি; এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্র্যে সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কন্ঠ মিলেছে, কোরান পুরাণে ঝগড়া বাঁধে নি। এই মিলনেই ভারতের সত্য পরিচয়। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা ইস্কুল-কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কি রকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।”
বাউল গান প্রধানত দেহতত্ত্বের গান। নিজের দেহকে জানা, তাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার মধ্য দিয়ে আনন্দস্বরূপের আচ্ছাদন এসবই বাউলদের লক্ষ্য। ভাবের দিক থেকে বাউল গান নানা মাত্রায় বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছে।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই বাউল গানের ভাবরহস্যে ও ছন্দে আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং দেশবাসীকে প্রথম সচেতন করেছিলেন।
বাউল গানে স্বকীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কেঃ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় তিনি যে সকল অভিনব স্বদেশী গান লেখেন তার সুর কাঠামোই বাউল গানের স্পন্দন ও উদ্দীপনা অত্যাশ্চর্য নৈপুণ্যে ব্যবহার করে। তার গানে বাউল গানের অন্তর জগতে গভীর ছাপ ফেলেছে। তার কোন কোন রচনাকে তিনি এমনকি রবীন্দ্র বাউলের রচনা বলে মেনে নিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রণোদনায় ক্ষিতিমোহন সেন মধ্যযুগের সন্তসাধকদের সাধনার স্বরূপ সন্ধানে ব্যাপৃত হন এবং সে সূত্রে বাংলার বাউলদের লুপ্তশ্রোতের কিছু পরিচয় ব্যাপ্ত করে লেখালেখি করেন। রবীন্দ্রনাথ তার অনুসন্ধানী মনকে প্রথম বাউলদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করেন। তারই পথ ধরে ক্ষিতিমোহন সেন, মনসুর উদ্দিন, উপেন্দ্রনাথ, মতিলাল দাশ, আহমদ শরীফরা কাজ করেছেন সংগ্রহ করেছেন বাউল গান।
একথা বলাই সঙ্গত যে, সমাজের ও ধর্মের যে অসামান্য গুরুত্ব ঊনিশ শতকের শেষের দিকে দেশাভিমানী বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ অনুভব করেছেন, সেই অনুভবই দেশাভিমানী রবীন্দ্রনাথের বাউল-প্রেমে সর্বদা অভিব্যক্ত হয়েছিল। দেশি-সংস্কৃতির এই বিশেষ উপাদানকে রবীন্দ্রনাথ অবহেলা করলেন না। মনে রাখা দরকার, বৌদ্ধ ধর্ম, বৈষ্ণব ধর্ম, সন্ত ধর্ম রবীন্দ্রনাথের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উপনিষদ তার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কাজেই, বৈরিক কবিত্বে, সঙ্গীতে, দর্শনে, অন্তহীন বাগবিস্তার দ্বারা কেবল বাউলের গানের প্রভা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা বোধহয় অসম্পৃক্ত।
রবীন্দ্রনাথের মরমী মানসে লালন ছিলেন প্রেরণার স্বতঃস্ফূর্ত উৎস। কালজয়ী এই দুই গীতি প্রতিভা সম্পর্কে অনেক বিজ্ঞজন এমন মত ব্যক্ত করেছেন যে রবীন্দ্রনাথ নিরক্ষর হলে লালন ফকিরের মতো মরমী কবি হতেন আর লালন শাহ্‌ শিক্ষিত হলে হতেন রবীন্দ্রনাথের মতো বিদগ্ধ কবি।
তথ্যপঞ্জিঃ

১। আবুল আহসান চৌধুরী “লালন শাহ” (ঢাকা- ১৩৯৯ পৃ. ১১৬-১১৯ পৃ. ৫৯-৬৩), ২। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত “বাউল লালন রবীন্দ্রনাথ” (কলিকাতা- ১৯৯৫ পৃ. ১৮৯-২৫৪), ৩। মোঃ মনসুর উদ্দিন “হারামণি” (ঢাকা- ১৯৭৬ পৃ. ৫-৮), ৪। প্রমথনাথ বিশী “রবীন্দ্র নাট্য প্রবাহ” (কলিকাতা- ১৯৮৬ পৃ. ৪৬১), ৫। প্রশান্ত কুমার পাল “রবী জীবনী” ৬ (কলিকাতা- ১৩৯১ পৃ.১৬৩, ১৬৪), ৬। প্রশান্ত কুমার পাল “রবী জীবনী” ৩ (কলিকাতা- ১৩৯৪ পৃ.১৩৯, ১৪১), ৭। সনৎকুমার মিত্র সম্পাদিত “লালন ফকির কবি ও কাব্য” (১৩৮৩), ৮। শক্তি নাথ ধর, “ফকির লালন শাহ, দেশ, “কাল ও শিল্প” (কলিকাতা- ১৯৯৫), ৯। অমিয় রতন মুখোপাধ্যায় “রবীন্দ্রনাথের মনদর্শন” (কলিকাতা- ১৩৮০ পৃ. ১৩২-১৩৩)

x