‘রাজার নীতি’ ও করোনা সতর্কতা

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
59

রাজনীতির গন্তব্য নিয়ে কোন মন্তব্য বা পূর্বাভাস দেয়াও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে দিনদিন! কারণ রাজনীতি এখন আক্ষরিক অর্থেই রাজার নীতি। আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ভীড় দেখলেই এর একটা নমুনাচিত্র সামনে চলে আসে। নির্বাচন কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সিটি নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করেনি। কিন্তু ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে মনোনয়ন কেনার বাজার বসে গেছে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে। শুধু মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন কিনেছেন ১৯ জন। ৫৬ কাউন্সিলর পদে প্রার্থীর সংখ্যা অর্ধ সহস্র ছুঁই ছুঁই! এটা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন কেনার সর্বকালের নতুন রেকর্ডও বটে। আবার প্রতিজন মনোনয়ন প্রত্যাশীর সাথে আছে সমর্থক, অনুরাগী, সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকের বিশাল লটবহর। একেবারে এলাহী কান্ড আর কী?
এরমাঝে প্রার্থীদের গণভবনে আমন্ত্রণ করেছেন দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। বাইরে বিশাল প্যান্ডেল টানিয়ে কথা বলছেন, হাল্কা আপ্যায়নও! এই সুযোগে মনোনয়ন পান বা পান অন্তত প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারতো মুফতে পেয়েই যাচ্ছেন তাঁরা। ফাঁক বুঝে বড় পদাধিকারীর কেউ কেউ নিজের কথা, বঙ্গবন্ধু, নেত্রী ও দলের জন্য তাঁর ‘অবিরাম আত্মত্যাগে’র কিছু স্যাম্পল শোনানোর কসরতও! অতি চালাকেরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছবি তুলে নিজের ফেসবুকে ছেড়ে দিয়ে কেল্লামাত করবেন! ছবিটি বড় আকারে বাঁধাই করে ড্রয়িংরুমের দেয়ালে ঝুলিয়ে প্রদর্শনীর মজুদ সমৃদ্ধ করবেন। যেমন তাদের শো’কেসের প্রদর্শনীতে আছে, ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা’র মত দামি গ্রন্থরত্ন! এই প্রাপ্তি ও ছবি ক্যাশ করে কেউ কেউ করেও খাবেন। কামাই, রিজিকের তরক্কি হবে। সপ্তাহের বেশি ধরে ঢাকার হোটেল-মোটেল, শপিং মলে বাড়তি ব্যাবসাও হচ্ছে। কারো কারো ফ্রি-তে প্রথম আকাশ ভ্রমণও। অবশ্য দলীয় তহবিলে মনোনয়ন বিক্রি বাবদ মোটা তহবিল সংগ্রহ হচ্ছে। এটা মন্দের ভাল, দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে নেতারা খুব কমই এখন গরীব আছেন। কিন্তু তুলনায় জানামতে দলের তহবিল তেমন মোটাতাজা হয়নি। দলের নীতি-আদর্শ, নৈতিকতার অবক্ষয়ের একটা খুদে নমুনা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মনোনয়ন তোলার হিড়িক থেকে সচেতন দেশবাসী পেয়ে গেছেন। এমন অনেক প্রার্থী আছেন, যাদের নিজের ঘরের ভোটব্যাংকেও সমস্যা। পাড়ার অনেকে চেনেওনা। নিজেও কারো খোঁজ-খবরও নেন না। উল্টো সুযোগ পেলে ভুক্তভোগী মানুষের পকেট পুলিশ, হাইকোর্ট দেখিয়ে ছিলে নেন নানা ছুতোয়! তাঁরাও ৭০ লাখ বাসিন্দার সিটি মেয়র হতে আগ্রহী! একটু ছোটবা কাউন্সিলরের মত লাখ মানুষের জন প্রতিনিধি!
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে ঘিরে মুজিববর্ষের ক্ষণ গননা চলছে। মাসখানেক পরেই শুরু হবে মুজিববর্ষের দেশব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন। এখানেও উনারা সামনের কাতারে থাকবেন। বিপরীতে টানা দু’দফা ক্ষমতাসীন দল বিএনপিতে নড়াচড়াও নেই। মিডিয়াগুলোও তত্ত্বতালাশ করে গন্ডাখানেকের বেশি সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম পাচ্ছে না। এতে পরিস্কার টানা ১১ বছরের বেশি ক্ষমতায় থেকে কত বেশি মেদ জমেছে বঙ্গবন্ধুর রক্ত, ঘাম, শ্রম, জীবন-যৌবনের সবকিছু নিঃশেষ করে গড়ে তোলা আওয়ামী লীগের মত গণ মানুষের প্রিয় দলটির। মুজিববর্ষের বিপুল ঢঙ্কানিনাদে আওয়ামী লীগকে গণমুখী করা যাবে কিনা, এনিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা না গেলেও বড় কোন অর্জন বা পরিবর্তনের আশা করা সম্ভবত ভুল হবে।
এমন কেন হলো! কেন আওয়ামী লীগ আওয়াম বা জনতার দল না হয়ে রাজা-গজার দল হয়ে গেল? এনিয়ে গবেষণার সময় এসে গেছে। সরকারি দল মানে মধুর হাড়ি শিক্ষাটা দিয়ে গেছেন জিয়া ও এরশাদ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আওয়ামী লীগের রাজা-গজা নেতারা ২৪ ঘন্টাই জিয়ার বিএনপিকে ক্যান্টনমেন্টের ঔরশজাত সুবিধাবাদীদের শঙ্কর দল বলে টানা ড্রাইওয়াস করে যাচ্ছেন। তুলনায় ভাল সার্ভিস দেয়ায় এরশাদের জাতীয় পার্টি কিংস পার্টি (ক্ষমতার ওম থেকে জন্ম) হয়েও কিছুটা ছাড় পাচ্ছে। অবশ্য ওটা এখন বিলুপ্তির ধারায়। যে মেসিনে বিএনপির দুষ্কর্মের ড্রাইওয়াস করা হচ্ছে, ওই মেসিনের পার্টসগুলোই (নেতা) যদি অকেজো হয়, তাহলেতো নিজেদের গায়েই ময়লা স্প্রে হবে, জনাব। এভাবে কী দল চলে, একদম নীতি-আদর্শ বিবর্জিত ভোগবাদের জঞ্জালে ডুবে থেকে টানা সুবচন উপহার দিয়ে মানুষ হাসানো সহজ হলেও বোকা বানানো ততটাই কঠিন। আশা করি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে মুজিববর্ষ উদযাপনের সূচনায় দলটির নীতিনির্ধারকেরা এই অপ্রিয় সত্যটি একটু ঝালাই করে নেবেন।
ফেরা যাক, অন্য প্রসঙ্গে। চীনে হুবেই প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের প্রকোপ দিন দিন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। মৃতের সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দু’হাজার ছুঁয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা লাখের ঘরে। ভাইরাসটির উৎপত্তির জন্য বাদুরকে দায়ী করা হলেও এটা নিশ্চিত নয়, বরং গুজব। চীনজুড়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর,উত্তর কোরিয়া, জাপানসহ আরো ২৫ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের গুলি করে হত্যা বা লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাও এখন আর চাঞ্চল্যকর খবর নয়। আশংকার খবর হচ্ছে, দু’হাজারের কাছাকাছি স্বাস্থ্যসেবা কর্মীও ভাইরাসে আক্রান্ত। এদের মাঝে মারা গেছেন ৮জন। চীন থেকে খবর সংগ্রহ কঠিন হওয়ায় সব খবর আলোতে আসছে না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র পর্যবেক্ষণ গ্রুপের দাবি,ভাইরাসটি চীনের নিজস্ব আবিষ্কার। পরমাণু অস্ত্রের বিকল্প হিসাবে জীবাণু অস্ত্রের মজুদ গড়তে শক্তিশালী ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করছিল চীন। গবেষণাগার থেকেই ভাইরাসটি লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে এই ভয়াল মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। খবরটির সত্যতা কেউ নিশ্চিত করেনি। এমনকি জাতিসংঘ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নয়। কিন্তু করোনা ভাইরাসের ভয়াল বিস্তার বাংলাদেশ বিশেষ করে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের জন্যও বড় বিপদ ডেকে এনেছে। এর মাঝে চীনের সাথে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য থমকে গেছে। আটকে গেছে চীনা অর্থায়ন বা কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন মেগাপ্রকল্পগুলো। অর্থনীতি বিশেষ করে চীনের বিপুল আমদানি বাণিজ্য থেমে গেলে ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, বন্দরের চীনা জাহাজ ও নাবিকদের কোয়ারান্টাইনের ব্যবস্থা মানসম্মত না হলে ভাইরাসটি চট্টগ্রামেও ছোবল হানতে পারে। চীনা রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত অঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রকল্প, মেগাপ্রকল্পে কর্মরত চীনা নাগরিকদের স্বদেশ আসা-যাওয়া কড়া তদারকিতে না রাখলেও বিপদ সামাল কঠিন হবে। আশা করি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন।