রাঙ্গুনিয়ায় ফখরুলের গাড়ি বহরে হামলার মামলা খারিজ

উচ্চতর আদালতে আপিল করবে বিএনপি

সবুর শুভ

সোমবার , ১৬ জুলাই, ২০১৮ at ৩:৫২ পূর্বাহ্ণ
47

ত্রাণ বিতরণের জন্য রাঙ্গামাটিতে যাওয়ার সময় রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরে হামলার মামলা খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। একইসাথে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা পাল্টা মামলাও খারিজ করে দিয়েছেন আদালতের বিচারক। গতকাল রোববার বিকেলে অতিরিক্ত বিচারিক হাকিম রবিউল আলমের আদালত এ আদেশ দিয়েছেন। আদালত থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্ত কর্মকর্তা আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সাক্ষ্য প্রমান পাননি বলে জানিয়ে আদালতে পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল মামলা দুইটি খারিজ করার আদেশ দেন আদালতের বিচারক। এদিকে মামলা খারিজের বিষয়ে দুইপক্ষই উচ্চতর আদালতে এ নিয়ে আপিল দায়ের করবেন বলে জানিয়েছে।

ফখরুলের উপর হামলায় মামলা : গত বছরের ২১ জুন বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আ স ম শহীদুল্লাহ কায়সার এর আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক। মামলায় ২৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২৫৩০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্তের আদেশ দিয়েছিলেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা আসামিরা হলেন, মোহাম্মদ সরওয়ার (৩৩), নাজিম উদ্দিন বাদশা (৩০), মোহাম্মদ রাসেল ওরফে রাশু (২৬), মোহাম্মদ মহসিন (২৮), মোহাম্মদ জাহেদ (৩০), মোহাম্মদ জাহেদ (২৭), আলমগীর (২৮), নঈমুল ইসলাম (২৭), শিমুল গুপ্ত (২৫), পাভেল বড়ুয়া (৩০), ইকবাল হোসেন বাবলু (২৮), মাহিন (২৫), মো. ইউনুছ (৩৫), শাসশুদ্দোহা সিকদার আরজু (৪২), আবু তৈয়ব (৩৪), এনামুল হক (৩৩), মো. রাসেল (৩০), সাইফুল (২৮), মাহবুব (২৬), আনোয়ার (২৭), নেছার উল্লাহ (২২), বেলাল (৩২), মুজাহিদ (২৮) বাপ্পা (২৭), মো. হারুন (২৮) ও জাহাঙ্গীর আলম বাদশা (৪৮)

উল্লেখ্য, পাহাড় ধসে রাঙামাটির বিধ্বস্ত জনপদ ও মাটিচাপায় হতাহতদের দেখতে রবিবার (১৮ জুন ১৭’) সকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় টিম রাঙামাটি যাওয়ার পথে রাঙ্গুনিয়ায় ইসাখালী এলাকায় হামলার শিকার হন। গাড়িবহরের পথ আটকে রড ও পাথর দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী, বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবুর রহমান শামীম, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মীর ফাওয়াজ হোসেন শুভ, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বকরসহ ১৫ জন আহত হন। এ ঘটনা দেশে ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হয়। হামলার সাথে জড়িতদের অনেকের পরিচিতি সম্পর্কেও মিডিয়ায় তথ্য উঠে এসেছিল বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী এডভোকেট এনামুল হক।

অ্যাডভোকেট এনামের মামলার সাক্ষীরা: মামলার বাদী অ্যাডভোকেট এনামুল হক, বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান শামীম, মোস্তাফিজুর রহমান, এম এ আজিজ ও গোলাম নবী আপেল। নিরপেক্ষ আরো ১১ সাক্ষীর কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

পিবিআই এর তদন্ত: উল্লেখিত চার সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই এর উপপরিদর্শক মোহাম্মদ কামাল আব্বাস। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি নেতা মেজর জেনারেল (অব🙂 রুহুল আলম চৌধুরী, ডা: ফাওয়াজ হোসেন শুভ, আবুল হাশেম বক্কর, সাইফুর রহমান শপথ ও হাজি মোহাম্মদ হানিফ সওদাগরকে সাক্ষ্য নেয়ার জন্য পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে।

রাঙ্গুনিয়া ইছাখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের সামনে মির্জা ফখরুলের গাড়ি বহর পৌঁছলে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে কতিপয় সন্ত্রাসী গাড়ির গতিরোধ করে হামলা চালায়। এসময় মোট তিনটি গাড়ি সন্ত্রাসীদের লাঠিসোটা ও ইট পাটকেলের আঘাতে ক্ষতিসাধন হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। ঘটনার সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাম হাতে এবং মাহবুবুর রহমান শামীম, রুহুল আলম চৌধুরী ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাধারনভাবে জখম প্রাপ্ত হন।

প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সাক্ষীরা সন্ত্রাসীদেরকে হামলা চালাতে দেখলেও তাদের নাম ঠিকানা শনাক্ত করতে পারেনি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল আব্বাস। এ তদন্তে স্থানীয় এমপির আহ্বানে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসুচি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই (ঘটনাস্থল) স্থান হয়ে যাচ্ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সার্বিক তদন্তে মির্জা ফখরুলের গাড়ি বহরে হামলা করে গাড়ি ভাংচুর ও জাতীয়তাবাদি দলের মহাসচিবসহ কেন্দ্রিয় নেতা ও স্থানীয় নেতাকর্মীদেরকে মারধর করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য উপাত্ত এবং নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য প্রমান পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ অবস্থায় ১ নং থেকে ২৬ নং আসামির বিরুদ্ধে আইন শৃংখলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুতবিচার) আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০১৪) এর ৪/৫ ধারার অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ প্রমানিত নয় বলে উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

তদন্ত কর্মকর্তার মতামত : মামলার ঘটনা, তারিখ ও সময়ে ঘটনাস্থলে ছিল প্রবল বৃষ্টি। এ কারনে মামলার বাদী, সাক্ষী, বিএনপির মহাসচিব, কেন্দ্রিয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের গাড়ি বহরকে গতিরোধ করে অরাজকতা ও ত্রাস সৃষ্টিকারীদের নাম ঠিকানা শনাক্ত করা যায়নি। ভবিষ্যতে নাম ঠিকানা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

এ বিষয়ে মামলার বাদী অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, বৃষ্টির কারনে আসামিদের শনাক্ত করা না যাওয়ার বিষয়টি হাস্যকর। আমরা মামলা খারিজের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল দায়ের করবো।

ফখরুলদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলার এজাহার: রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আসামি করে মামলার পর পাল্টা মামলা দায়ের করা হয়। ফখরুলের গাড়ির ধাক্কায় দুজন আহত ও তাদের মারধরের অভিযোগে দায়ের হওয়া এই মামলায় ২৬ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়।

গত বছরের ২২ জুন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম ও আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক আ স ম শহীদুল্লাহ কায়সারের আদালতে বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন রাঙ্গুনিয়ার সিএনজি অটোরিকশা চালক মহসিন। মামলার আরজিতে তিনি আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

গত ১৮ জুন ফখরুলের গাড়িবহরে হামলার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ দাবি করেছিলেন, ফখরুলের গাড়িবহরে দুজন আহত হওয়ার পর স্থানীয় জনতা উত্তেজিত হয়ে হামলা চালিয়েছে। সংসদেও এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন হাছান মাহমুদ। এর ধারাবাহিকতায় দ্রুত বিচার আইনের ৪ ও ৫ ধারায় দাখিল করা মামলায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি শওকত আলী নুরসহ ২৬ জন বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে গাড়িতে থাকা বিএনপি মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের আসামি করা হয়নি।

মামলার বাদির আইনজীবী অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ জানিয়েছিলেন, মির্জা ফখরুলের গাড়িবহর রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সিএনজি অটোরিকশা চালক মহসিন ও আব্দুল আজিজের গাড়িতে ধাক্কা দেয় ও তাদের চাপা দেয়। এসময় তারা প্রতিবাদ করলে বিএনপি নেতাকর্মীরা গাড়ি থেকে নেমে তাদের মারধর করে। তাদের পকেট থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে। আহত দুজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।

এ ঘটনায় সিএনজি অটোরিকশা চালক মহসিন বাদি হয়ে মামলা করেছে। মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালতের বিচারক।

মামলায় আসামির মধ্যে আছেন, শওকত আলী নূর (৫৭), ইউসুফ মিঞা চৌধুরী (৪২), মাহাবুব ছাফা (৫৫), রফিকুল ইসলাম (৫৩), নিজামুল হক তপন (৪৫), মাকসুদুল হক মাসুদ (৪২), নিজাম উদ্দিন (৩৫), আনসুর আলী (৩৫), মো.করিম (২৮), জিয়াউর রহমান (৩৩), মুরাদ (৩৫), হাজী ইলিয়াছ (৩৫), মোহাম্মদ বাবুল (৪৫), মোহাম্মদ ফারুক (৪০), আজিজুল হক (৩৮), আলমগীর (৩০), হাবীবুর রহমান (৪২), ওমর ফারুক (৩২), সাইফুল (৩০), সৈয়দ নূর, নূরুল আলম, গোলাম নবী, এম এ আজিজ, মোস্তাফিজুর রহমান, সাইফুর রহমান ও হাজী মোহাম্মদ হানিফ সওদাগর।

মামলার তদন্ত: এ মামলার বাদীর মানিত সাক্ষী, প্রাথমিক চিকিৎসাপত্র ও ঘটনার সময় তাকে উদ্ধারকারী কথিত অন্যান্য ড্রাইভারকে হাজির করার জন্য বারবার বলা হয় উল্লেখ করে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই এর উপপরিদর্শক আবু হাসনাত মোহাম্মদ মাজেদুল হক জানান, বাদী উল্লেখিত চিকিৎসাপত্র ও উদ্ধারকারী কোন ড্রাইভারকে হাজির করতে পারেননি। আর ঘটনার পর আসামিদের দ্বারা বাদী মোবাইলে প্রানে মেরে ফেলার যে অভিযোগে করা হয় তার কোন দালিলিক এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রমানও পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা তদন্ত প্রতিবেদনে। মামলা প্রমান করতে বাদী হামলার বিষয়ে কোন সাক্ষ্য প্রমান হাজির করতে পারেননি। এ কারনে মামলার এজাহারে আনা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমান হয়নি বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

দুইপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য ও আদেশ : গত ৪ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দুইটি দাখিল করার পর দুইপক্ষই তদন্ত প্রতিবেদনের উপর নারাজি আবেদন দাখিল করে।

আদালত এ নিয়ে গত বৃহষ্পতিবার বিস্তারিত শুনানী শেষে আদেশ প্রচারের জন্য গতকাল রোববার দিন ধার্য রাখেন। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল তদন্ত প্রতিবেদনগুলোতে আসা তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে মামলা দুইটি খারিজ করার আদেশ দেন বিচারক।

মামলা খারিজের বিষয়ে মির্জা ফখরুলদের পক্ষে মামলা দায়েরকারী অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, সেদিন কি ঘটেছিল তা শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয় পুরো দুনিয়ার মানুষ দেখেছে মিডিয়ার কল্যানে। কিন্তু তদন্তে বৃষ্টির কারনে আসামিদের শনাক্ত করতে পারলেন না তদন্ত কর্মকর্তা। আমরা এর প্রতিকার চেয়ে উচ্চতর আদালতে আপিল দায়ের করবো।

অপর মামলার বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ বলেন, আমাদের এজাহার ছিল সুষ্পষ্ট। সেখানে বাদীকে গাড়ি চাপা দেয়ার চেষ্টার ঘটনাটির সত্যতা আছে। আমরা আজকের (রোববার) আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবো।

x