রমজানে স্থিতিশীল থাকবে ভোগ্যপণ্যের বাজার?

পণ্যের দাম বাড়ানো যাবে না : বাণিজ্য সচিব ব্যবসায়ীদের আশ্বাস

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ
46

রমজান এলেই বাড়তে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার। ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে প্রতি বছর স্থানীয় প্রশাসন ব্যবসায়ীদের সাথে মতবিনিময় করে। ব্যবসায়ীরাও প্রশাসনের কর্তাদের আশ্বস্ত করেন দ্রব্যমূল্য সহনশীল থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম সকালের সাথে বিকেলের মিল থাকে না। তাই ভোক্তাদের মনে একটিই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে- আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনের পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে কী? ইতোমধ্যে রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য সচিব মো. মফিজুল ইসলাম। সভায় রমজানে প্রতিদিন জেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া পচা-বাসি ইফতারি, পোড়া তেল ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব বলেন, কোনো অবস্থাতেই নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি করা যাবে না। সরকার এবার শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব। ব্যবসায়ীরা যাতে সফল হন সে লক্ষ্যে সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছে। একইসাথে প্রধানমন্ত্রী ভোক্তাদের অধিকারের ব্যাপারেও সজাগ। খাদ্যে ভেজাল দেয়া হত্যা করার সমান। ব্যবসায়ীদের ভেজালমুক্ত পণ্য ন্যায্য দামে বিক্রি করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে এর বিকল্প নেই।
তিনি আরো বলেন, প্রায় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে বলেন চট্টগ্রামে আমদানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ক্ষমতা নেই। বিষয়টা আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে চাই বর্তমান আইন বিধিতে যতটুকু ক্ষমতা আছে ততটুকু আমরা চট্টগ্রামে দিয়ে দিবো। আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও একজন ব্যবসায়ী, তিনি ব্যবসায়ীদের দু:খ বুঝেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন, তাদেরকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জরিমানা করা হয়। আমরা ব্যবসায়ীদের জরিমানা করতে চাই না। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। জরিমানা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। ক্রেতারা যাতে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পায় সেটি নিশ্চিত করাটাই আমাদের উদ্দেশ্য। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই লাভ করবে। তবে পণ্যের মজুদ, সিন্ডিকেট অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। তখন আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প থাকে না। বিদেশে বড় দিন উপলক্ষে ছাড় দেওয়া হয়। আমি অনুরোধ জানাতে এসেছি, লাভ কম করে ক্রেতাদের ন্যায্যমূল্যে পণ্য দিয়ে সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারেন।
বাণিজ্য সচিব বলেন, এখনো যথেষ্ট সময় আছে আপনারা ব্যবসায়ীরা যদি চান আরও আমদানি করতে পারেন। দেশে খাঁটি ঘি, দুধ, সরিষার তেল ছাড়া বাজারে কিছু নেই। বাস্তবে কি পাই? ব্যবসায়ীরা বলেন, রমজানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়ে। বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের এককভাবে দায়ী করা যায় না। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা বাজার স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান বাণিজ্য সচিব।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৩ টন পণ্য পরিবহন প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওজন স্কেল নিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ওজন স্কেলের বিষয়টি আসলে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয় দেখে। সেতু মন্ত্রী অসুস্থ থাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শঙ্কর রঞ্জন সাহা বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় সভার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। জনগণকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অমরা সজাগ থাকবো। দ্রব্যমূল্যের অস্থিতিশীলতা আমাদের নজরদারিতে থাকবে। মজুদ, কালোবাজারি সরকার বরদাশত করবে না। রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঠিক রাখতে আমরা কন্ট্রোল রুম চালু করবো। যে কেউ ফোন করে কন্ট্রোল রুমে তাদের অভিযোগ জানাতে পারবেন।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, একসময় চট্টগ্রামের দু:খ ছিল চাক্তাই খাল, এখন দু:খ হচ্ছে ১৩ টন। ছোলা, মসুর ডালের দাম এবার কম। মাসের শেষ দিকে খুচরায় দাম বেড়ে যায়। বিষয়টি প্রশাসনের নজরদারিতে আনতে হবে।
খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক আবুল বাশার চৌধুরী বলেন, গত ৫ বছর ধরে ভোগ্যপণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে। অথচ বিভিন্ন সময় বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কম, কিন্তু আমাদের বাজারে পণ্যের দাম বেশি। মনে করেন, কোনো পণ্যের আন্তর্জাতিক বুকিং রেট যদি ৫০০ ডলার হয়, তাহলে আমাদের দেশের আসা সেই পণ্যের সাথে আরো কিছু আনুষঙ্গিক খরচ যুক্ত হয়। এর সাথে ট্রাক ভাড়া এবং ট্যাঙ যুক্ত হয়েই তারপর সেই পণ্যের দাম নির্ধারণ হয়। এছাড়া সম্প্রতি আকস্মিক নৌ ধর্মঘটের কারণে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১৩ টন বেশি পণ্য পরিবহন করা যায় না। এটি আমাদের পণ্যের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ক্যাব সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ঘি, সেমাইতে বেশি ভেজাল হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশ্বাস রমজানের শেষ দিকে ঠিক থাকে না। তাই মনিটরিং টিম যেন নিয়মিত অভিযান চালায়। বাজারে অন্তত ৫টি মোবাইল টিম কাজ করতে হবে। শুধু রমজান মাস নয়, রমজানের পরেও যেন এটি অব্যাহত থাকে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী এসএম মহিউদ্দিন মাহিন বলেন, আমরা ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েছি। ১৩ টনের বেশি পণ্য ট্রাকে পাঠাতে পারি না। সিলেট, রাজশাহী পণ্য পাঠাতে পারি না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়া দেশের আর কোথাও ওজন স্কেল নেই। ৭৫০ ডলারের ছোলা পাইকারি বাজারে এবার ৬৫-৭০ টাকার বেশি হবে না। এছাড়া চিনির বাজারও কম এখন।
কাজীর দেউড়ি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের বাজারে সবচেয়ে ভালো মানের ছোলা ৭১ টাকায় কিনে ৭৩ টাকা বিক্রি করছি। চিনি কিনছি ৪৮ টাকায়। আরেকটি বিষয় হচ্ছে-বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারের বাবুর্চিরা কমিশন খেয়ে ভেজাল ঘি কিনতে বাধ্য করেন। তাই ভেজাল ঘি রোধে কমিউনিটি সেন্টারে অভিযান চালাতে হবে। বর্তমানে ঘিয়ের দাম ৯০০-১০০০ টাকা। অথচ এর অর্ধেক দামে নানা নামে বিএসটিআইয়ের লোগোসহ ঘি বিক্রি হচ্ছে। অপরদিকে ওষুধ ছাড়া কলা পাকাতে ৭ দিন লাগে। চিংড়িতে জেলি মেশানো হচ্ছে। এসব বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি সালেহ আহমেদ সুলেমান, কামাল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সহ সভাপতি মো. খালেদ খান চৌধুরী প্রমুখ।

x