রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে

ছন্দা দাশ

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ

আমাকে কেউ বলেনি রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে। একথা সত্যি যে আজোও আমি রবীন্দ্রনাথের মতো এতো বেশী আর কাউকে ভালোবাসিনি। কিন্তু কেন?এমন প্রশ্ন কখনো আমার মনে আসেনি। আমার না বোঝা বয়স থেকেই বাবা রবীন্দ্রনাথ নামে একটা চারাগাছ বুকের মধ্যে বসিয়ে দিয়ে গেছেন তার ডালপালা মেলা ছায়া আজও আমাকে জাগিয়ে রাখে।কবে থেকে মনে নেই ঘুমুতে ঘুমতে বাবার ঘর থেকে ভেসে আসা গান””পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, পাগল আমার মন জেগে ওঠে।”সেই গান চিরকাল পাগল করেই রেখেছে
আমাকে। সেই পাগলকে গানে, কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বারবার ডাকেন।সে পাগল গান গায়,সে পাগল ভালোবাসে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,তুই যে পাগল সেটাই তুই জানিয়ে দিবি।আজ যে কেউ কেউ পাগল থাকতে সাহস পায়, সে রবীন্দ্রনাথের জন্য। আলো না ফোটা ভোরে ঘুম থেকে জেগেই শুনি মা উঠোন ঝাড় দিতে দিতে গাইছে””জাগো নির্মল নেত্রে, রাত্রির পরপারে”। আমার মধ্যে তখন চলছে অদ্ভুত রসায়ন। অথচ তখন আমার রবীন্দ্রনাথ পড়া হয়নি।সবে বাবা কিনে দিয়েছেন বাদামি রঙের উপর লাল অক্ষরে লেখা রবীন্দ্রনাথের যে বই তার প্রথম কবিতা”তিনটে
শালিক ঝগড়া করে রান্না ঘরের চালে, শীতের বেলা
দুই প্রহরে, দূরে কাদের ছাদের পরে । ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগুনী রঙের শাড়ি।”মন হারায় একটা ছবির মধ্যে, ছোট্ট মেয়েটি কে? রান্না ঘরের চালায় বসে শালিক আর বেগুনী রঙের শাড়ি?তার ছোঁয়ায় যে অনন্যতা আমার মধ্যে এনে দিয়েছে সে রবীন্দ্রনাথ।
আমরা যে বয়সে মফস্বল এলাকায় বাস করতাম তার পরিবেশে ছিল অনেকটা শান্তিনিকেতনের ছোঁয়া।আর বাবা আমাদের মধ্যে তার প্রভাব ফেলেছেন অনেকখানি। তখন সেভাবে বুঝিনি। আজ এই পরিণত বয়সে এসে বুঝি কি হারিয়েছি! বই পড়ার আগেই বাবার মুখ থেকে শুনে শুনে রবীন্দ্রনাথের কতো কবিতা যে মুখস্থ বলতে পারতাম। আমাদের বয়সী অন্যান্য বাচ্চারা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নাম ও শুনেনি। বাবা প্রায়ই আমাদের ডেকে সঞ্চয়িতা খুলে আবৃত্তি করতেন কতো কবিতা।এর প্রভাব আমার মধ্যে এমন ভাবে পড়েছে আমি যা কিছু দেখতাম তাই যেন তাঁর মতো করে চোখে চেয়ে দেখতাম। আমার বয়সী অন্যান্য ছেলেমেয়েরাও মুখস্থ করেছে “তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে”।ঐ পড়া পর্যন্ত, তারপর তারা আর তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু তারপর থেকেই আমার মধ্যে বেজেই যাচ্ছে,তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে। আচ্ছা একপায়ে মানে কি?তালগাছের কি পা আছে?এই ভাবনায় ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট। ইচ্ছে করলে বাবার কাছে জানতে চাইতে পারতাম। চাইনি। কেন কে জানে? একটা সময় আসে নিজেই অনুভব করতে পারি এর অর্থ। এজন্য ছেলেবেলায় আমি প্রায় আমার মায়ের বকাঝকা খেয়েছি। হয়তো মা বলেছেন একগ্লাস জল নিয়ে এসো। তখন তো রান্নাঘর শোওয়ার ঘর থেকে দূরে থাকতো। আমি রান্নাঘর থেকে গ্লাস হাতে আসতে আসতে দেখি মায়ের লাগানো গোলাপ গাছে অজস্র কুঁড়ি ফুটে আছে। সেদিকে তাকিয়ে ভাবছি রবীন্দ্রনাথ এই দেখে কি লিখেছিলেন “বল গোলাপ মোরে বল ,তুই ফুটিবি কবে।”গ্লাস ওখানে রেখে কুঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ওদিকে কেউ আসতে গিয়ে তার পায়ে লেগে গ্লাস ভেঙ্গে টুকরো টুকরো। মায়ের রক্তচক্ষু -এমেয়ে ঠিক বাপের মতো।একে সকালে নিয়ে বিকেলে ফেরত দিয়ে যাবে। আমার বুকে কষ্টের ডেলা। আসলে রবীন্দ্রনাথ আমার দূর্বল জায়গা। আমার কষ্ট তার বোধের মতো রেণু রেণু হয়ে বাজছে”এ কেমন হলো মন আমার,কী ভাব এ যে কিছুই বুঝিনা যে।”
এই যে আমার মনের মধ্যে খেলা তার সাথেই জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ। কারণ যখনই তার প্রকাশ করি বিস্ময়ে দেখি রবীন্দ্রনাথের কথাই বলছি।মনে মনে বলি আমার নিজের বলতে কিছুই কি নেই? আমার ভাবনাগুলো উনি আগেই ভেবে বসে আছেন।এই হলো আমার নিজের রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে বোঝা নাবোঝা।অবশ্য একথা জানি আমার লেখা অনেকেরই কাছে অনাবশ্যক মনে হতে পারে।সবার রবীন্দ্রনাথকে দরকার হয় না। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া ও বহু
মানুষের জীবন চলে যায়। আবার অনেকের দরকার ও হচ্ছে। নিজের মতকে প্রকাশ করবার জন্য রবীন্দ্রনাথের কোটেশন, রবীন্দ্রনাথকে উড়িয়ে দেয়ার জন্য ও, তিনি যে ভালো কবি ছিলেন না এটা প্রকাশের জন্য ও তাঁকেই দরকার হয়। আক্রমণ করবার জন্য তাঁর চেয়ে উপযুক্ত কিছু এখনো বাংলা
সংস্কৃতিতে আবিষ্কার হয়নি। আমার ব্যক্তিগত জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে জানি বাইরে ভীষণ রবীন্দ্র বিরোধী ছিলেন। বিভিন্ন সভাসমিতিতে তিনি তাঁকে বিষোদগার করে ছাড়তেন। কারণ উনি জামায়াতের নেতা। আমি যখন উনার বাড়িতে যেতাম দেখতাম অন্ধকার ঘরে শুয়ে উনি রবীন্দ্রসংগীত শুনছেন। এরপর আর কিছু বলার থাকে না। রবীন্দ্রপ্রেমিক হলে তাঁকে প্রকাশ্যে ভক্ত হবার দরকার নেই। এমনকি যারা রবীন্দ্রসংগীত গায় তাদেরও অনেকে রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে পারেননি।এইযে সুক্ষ্ম একটা কিছু যে নেই এটা বোঝার ক্ষমতা প্রায় অনেকের নেই বললেই চলে। ভালোবাসার প্রকাশ ভালোবাসার জনের কাছে প্রকাশ পাবেই।
রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে বলতে যদি যাই তবে আমার এক জীবনেও তা ফুরোবে না। আমার আগ্রহও কখনোই যেন কমবেনা এই বিষয়ে বলার বা লেখার বিষয়ে। কিন্তু আমি গভীরভাবে লক্ষ্য করছি কেন যেন রবীন্দ্র বিরোধী মানুষের অভাব নেই আমাদের সমাজে। কেন?
এ আলোচনা করে আমি কারো লক্ষ্যবস্তু হতে চাই না। আমার রবীন্দ্রনাথ আমার মধ্যেই থাক। খুব ছোটবেলায় দেখতাম বাবা তাঁর বেহালার ছড়ে এত মিষ্টি করে রবীন্দ্রনাথের কোন গানের সুর বাজাতে বাজাতে যেন অন্য এক জগতের মানুষ হয়ে উঠতে। আবার কখনো সেতারের ঝঙ্কারে বদলে দিয়েছেন আমার চেনা জগতের আলোকে অন্য ধারায়। খেলা ফেলে আমি কান পেতে রাখি। আমার রক্তে মিশে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ। হৃদয়ের প্রকোষ্ঠ থেকে কি করে তা উপড়ে ফেলি? এক একদিন বিকেলে একা বারান্দায় বসে থাকি।কারণ খেলার বন্ধুরা আজ আসেনি। তাই দেখে বাবা ডাক দিয়ে বলতেন সঞ্চয়িতাটা নিয়ে এসো। পাতা খুলে বলতেন পড়। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় পড়ছি “তোমার ছুটি নীল আকাশে, তোমার ছুটি মাঠে, তোমার ছুটি থইহারা ওই দিঘীর ঘাটে ঘাটে। বাবা কখনও উচ্চারণ, কখনও গলায় ওঠানামা বুঝিয়ে দিতেন কিভাবে হয়। আমি তো ভালো করে শুনছি না। আমার চোখে ভাসছে একটা ছবি। মেলাতে পারছি না
দিঘির ঘাটের ছুটি। তারপর খেলাভোলা,দেবতার গ্রাস, ছুটির আয়োজন,গান্ধারীর আবেদন, কর্ণকুন্তী সংবাদ এই সব কবিতার জগতে ক্রমশ প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন তো বাবা। হয়তো সব তখন ভালো করে বুঝিনি। কিন্তু ওই যে কিছু একটা ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছেন তা থেকে আর বের হতে পারিনি। চাইও না। একথা সত্যি যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম দরজা জানালা খুলে খোলা হাওয়ায় ডাক শিখিয়ে ছিলেন আমাকে। তবে সময়ের সাথে সাথে তাঁর অনেক লেখার অর্থ বদলে গেছে যেন আমার। শৈশবে একবার মেজদিকে আনবার জন্য খেয়াঘাটের কাছে অপেক্ষা করছি আমরা তিন ভাইবোন। তখন শীতকাল। সকালবেলার মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়েছে নদীর জলে, গাছের পাতায় পাতায়, আমার মনে ও। একটি পাল তোলা নৌকো ভেসে যেতে দেখে গাইতে ইচ্ছে হলো” অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া, দেখি নাই কভু দেখি নাই এমনি তরণী বাওয়া।ঐ বয়সে ধবল , তরণীর অর্থ কেউ আমাকে বলেনি। আমি কি করে যে এই শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছি সে শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্য। তারপর থেকেই এই গান শুনলেই আমার মনে পড়ে ছেলেবেলার সেই নদী তীরের ছবি। তিন ভাইবোন দাঁড়িয়ে আছি দিদির অপেক্ষায়।
তার বহুপরে আমি যখন মা হয়েছি। আমার প্রথম ভালোবাসার সন্তান আমার বড় মেয়ে স্কুলে যায়। তার মধ্যেও আমি আমার রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাই। যখন সে আপনমনে জানালার ধারে বসে পড়তে থাকে মায়ের রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে “আমার মা না হয়ে তুমি অন্য কারো মা হলে ভাবছ তোমায় চিনতেম না, যেতেম না ওই কোলে?
আমি তখন ওর মধ্যে আমাকে দেখতে পাই। পরে সে ভাল বাচিকশিল্পী হিসেবে চট্টগ্রাম বেতারে তালিকাভুক্ত ছিল। বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠনেও আবৃত্তি করত। বিশেষত চট্টগ্রামের জনপ্রিয় কবি, সাংবাদিক আবুল মোমেন ভাই আর শিলাদি’র প্রতিষ্ঠান “ফুলকি” ছিল তার ভালোলাগার তীর্থস্থান। ওঁরা দু’জন ওকে আপন সন্তানের মতই স্নেহ দিয়েছিল। শিলাদি’র সাথে ওর এক গানের অনুষ্ঠানে গান গাইবার জন্য অনেকদিন ওদের গানের মহরা চলছিল ফুলকিতে। আমি তো শুনিনা। অনুষ্ঠানের আগের দিন সন্ধ্যায় সে বসে গাইছিল “অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া”। একমুহূর্তে আমার হাতের কাজ থেমে যায়। আমাকে টেনে নিয়ে যায় ত্রিশ বছর আগের এক সকালের দোরগোড়ায়। আমার চোখে জল।এই গানের কি মানে হল আমার কাছে? আমাকে এই প্রশ্নের মধ্যে রেখে সূর্য তাঁর অস্তে চললেন।
“পিছনে ঝরিছে ঝরঝর জল, গুরু গুরু দেয়া ডাকে
মুখে এসে পড়ে অরুণ কিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে
ওগো কাণ্ডারি কে গো তুমি কার, হাসি কান্নার ধন
ভেবে মরে মোর মন—–
সে ভাবনার কোন কিনারা হলো না।
রবীন্দ্রনাথের গান আমাকে স্পর্শ করা মাত্রই আমি অন্য মানুষে পরিণত হই। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম সবাই বড় হয়ে বিশাল মানুষ হতে চাইতো। আমার কখন তা ইচ্ছে হয়নি। আমার খুব ইচ্ছে হতো রবীন্দ্রনাথের গানের সুর হয়ে বাজতে।সে কিরকম জানিনা। কিন্তু বুকের মাঝখানে একটা দুঃখের বোধ আবার সুখেরও।এক একসময় ভাবি কোনটা আমাকে ভাসায় গান? নাকি সুর।এই যে রং ,তাও আমার মধ্যে রাঙিয়েছে রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে আমার জোর গলায় স্বীকার করতে হয় নি। অস্বীকার ও করতে হয় নি। সূর্যকে কি কেউ স্বীকার করে? কিংবা বৃষ্টিকে মিথ্যা?
রবীন্দ্রনাথের লেখার মধ্যে যে সহজ,সরল অথচ গভীর ভাব তাকে ছুঁতে ছুঁতেই আমার গোটা একটা জীবন চলে গেল। আধুনিক কালের লেখা আমায় ভালো লাগায় বটে কিন্তু প্রাণের মধ্যে দিয়ে চলে যায় না।যে লেখা প্রাণের মধ্য দিয়ে যায় না তা চিরকালীন হয়না। রবীন্দ্রনাথ সেই চিরকালীন গাছের মত। যতদিন সভ্যতা থাকবে রবীন্দ্রনাথ ও থাকবেন সেইসাথে।

x