রবীন্দ্রনাথের আত্মজ

মহুয়া ভট্টাচার্য

শুক্রবার , ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
99

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মূলত রোমান্টিক কবি। নিজেকে তিনি বলেছেন- কাঙালেরও অধিক কাঙ্গাল! এই জগতের কাছে ব্যাকুল প্রণয়ী, সুন্দরকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষায় এক গোপন বিরহী। তিনি যখন কবিতা রচনা করতেন, তখন তিনি কারুর পিতা নন, কারুর স্বামী নন, প্রজাদের জমিদার নন, তখন তিনি নিঃসঙ্গ। তিনি কবিও ছিলেন, কাঙালও ছিলেন! আবার যখন সৃষ্টির উন্মাতাল ঢেউ পেছনে ফেলে সংসারের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াতেন তখন স্নেহময় পিতা। প্রেমময় স্বামী। এক একদিন তিনি সন্তানদের কাছে ডাকতেন পড়াবেন বলে। তাঁর ছেলেমেয়েরা দৌড়ে এসে তাদের বাবা মশাইকে ঘিরে বসত। ছোট্ট ছেলে শমীকে কোলে তুলে নিয়ে, বাকীদের পড়ানোর নাম করে জুড়ে দিতেন গল্প। এখানেই কবি রবীন্দ্রনাথ আর পিতা রবীন্দ্রনাথের পরিচ্ছন্ন দাড় টেনে দিতেন তিনি। সন্তানদের প্রতি ছিল তাঁর আপত্য স্নেহ। ঠাকুরবাড়ির বহু উত্তরসূরী নিজ নিজ কর্মদক্ষতায় স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে লোকসমাজে প্রশংসা কুড়ালেও রবীন্দ্রনাথের কোন সন্তানের নামই সেভাবে পরিচিত হযে ওঠেনি সাধারণের কাছে। অথচ তাঁর প্রতিটি সন্তানকেই তিনি ঠাকুরবাড়ির আভিজাত্য আর শিল্পরুচির সমন্বযে শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। ঠাকুরবাড়ির অন্য সন্তানরা যেভাবে শিল্প, সাহিত্য সমাজ সংস্কারমূলক কাজে নিজেদের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের কোন সন্তানের ভূমিকাই সেভাবে প্রকাশিত হয়নি। একটি কারণ অবশ্য তাঁর পাঁচটি সন্তানের তিনটিই খুব অল্প বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। বাকি দুজন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানার্জনে প্রভূত মেধার স্বাক্ষর রাখলেও পিতার তেজস্বী ব্যক্তিত্ব ও কর্মময় জীবনের আলোকছটায় হয়তো তা ম্লান হয়ে গিয়েছিলো। রবীন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান মাধুরীলতা।
মাধুরীলতা: ছাব্বিশ বছরের পিতা রবীন্দ্রনাথের কোল জুড়ে এসেছিলেন মাধুরীলতা। আদরের আহ্লাদের সীমা ছিল না তাকে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথ আদর করে ডাকতেন বেলা, কখনো বেলী কখনো বা বেলুবুড়ি! মাধুরিলতার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কোন স্কুল-কলেজের মাধ্যমে হতে দেননি কবি। ঘরেই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়ালেখার বন্দোবস্ত করেছিলেন। ইংরেজি ও বাংলা পাঠদানের সাথে সাথে রবীন্দ্রনাথ নিজেই সন্তানদের রামায়ণ, মহাভারত ও উপনিষদের আলোচনা করতেন। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর ছেলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র শরৎকুমার চক্রবর্তীর সাথে বিয়ে হয় মাধুরীলতার। শরৎকুমার ওকালতি পাস করে ঢাকার মজ:ফরপুরে প্র্যাকটিস করতেন বলে, মাধুরীও স্বামীর সাথে মজ:ফরপুর চলে আসেন। এখানে এসে মাধুরীলতা একটি মেয়েদের স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ছোট শহরের সামাজিক রীতিকে উপেক্ষা না করেই তিনি ঘোড়ার গাড়ি চড়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মেয়েদের পড়াশোনা শিখতে উৎসাহিত করতেন, এবং স্কুলের জন্য ছাত্রী সংগ্রহ করতেন। একত্রিশ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
রথীন্দ্রনাথ: রথীন্দ্রনাথ বা রথী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় সন্তান। রবীন্দ্রনাথের সাতাশ বছর বয়সে রথীন্দ্রনাথের জন্ম। ততদিনে শুধু কবি হিসেবে নন, সুগায়ক হিসেবে তিনি আদৃত। পিতার সমতুল্য না হলেও রথীন্দ্রনাথ ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত। বাংলা ইংরেজি দুইভাষাতেই তিনি চমৎকার লিখতেন, ছবি আঁকতেন, কাঠের কাজ আর উদ্যান চর্চায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী ছিলেন। কিন্তু শান্তি নিকেতনে পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার উদ্দেশ্যে গবেষক জীবনের ভবিষ্যত ত্যাগ করেছিলেন। সুখ্যাত পরিবারও আর বিখ্যাত বাবার সন্তান হওয়ার যে ছায়া ও প্রত্যাশার চাপ ছিল- তাতে তাঁর ‘ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স’ ও কম ছিলো না। রথীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্বভারতীর প্রথম উপাচার্য। ব্যক্তিগত জীবনে আধুনিক ভাবধারার অনুসারী হলে পিতার কর্মসাধনাকে কখনোই ভুলে যাননি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কন্যা সন্তানদের ক্ষেত্রে অনেক সমাজ সংস্কারকে আপন করে নিতে পারেননি। যেমন- যৌতুকপ্রথা, বাল্যবিবাহ। তিনি বরপণ দিয়ে কন্যাদের পাত্রস্থ করেছিলেন। তিনটি মেয়েকেই নিতান্ত কৈশরে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পুত্র রথীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে তিনি বিধবা বিবাহের মত বৈপ্লবিক সংস্কারকে নিজের পরিবারে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। রথীন্দ্রনাথের যোগ্য সহধর্মিণী ছিলেন প্রতিমা দেবী। প্রতিমা কেবল রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী হিসেবেই নয় রবীন্দ্রনাথের মা ও কন্যার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিনত বয়সে রথীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে তাঁর স্মৃতিকথা লিখেছিলেন- ‘অন দি এজেন্স অব টাইম (ওরিয়েন্ট লং ম্যান)
জীবনের শেষপর্বে অনেকটা অভিমান নিয়ে তিনি শান্তি নিকেতন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দেহরাদূনে। রবীন্দ্রনাথে জন্ম শতবর্ষের পরের বছরই প্রয়ান হয় রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
রেনুকা: রেনুকা, রানি বা রানু ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনির তৃতীয় সন্তান। রবীন্দ্রনাথের সব সন্তানদের চেয়ে এই মেয়েটি ছিল একেবারে আলাদা। অত্যন্ত জেদী একরোখা রেনুকা প্রায়ই আত্মনিমগ্ন থাকতো। রেনুকার জীবনে তার বাবাই ছিল সব। তার শিক্ষা ও শুরু হয়েছিল ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলেই। তবে পিতা রবীন্দ্রনাথ তাকে উপনিষদের মন্ত্রের ব্যাখ্যা শোনাতেন, পৌরানিক উপাখ্যান শোনাতেন। এগারো বছর বয়সে সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্যের সঙ্গে বিয়ে হয় রেনুকার, বিয়ের পরপরই মায়ের মৃত্যু তাঁর মনকে প্রভাবিত করে ভীষণরকম। মনের ব্যথা পরিণত হয় বুকের ব্যাধিতে। ফুল হয়ে ফোটার আগেই কৈশরের যক্ষ্মারোগে মৃত্যু হয় রেনুকার।
অতসীলতা: মীরার পোশাকি নাম ছিলো অতসীলতা। মীরা নামেই তিনি সবার কাছে পরিচিত। শান্তিনিকেতনে তিনি ছিলেন সবার আদরের মীরাপিসী। লরেন্স সাহেবের কাছে শিখেছেন ইংরেজি আর ছবি আঁকতে শেখান কার্তিকচন্দ্র নান। রবীন্দ্রনাথের অতি উৎসাহে সুদর্শন নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে তার বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্বামীর উদ্ধত্বপূর্ণ আচরণ, আত্মীয় স্বজনের সাথে কদর্য ব্যবহার তাদের স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরায়। একটি পুত্র ও একটি কন্যার জন্মের পর তাঁদের দুজনেরই জীবন বয়ে চলেছিল ভিন্ন খাতে। তাঁর জীবনের দু:খের উপচে ওঠা ডালি কিছুটা ব্যক্ত করেছিলেন ‘স্মৃতিকথা’ আত্মজীবনীতে। এছাড়াও কয়েকটি দেশি-বিদেশি ইংরেজি প্রবন্ধের সার সংকলন করেন তিনি। তারমধ্যে আটটি ছাপা হয় ‘প্রবাসী’ তে এবং তিনটি ‘তত্ত্ব বোধিনী’ তে। জীবনের শেষদিনগুলো তিনি একাকি, ফেলে আসা স্মৃতিভারে ভারাক্রান্ত হয়েই কাটিয়ে গেলেন।
শমীন্দ্রনাথ: রবীন্দ্রনাথের এই পুত্রটিও অকাল প্রয়াত। সবার ছোট এবং দেখতে হুবহু রবীন্দ্রনাথের আদল হওয়াই সকলের কাছে আহ্লাদ ছিল অসামান্য। শমী গানের গলা ছিল অপূর্ব, আর স্মৃতিশক্তি ছিলো অসাধারণ। তার ভাবভঙ্গি ছিল অবিকল তার পিতার মত। কিন্তু শৈশবে মাতৃহীন শমীকে অনেকটা মানসিক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল। কখনো শান্তিনিকেতন, কখনো জোড়াসাঁকোতে ঘনঘন স্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তার সময় কেটেছে। কর্মবীর ও স্মনামধন্য কবির সন্তান হওয়ার সমস্ত মানসিক চাপ ও নিঃসঙ্গতাটুকু পুরোপুরিই ভোগ করেছিলো হয়তো কবির এই আত্মজটি।

x