রক্ষক না ঘাতক?

স্টেরয়েড

ইশমাম ইবনুল আরাবী

শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ

আমরা বডি বিল্ডার কিংবা অ্যাথলেটদের সুঠামদেহ এবং সুউচ্চ পেশি দেখি ঈর্ষান্বিত হই। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছি কি এটা কি করে সম্ভব? মূলত অ্যাথলেটরা তাদের পেশি ফোলাতে একধরনের স্টেরয়েড ব্যবহার করেন যাকে অ্যানাবলিক স্টেরয়েড বলা হয়। কিন্তু সঠিক মাত্রার প্রয়োগ না হলেই বিপত্তি ঘটতে পারে।
স্টেরয়েড কি?

স্টেরয়েড উদ্ভিদ ও প্রাণী দেহে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন এক ধরনের হরমোন। রাসায়নিক গঠনে এটি কোলেস্টেরল এর অনুরুপ। একজন রসায়নবিদ খুব সহজেই স্টেরয়েড দেখলেই শনাক্ত করতে পারবেন। কোন যৌগে যদি দুইটি ষড়ভূজাকার রিং এবং একটি পঞ্চভূজাকার রিং সংযুক্ত অবস্থায় থাকে তবে সেই যৌগেকে স্টেরয়েড বলা হয়। স্টেরয়েড মূলত মানব দেহের বিভিন্ন প্রকার বিপাকীয় কাজ এবং শারীরবৃত্তীয় কাজকে চলমান রাখতে প্রাকৃতিকভাবে শরীরে তৈরি হয়ে থাকে। এদের নিঃসরণ ঘটে মানব দেহের এড্রিনাল গ্রন্থি থেকে। ভিটামিন ডি, বাইল এসিড, সেঙ হরমোন, কিছু এড্রেনাল কর্টিকাল হরমোন ইত্যাদি স্টেরয়েড জাতীয় যৌগের অন্তর্ভুক্ত।
স্টেরয়েড এর প্রকারভেদ

স্টেরয়েড হরমোনকে বিশদভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে- কর্টিকোস্টেরয়েড এবং অ্যানাবলিক স্টেরয়েড। কর্টিকোস্টেরয়েড স্বাভাবিকভাবেই শরীর দ্বারা উৎপন্ন হয়। কর্টিকোস্টেরয়েডগুলিকে দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয় গ্লুকোকার্টিকোয়েড এবং মিনারেলোকর্টিকোয়েড।
উপকারিতা

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে স্টেরয়েড কি আসলেই শরীরের উপকারে আসে কিনা। আশা করি গ্লকোকর্টিকয়েড এবং মিনারেলোকর্টিকয়েডের উপকারিতা সম্পর্কে জানলে তাদের মনের সকল প্রশ্ন দূর হয়ে যাবে। গ্লুকোর্টিকয়েড গুলো শরীরের চর্বি,প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও এরা ভ্রুনের বিকাশকে প্রভাবিত করে এবং মানুষের তীব্র মানসিক ঘটনা গুলোর স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মিনারেলোকর্টিকয়েডস গুলো শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়াও শরীরে যখন এই হরমোন গুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না তখন কর্টিকোস্টেরয়েড গুলো ঔষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েড শরীরের কোষের মধ্যে প্রোটিন বৃদ্ধি এবং পেশি তৈরিতে সাহায্য করে। এছাড়াও এরা শরীরের চুলের বৃদ্ধি, কণ্ঠস্বর এবং গর্ভধারনের ক্ষেত্রেও বেশ প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সাধারণভাবে ব্যবহৃত অ্যানাবলিক স্টেরয়েডগুলির মধ্যে, টেস্টোস্টেরন, ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন, নন্দ্রোলোন, স্ট্যানজোলোল, এন্ড্রোস্টিনডাইওন ইত্যাদি অন্যতম। এদের মধ্যে টেস্টোস্টেরন সম্ভবত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয়। এটি একজন ব্যক্তির শারীরবৃত্তীয়তাকে প্রভাবিত করে।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েড যেভাবে কাজ করে

রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে জোট বেঁধে সংক্রমণ বন্ধ করে। ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেহকে সুরক্ষা দেয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ইনফ্লামেশন।এভাবেই আমাদের শরীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজ করে থাকে। পেশিবহুল শরীর বানানোর জন্য সচরাচর যেসকল অ্যানাবলিক স্টেরয়েড ব্যবহার হয়, তা পুরুষের হরমোন টেস্টোস্টেরনের নিঃসরণ বাড়ানোর কথা।কিন্তু অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের কারণে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্লান্ড শুক্রাণু তৈরির দুটি মূল হরমোন এফএসএইচ ও এলএইচের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় এ ব্যবস্থা অতিমাত্রায় ক্রিয়াশীল হয়ে উল্টো আচরণ শুরু করে। তখন তা টিস্যুর বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকে। এতে করে টিস্যু হয় ক্ষতিগ্রস্ত।
আজকাল বিভিন্ন রোগ যেমন শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক অ্যালার্জি ও অন্যান্য রোগে সংকটাপন্ন ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে ওষুধ হিসেবে অনেক সময় স্টেরয়েড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন চর্মরোগ, আর্থ্রাইটিস, হাঁপানি ও ফুসফুসের কিছু রোগ, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনির কিছু সমস্যায় প্রভৃতি রোগে নির্দিষ্ট সময় ও মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসকেরা স্টেরয়েড দিয়ে চিকিৎসা করে থাকেন। অনেক সময় বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েড ম্যাজিকের মত কাজ করলেও, এটি ব্যবহারে রয়েছে নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।অনেক সময় যেগুলো হতে পারে প্রাণঘাতী।
পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

স্টেরয়েড সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শেষ নেই। এখানে উল্লেখযোগ্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হলঃ

* উচ্চরক্তচাপ
* ক্ষুধা বৃদ্ধি
* অস্বাভাবিক ভাবে ওজন বাড়া
* অনিদ্রা
* চোখে ঝাপসা দেখা ও ছানি পড়া
* সামান্য আঘাতে অধিক যন্ত্রনা ভোগ করা
* ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়া
* পেশি দুর্বলতা
* হাড়ক্ষয়
* দেহের লোমের অস্বাভাভিক বৃদ্ধি
* পুরুষের টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের মাত্রা কমে যাওয়া এবং চুল পড়ে যাওয়া
* নারীদের দাড়ি-গোঁফ গজানো, কণ্ঠস্বর মোটা হয়ে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়া, অস্টিওপোরোসিস, ত্বকে ফাটা দাগ, ব্রণ এবং মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া
করণীয়

আজকাল সর্দি, কাশি থেকে শুরু করে প্রায় সকল রোগের চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কখনো আমরা ডাক্তারের পরামর্শে ব্যবহার করছি আবার কখনোবা নিজেরা ডাক্তার সেজে খেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু দীর্ঘ দিন স্টেরয়েড ব্যবহার করলে দেখা যায়, ওষুধে আর কাজ হচ্ছে না। আর দেহে দেখা দেয় নানাবিধ সমস্যা। স্টেরয়েড ওষুধ সেবন করার কারণে দেহের স্বাভাবিক স্টেরয়েড হরমোন নিঃসরণের ছন্দপতন ঘটে। তাই হঠাত ওষুধ ছেড়ে দিলে বা ভুলে গেলে বমি, দুর্বলতা, পেট ব্যথা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। তাই চিকিৎসকের কাছ থেকে এর মাত্রা ও সেবনের মেয়াদ জেনে নিতে হবে। ওষুধ সেবনের সময় কোনো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবন করলে, ধাপে ধাপে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ কমিয়ে আনতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, এম.এস (জৈব রসায়ন)
রসায়ন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x