‘রক্তকরবী আচ্ছন্ন করে রেখেছে’

রাজীব নন্দী

মঙ্গলবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
115


বই আপনাকে কীভাবে আনন্দ দেয়?

আমার কাছে এ-বড় জটিল প্রশ্ন। আমার পঠিত সব বই আমাকে আনন্দ দেয়নি। কিছু বই ছাত্রজীবনে ‘বাধ্য’ হয়ে পড়েছি, যাকে বলি বিদ্যায়তনিক পাঠ্য-বই। ওসব বই আমাকে মোটেও আনন্দ দেয়নি, পরীক্ষায় পাস করার জন্য পড়েছি। তবে হ্যাঁ, ছাত্রজীবনে নিছক পাস করা বা ভালো নম্বর তোলার জন্য ওসব বই পড়লেও; খুব যত্ন নিয়ে পড়েছি, অবহেলা করিনি। কিন্তু যেসব ‘ভালো লাগা’ বই আমি পড়েছি, তা আনন্দের সাথেই পড়েছি। আনন্দটি হলো এরকম, বইটি পড়তে পড়তে কোন একটি চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাওয়া, কাহিনীর মধ্যে নিজেকে বা কাছের কাউকে খুঁজে পাওয়া, নিজের জীবনের কোন ঘটনাকে বইয়ের পাতায় দেখা, অনেকটা এইরকম। সেরকম দু’য়েকটি বই আছে, যেগুলোর কাহিনীর সাদৃশ্য আমার জীবনে
‘মিরাকল’ হিসেবে পাই। নানান বই আমার জীবন গড়ে দিয়েছে, সেটাই আমার আনন্দ।

দিন বা রাতের কোন সময়টাকে বই পড়ার জন্য বেছে নেন?

এনালগ এবং ডিজিটাল দুই প্রজন্মের সন্ধিক্ষণে কৈশোর কাটিয়েছি। ২০০০ সালে যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছি, তখন দেশ ডিজিটাল হয়নি। হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না। তখন রাত জেগে বই পড়তাম। দিন শুরু হতো ক্যাম্পাসে যাওয়ার তাড়না, ঘুরে বেড়ানো, আড্ডা, ক্লাস, রাজনীতি ইত্যাদির পাকচক্রে। ফলে ছুটির দিনে নিরালা দুপুরে বই ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন নানারকম বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যথাঃ মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাব এসব যন্ত্রাসক্তি রাতে বই পড়ার তাড়নাটুকু কেড়ে নিয়েছে। তবে চেষ্টা করি, যখনই সময় পাই, পড়ার। যেহেতু শিক্ষকতা করি, সবসময় পড়ার মধ্যে থাকতে হয়, সে দিন বা রাত। রাতে গবেষণাধর্মী কাজের লেখালেখি, নেটওয়ার্কিং এবং পরের দিনের ক্লাস-লেকচার প্রস্তুতি নিই। দিনে ভ্রমণ সময়ে পড়ি। সন্ধ্যায় মন বিষণ্ন থাকলে কবিতা পড়ি, শের কিংবা গজল পড়ি। গীতা এবং কোরান পড়ি, সন্ধ্যায় গীতা আমাকে বিশেষভাবে টানে।

সর্বশেষ পড়া কোন বইটি আপনাকে এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে? কেন?

রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘রক্তকরবী’। এ-এক ঘোরলাগা নাটক। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ আমার জন্যই লিখেছেন। একেবারে মুগ্ধ এবং আচ্ছন্ন এই নাটকটি পড়ে। রঞ্জন আর রাজা চরিত্রকে নিয়ে নন্দিনীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমি কখনও রাজা, কখনও বিশু, কখনো রঞ্জন চরিত্রের মুগ্ধতা খুঁজি। নানাবিধ বিবেচনায় কবিগুরুর রক্তকরবী নাটককে শ্রেষ্ঠ নাটক বলে মনে হয়। মানবপ্রেম, সম্পর্ক, আবেগ, প্রবণতা, শপথ ইত্যাদি বিষয়কে রবিঠাকুর দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই নাটকে। এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনী। এই নাটকে থেকেও যে নেই, সে রঞ্জন; একেবারে শেষে যে আত্মাহুতি দেয়। রক্তকরবীর প্রধান চরিত্ররা রাজা, সর্দার ও বিশু চরিত্র। সবাই মিলে নন্দিনীকে চায়, কিন্তু নন্দিনী অপেক্ষা করে রঞ্জনের জন্য। প্রেম প্রত্যাখানে নন্দিনী অকপট, তবে প্রেম বিলানোতে নন্দিনী উদার! নন্দিনীকে কেন্দ্র করে ‘রক্তকরবী’ নাটকে প্রেমের ত্রিভূঅঙ্কিত হয়েছে। ত্রিভূজটি নির্মিত হয়েছে নন্দিনী, রাজা ও রঞ্জনকে নিয়ে। নন্দিনীকে আমার রহস্যময় মনে হয়, অতিমানবীয় বলে মনে হয়। নন্দিনীকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুরের রাণী, সৌন্দর্যের দেবী আর ধৈর্যের প্রতীক বলে মনে হয়। যক্ষপুরীর প্রেক্ষাপট, চরিত্র আর সংলাপ আমাকে আচ্ছন্ন করার মতো। বলাবাহুল্য, ‘রক্তকরবী’র শ্রুতিপাঠ শুনলে মাঝে-মাঝে ভীষণ কান্নাও পায়, যখন বিশুপাগল গেয়ে ওঠে ‘ওগো দুঃখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো’। পুরো নাটকে নন্দিনী নিজে সহজ হয়ে ধরা দিয়েছে প্রতিটি চরিত্রের কাছে। সহজ বিশ্বাসে সে হেসেছে, অট্টহাসি দিয়েছে, নেচেছে, গেয়েছে। কিন্তু সে তার গানে, নাচে, স্বরে, সুরে সবাইকে বলতে ভুলতো না- রঞ্জন নিয়ে আসবে ছুটির বার্তা। রঞ্জনের কথা বলতে গিয়ে নন্দিনী আপ্লুত হয়ে পড়তো। নন্দিনীর স্থির বিশ্বাস- রঞ্জন আসবে। কেউ তাকে আটকাতে পারবে না। নন্দিনীর মত কেউ যখন গ্রহণলাগা যক্ষপুরীতে অপেক্ষা করতে জানে, ক্ষমতা, লোভ আর মোহে পড়ে না, তাঁর জন্য রঞ্জনকে আসতেই হয়। তবে, রঞ্জনের বিয়োগান্তক পরিণতিতে কেবল একটি সংলাপই মনের মধ্যে খচ করে বাজে- ‘তুমি (নন্দিনী) নিজেকে সবার থেকে হরণ করে রেখে বঞ্চিত করেছ, সহজ হয়ে ধরা দাও না কেন?’

দেশ-বিদেশে প্রিয় লেখকদের নামগুলো জানতে চাই

একদম কৈশোরে পড়ে ভালোবেসেছিলাম বিশ্বখ্যাত রম্যরচনা ‘ডন কুইকজোট’র লেখক সারভান্তেসকে। যেহেতু রাজনীতি করতাম, পার্টি টেক্সট হিসেবে এমিল বার্নস পড়েছিলাম মুগ্ধ হয়ে। মাওসেতুংয়ের নির্বাচিত রচনা পড়তে গিয়ে ভাল লেগেছিল মাওকে। ভারতের লেখকদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়েছিলাম কৈশোরে, প্রমথনাথ বিশীর ‘রচনাসমগ্র’ আমাকে মুগ্ধ করেছে, প্রতিভা বসু’র ‘মহাভারতের মহারণ্যে’, শশী থারুরের ‘আবার মহাভারত’, বিনয় ঘোষ’র ‘কালপেঁচার নকশা’, শিশিরকুমার দাশ’র ‘অলীক সংলাপ’, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত’র ‘অলৌকিক সংলাপ’ এমন বই এবং বইয়ের লেখকরা আমার সীমান্ত পেরুনো (বিদেশে) ‘প্রিয় লেখক’। বাংলাদেশের মধ্যে শাহাদুজ্জামানের সমস্ত রচনা আমি পড়ি, বেশিরভাগ বই মুগ্ধ করে। অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজের বিদ্যায়তনিক-গবেষণাধর্মী গদ্য আমাকে খুব টানে। অধ্যাপক ড. ময়ুখ চৌধুরীর বহু কবিতা আছে যেগুলো আমার নিজের জন্যই কবি লিখেছেন বলে ভাবি। আর শ্রেষ্ঠ লেখক হলেন, পরম পূজ্যপাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

প্রিয় কিছু বইয়ের নাম বলুন

এ-বড় মুশকিলের ব্যাপার। প্রিয় বই বাছাই একটি স্বার্থপর ও দুঃসাধ্য কাজ। যেমন, আমার চুলভর্তি ঝাঁকরা মাথা থেকে প্রিয় চুলটি কি বাছাই করা সম্ভব? না। তবে এই মুহূর্তে মনে পড়া প্রিয় বইগুলো হলো- আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমির ‘মসনবী শরিফ’, গীতাচরণামৃতম্‌, শাহাদুজ্জামানের ‘ক্রাচের কর্নেল’ এবং ‘কয়েকটি বিহ্বল গল্প’। একদম শৈশবে ঘোর লাগা দু’টি প্রিয় সাহিত্য না বললেই নয়, শাহরিয়ার কবীরের ‘আবুদের এডভেঞ্চার’ এবং অপর বইটির লেখকের নাম মনে পড়ছে না, বইটি ‘ইনু মামার কমলালেবু’। ‘সোভিয়েত দেশের নানা জাতির রূপকথা’ পড়েছি গোগ্রাসে। ম্যাক্সিম গোর্কিও মা পড়ে কেঁদেছি। স্বর্ণ মিত্রের ‘গ্রামে চলো’ পড়ে শিহরিত হয়েছিলাম। কৈশোরে প্রাণ সিরিজের ‘চাচা চৌধুরী’ ছিল আমার খুব প্রিয়। গ্রিক নাটক ‘ইডিপাস’, রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’, আলী রীয়াজের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’, জেমস জে নোভাক-এর ‘বাংলাদেশ জলে যার প্রতিবিম্ব’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও ইমদাদুল হক মিলনের যৌথ সম্পাদনায় ‘দুই বাংলার দাম্পত্য কলহের শত কাহিনী’ এগুলো আমার ভালো লাগা বই। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ পড়ে প্রকৃতি ও শৈশব চিনেছি। কৈশোরে সমরেশ মজুমদারের কালবেলা উপন্যাস পড়ে বিপ্লবী অনিমেষ হতে চেয়েছিলাম! ভাল লাগার মধ্যে আছে কালকূট রচিত ‘শাম্ব’। এসব প্রিয় বই আমাকে ঘোরের মধ্যে রেখেছে। তবে যদি বলা হয় সবচেয়ে প্রিয় বই, নির্দ্বিধায় বলবো- ‘মহাভারত’। এ-এক অপার রহস্য ও বিচিত্র ঘটনার ঘনঘটায় ভরা
মহাকাব্য।

এমন কোনও বই আছে যা আপনাকে দ্বিধায় ফেলেছে?

প্রাইমারি স্কুলে পড়া ‘আমার বই’ প্রথম ভাগ বইটি কিছুদিন আগে আমার চার বছরের শিশু কন্যাকে পড়াচ্ছিলাম- ‘এত ডাকি তবু কথা কও না কেন বউ’। বিশাখা আমায় বললো, ‘বাবা আমি যখন বউ হবো, আমিও কি এভাবে কথা না বলে চুপ করে থাকবো?’ আমি নিরুত্তর তাকিয়ে রইলাম আমার চিরবিস্মিত শিশুকন্যার দিকে। পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল রসায়নের নাম ‘অভিমান’। বাংলা পড়াতে বসে এই শিশুকে আমি এখন কীভাবে বোঝাই রসায়ন? এজন্যই শিশুদের পড়ানোকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে রিস্ক জব মনে করি। ‘বোবার শত্রু নেই’ বা ‘বউ কথা না বললেই সংসার সুখের হয়’ কিংবা ‘বউ অভিমান করে মাঝেমধ্যে কথা বলেন না’ – এটাই বোধহয় আমাদের শৈশবের পাঠ। সেভাবেই আমরা বেড়ে উঠি! অভিমান ভাঙাতে ভাঙাতে অপরজনের মন যে ভেঙে খান খান হয়ে যায়, সেটা কিন্তু পাঠ্যবইয়ে পেলাম না। ১৯৮৫ সালের ছাপা হওয়া বইটি ১৯৯০ সালে আমার হাতে এসেছিল। তখন আমি শিশুশ্রেণিতে। তারপর ২৯ বছর ধরে বইটি রেখে দিয়েছিলাম আরও কিছু প্রিয় বইয়ের সাথে। এসব পাঠ আমাকে দ্বিধায় ফেলেছে। আরেকটি পাঠ যেমন: ‘অ-তে অজগর ওই আসছে তেড়ে’। স্বরবর্ণ চেনার আগে শিশুকে আমি অজগরের অজানা ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছি।

আপনার জীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে এমন কোন বই…

হ্যাঁ, আছে। গীতা। গীতাকে ধর্মগ্রন্থ নয়, একটি বই হিসেবে পড়েছি। যে-বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আছে অর্জুন ও কৃষ্ণের কথোপকথন। যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনকে মনোবল দেয়ার বাণীগুলোই গীতার বাণী। ভগবান কৃষ্ণ তো জানেন তাঁর ভক্ত একবার যদি ভয় পায়, তবে তাঁকে দিয়ে আর কোনো দুঃসাহসিক কাজ করানো যাবে না। যুদ্ধের ময়দানে অর্জুনকে পেয়ে বসেছে আগাম ভয়। যাকে বলে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’, যা আপনাকে কর্তব্য কর্ম থেকে বিরত রাখবে। অর্জুন যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করতে অনীহা দেখাচ্ছে, কারণ সে বিষাদে আক্রান্ত, ভয়ে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে সব কর্তব্য থেকে। কিন্তু কৃষ্ণের অভয়বাণীতে সে যুদ্ধ করে এবং জেতে। নানারকম ক্লাইমেঙ আর মোটিভেশনাল বক্তব্যের জন্য গীতার বাণী তাই অমৃতপানের মতো। গীতা আমার পড়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনোবলের বই।

বই পড়া নিয়ে অন্যের বা নিজের কোন একটি উক্তি আমাদের সাথে ভাগ করুন

আমি আমার শিক্ষার্থীদের বলি, ‘পড়ো, প্রতিদিন পড়ো, অল্প হলেও পড়ো। পড়তে তোমাকে হবেই। হাইলাইটার দিয়ে দাগিয়ে পড়ো। পড়ো এবং প্রশ্ন করা শেখো। পড়ো এবং সোচ্চার হওয়া শেখো। পড়ো এবং নীরব হওয়া শেখো।