যেভাবে উদ্ধার হলো চরে আটকে পড়া জাহাজটি

চট্টগ্রাম বন্দরে বেশি ওজনের জাহাজ উদ্ধারে রেকর্ড

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ
253

বন্দর চ্যানেলের মুখে চরায় আটকে যাওয়া পণ্যসহ বত্রিশ হাজার টন ওজনের জাহাজ ‘এমভি টিজনিকে’ উদ্ধারের মাধ্যমে নতুন রেকর্ড হলো চট্টগ্রাম বন্দরের। এর আগে প্রায় ২৫ হাজার টন ওজনের একটি জাহাজকে উদ্ধার করা হয়েছিল। সোমবার সকালে কর্ণফুলী নদীর মোহনা সংলগ্ন ১ নম্বর বয়ার কাছে জাহাজটি আটকা পড়ে। জেটির দিকে আসার সময় অন্য একটি লাইটার জাহাজকে পাশ কাটাতে গিয়ে ডান দিকে সরে গেলে কন্টেনারবাহী জাহাজটি চরে আটকা পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি এবং বেসরকারি উদ্ধারকারী সংস্থা প্রান্তিক মেরিনের একটি মিলে মোট পাঁচটি টাগ নানা কৌশলে রাতে জাহাজটিকে উদ্ধার করেছে। এখন জাহাজটিকে বহির্নোঙরে রাখা হয়েছে। জাহাজটির তলায় সার্ভে কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর এটিকে জেটিতে বার্থিং দেয়া হবে। প্রান্তিক মেরিন আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে সাগরের তলদেশে জাহাজটির তলায় কোন ধরনের ফাটল তৈরি বা বন্দরের জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি করে এমন কোন ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে কিনা তা সার্ভে করে রিপোর্ট প্রদান করবে। তবে ভালোয় ভালোয় এত ওজনের জাহাজটি উদ্ধার হওয়ায় বন্দর চ্যানেল বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে। একই সাথে শত শত কোটি টাকার পণ্যও রক্ষা পেয়েছে।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, সিংগাপুর থেকে ১১২৬ টিইইউএস আমদানি পণ্য বোঝাই কন্টেনার নিয়ে মাল্টার পতাকাবাহী এমভি টিজনি নামের কন্টেনার ভ্যাসেলকে বার্থিং দেয়ার জন্য চ্যানেলে আনার সময় বন্দর চ্যানেলের মুখে রিটেইনিং ওয়াল ডিঙ্গিয়ে জাহাজটি চরায় উঠে যায়। জাহাজটির ওজন প্রায় আট হাজার টন। এটিতে পণ্য বোঝাই ১১২৬ টিইইউএস কন্টেনারের ওজন প্রায় ২০ হাজার টনের মতো। এছাড়া জাহাজটিতে বিপুল পরিমান পানি এবং তেল ছিল। সবমিলে জাহাজটির ওজন ছিল প্রায় ৩২ হাজার টন। এত ওজনের কোন জাহাজ এর আগে বন্দরের চরায় আটকা পড়ার কোন ঘটনা ঘটেনি। এর আগে ২০১৩ সালে এমভি গ্ল্যাডিস নামের একটি কন্টেনার ভ্যাসেল ৭৮০ টিইউইএস কন্টেনার নিয়ে চ্যানেলের মুখে প্রায় একই জায়গায় চরে আটকা পড়েছিল। জাহাজটির ইঞ্জিন পুরোপুরি নষ্ট ছিল। ডেথ ভ্যাসেলটিকে ওই সময় বেশ কৌশল করে বন্দর এবং প্রান্তিক মেরিনের টাগ ব্যবহার করে উদ্ধার করা হয়েছিল। জাহাজটির পণ্যসহ ওজন ছিল ২৫ হাজার টনের মতো। কিন্তু ওই জাহাজটি উদ্ধারেও যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। বন্দর চ্যানেলের সব ধরনের নৌযান, এমনকি ডিঙ্গি নৌকা পর্যন্ত সরিয়ে দিয়ে পাঁচটি টাগ দিয়ে জাহাজটিকে উদ্ধার করে জেটিতে আনা হয়েছিল। কন্টেনার খালাসের পর একই ভাবে জেটি থেকে বহির্নোঙরে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। এমভি গ্ল্যাডিসকে পরবর্তীতে সিংগাপুর থেকে শক্তিশালী টাগ এনে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

জাহাজটিতে পণ্য বোঝাই ১১২৬ টিইইইউএস কন্টেনার থাকায় শুরু থেকে সকলেই উদ্বিগ্ন ছিল। এত ওজনের একটি জাহাজকে চরা থেকে টেনে নামানো সত্যি কঠিন ছিল। তাছাড়া জাহাজের পাশেই রয়েছে চ্যানেলের রিটেইনিং ওয়াল। এই ওয়াল বাঁচিয়ে জাহাজটিকে টানার ব্যাপারটি আগাগোড়া মাথায় রাখতে হচ্ছিল। টাগ দিয়ে টানার সময় রিটেইনিং ওয়ালে আছড়ে পড়লে জাহাজটি নতুন করে তির কবলে পড়বে এমন আশংকাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছিল না। এই অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজটির ওজন কমাতে কিছু কন্টেনার লাইটারিং করার প্রস্তাব করে। পানগাঁওগামী তিনটি কন্টেনার ভ্যাসেল তৈরি করা হয় এমভি টিজনি থেকে কিছু কন্টেনার নামিয়ে ফেলার জন্য। একই সাথে জাহাজের সব পানি ফেলে দিয়ে ওজন কমানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু জাহাজের মালিকপ এসব প্রস্তাবে রাজি না হয়ে নিজেরা চট্টগ্রামের বেসরকারি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক মেরিনের সাথে যোগাযোগ করে। আলাপ আলোচনার পর প্রান্তিক মেরিনকে জাহাজটি উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়।

প্রান্তিক মেরিন সোমবার সন্ধ্যা থেকে জাহাজটি উদ্ধারের কাজ শুরু করে। তারা প্রথমে জাহাজটির ওজন হিসেব করে। পরবর্তীতে জাহাজের চারপাশের পানির গভীরতা, কোন দিকে পানি বেশি, রিটেইনিং ওয়ালের অবস্থান ইত্যাদি সার্ভে করা হয়। সাগরের ঢালু দিকও বের করা হয়। পরবর্তীতে পুরো উদ্ধার প্ল্যানের নকশা তৈরি করা হয়। জাহাজটিকে রিটেইনিং ওয়ালের বিপরীত পাশ দিয়ে টেনে সাগরের দিকে নিয়ে যাওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের চারটি টাগ এবং প্রান্তিক মেরিনের একটি টাগ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। রাতের আঁধারে তীব্র কুয়াশা এবং ঠান্ডার মাঝে নানা ধরনের প্রতিকুলতা ভর করে। উদ্ধারকারীরা সব প্রতিকুলতা উপেক্ষা করে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। রাত দশটার মধ্যে উদ্ধার অভিযানের পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা উদ্ধার অভিযান মনিটরিং করতে থাকেন। বন্দরের চারজন পাইলট অংশ নেন উদ্ধার অভিযানে। এছাড়া প্রান্তিক মেরিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার গোলাম সারোয়ারের নেতৃত্বে প্রান্তিকের পুরো টিম অংশ নেয়। সব আয়োজন সম্পন্ন করে দুইটি টাগ দিয়ে রিটেইনিং ওয়ালের দিক থেকে জাহাজটিকে ঠেস দিয়ে রাখা হয়। যেন জাহাজটি কোনভাবেই ওয়ালে এসে না পড়ে। অপরদিকে তিনটি টাগ নানা কৌশলে জাহাজটিকে সাগরের দিকে টানতে শুরু করে। নানা হিসেব নিকেশের নিয়ন্ত্রিত টানাটানির এক পর্যায়ে রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ জাহাজটি জোয়ারের পানিতে ভেসে উঠে। জাহাজটিকে টেনে তিন মাইল দূরে সি এ্যাংকরেজে নিয়ে যাওয়া হয়। জাহাজটি উদ্ধারের খবরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন বন্দরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। জাহাজের বিদেশি মালিকও রাতে মেইল করে ধন্যবাদ দেন সংশ্লিষ্ট সকলকে। নীরবে হলেও অনেকটা রুদ্ধশ্বাস এক উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ওজনের জাহাজকে সোমবার নিশুতি রাতে উদ্ধার করা হয় পারকি উপকূলের কাছে।

জাহাজটির সহসা চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগের কোন সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রায় ৫৫৮ ফুট লম্বা এবং প্রায় ৩০ ফুট ড্রাফটের জাহাজটি বন্দর চ্যানেলের মুখের রিটেইনিং ওয়ালের সাথে সজোরে ধাক্কা খেয়েছে। এতে জাহাজটির তলদেশে কোন ধরণের ফাটল সৃষ্টি হয়েছে কিনা বা বড় ধরনের ঝুঁকির সৃষ্টি হয় এমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রান্তিক মেরিনই এই সার্ভে পরিচালনা করবে। প্রান্তিক মেরিনের সার্ভে রিপোর্টের পরই জাহাজটিকে বার্থিং দিয়ে ১১২৬ টিইইউএস কন্টেনার পণ্য খালাস করা হবে। এতে করে কয়েকশ’ আমদানিকারককে তাদের পণ্যের জন্য কয়েকদিন বাড়তি অপেক্ষা করতে হবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

গতকাল প্রান্তিক মেরিনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার গোলাম সারোয়ার বলেন, আমরা জাহাজটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। এটি শুধু একটি উদ্ধার অভিযানই নয়, চট্টগ্রাম বন্দর যে বড় ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সক্ষম সেই ম্যাসেজটিও বিশ্বের শিপিং সেক্টরে চলে গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (এডমিন এন্ড প্ল্যানিং) মোহাম্মদ জাফর আলম উদ্ধার অভিযান সফল হওয়ার সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সমস্যার সফল সমাধানে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি।

x