যুগ যুগ ধরে একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা : দায় কার

সোমবার , ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ
54

গত ১৫ই নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে ‘যুগ যুগ ধরে একই বিদ্যালয়ে: অনেকে জড়িত কোচিং বাণিজ্যে, ১৫ দিনে ১৮ শিক্ষককে বদলি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবার পর একেকজন ২৪, ২৭ ও ২৮ বছর পার করেছেন। কিন্‌তু ‘বদলির’ দুর্ভাগ্য তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। একই বিদ্যালয়ে যুগের পর যুগ চালিয়ে গেছেন সরকারি চাকরি। সংবাদে আরো বলা হয়, চট্টগ্রামে রীতিমত ‘মৌচাক’ তৈরি করে বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে নির্বিঘ্নে চাকরি করে যাওয়া সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বদলির মাধ্যমে এ মৌচাক ভাঙা শুরু করলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হোসনে আরা বেগম। গত ২০ জুলাই কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে এসেই তিনি একই কর্মস্থলে যুগ যুগ ধরে গেড়ে বসা শিক্ষকদের বদলি শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, একই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৮ বছর পর্যন্ত একটানা চাকরি করছেন। এতে শেকড় গজিয়ে গেছে সংশ্লিষ্টদের। অনেকে আবার কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ সংক্রান্তে ৪২ জন শিক্ষকের তালিকা ঢাকাস্থ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে ইতিমধ্যে। অথচ সরকারি র্বিধিমালা অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানে তিন বছরের বেশি চাকরি করা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী তিন বছরের আগেও বদলি করা যায়। তিনি আরো বলেন, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় জেঁকে বসা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ‘মৌচাক’ ভাঙতে হাত দিয়েছি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বর্তমান উপ-পরিচালককে অভিনন্দন জানাতেই হয় তাঁর এমন কর্মতৎপরতার জন্যে। কুমিল্লা থেকে বদলি হয়ে এসেই তিনি একটা কাজের কাজ করেছেন, তার জন্য সমস্ত প্রশংসার দাবিদার এককভাবে তিনিই। তাঁর বক্তব্যেও সেটা স্পষ্ট। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুরবস্থার চিত্রও ফুটে উঠেছে এ প্রতিবেদনে। শিক্ষা অধিদপ্তরে এতোদিন ধরে অলস-অথর্ব লোকদের নৈরাজ্য ছিল, তা প্রতীয়মান হয়েছে মোটা দাগে। যে সব শিক্ষককে ১৫ দিনে বদলি করা হয়েছে, তাঁরা একই বিদ্যালয়ে যুগ যুগ ধরে থাকলেন কী করে? এঁদেরকে কি আগে কখনো বদলি করা হয়েছিল, যে বদলির আদেশ অমান্য করে সেই বিদ্যালয়ে গেড়ে বসেছিলেন? তিন বছরের বেশি যেখানে চাকরি করা যায় না, সেখানে এতোটা বছর ধরে একই বিদ্যালয়ে চাকরি করার সুযোগ প্রাপ্তিটা কি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ইচ্ছে অনুসারে হয়েছে? মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের জায়গায় যাঁরাই ছিলেন, বদলির এখতিয়ারটা তাঁদের থাকলেও তাঁরা সেই কাজটি করেননি। তাঁদের সেই দোষ এসে পড়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ওপর। শিক্ষকদের তিন বছর চাকরি পূর্ণ হলে অধিদপ্তরে গিয়ে কি তাঁদের বলতে হবে, একই বিদ্যালয়ে আমার চাকরির তিন বছর পূর্ণ হয়েছে, দয়া করে আমাকে বদলি করেন? অধিদপ্তর বদলির আদেশ না দিলে তাঁরা যুগের পর যুগ সেখানেই তো চাকরি করবেন। আসলে যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল স্তম্ভ হলো শিক্ষা। আর, শিক্ষকের সকল দায়িত্ব শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিমানস গড়ে ওঠার সময় শিক্ষকদের থাকতে হয় মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, পেশাগত নিষ্ঠা ও নৈপুণ্য। গতিশীল, মৌলিক ও অর্জিত জ্ঞান-অভিজ্ঞতার পূর্ণ প্রয়োগ করতে হয়, যাতে শিক্ষার্থী অনুকূল পরিবেশে তার আচার-আচরণে পরিবর্তন সাধনে সক্ষম হয়। শিক্ষার অধ্যয়ন, উদ্যোগ, আয়োজন, প্রস্তুতি-সবকিছুই শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে কবিগুরুর একটি বাণী এখানে উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘দানে এবং গ্রহণে থাকবে আনন্দ।’ অর্থাৎ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যৌথ কর্মযজ্ঞে একটি স্বত:স্ফূর্ত আনন্দধারা প্রবাহিত হবে। প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে এই পরিবেশ থাকা চাই। শিক্ষক যেখানে কাজ করবেন, সেখানে তৈরি হবে আনন্দঘন জায়গা। তাঁদের যতোটা সম্মানিত করা যায়, সম্মান বা মর্যাদা দেওয়া যায়, ততোটা মঙ্গল জাতির। এঁরা মৌচাক তৈরি করেন না, বরং অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের গাফেলতি, অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে মৌচাক তৈরি হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি নির্ভর করে শিক্ষকদের ওপর। তাঁদের সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদার দিকটাও স্মরণে রাখা চাই।

x