যদি প্রশ্নই ফাঁস হয়, ঘটা করে বই দিয়ে কী লাভ

জাহেদুল কবির

ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকসহ সব মহলে প্রশ্ন কর্মসূচি দেবে ছাত্র সংগঠনগুলো

বুধবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৪:০৫ পূর্বাহ্ণ
96

বছরের প্রথম দিন সারা দেশে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেয় সরকার। নতুন বই পেয়ে শিক্ষার্থীদের মুখে ফুটে সোনার হাসি। সরকারের নীতি নির্ধারকরাও তখন বলেন, একদিনের মধ্যে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিতে পারাটা বিশ্বে নজিরবিহীন।

তবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলে ‘প্রশ্ন ফাঁসের’ যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়ে সরকারকে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখতে হচ্ছে। মাস না ঘুরতেই বই উৎসবের সেই সাফল্য বিরাট ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সব মহলেই প্রশ্ন, প্রতি বছর যদি নিয়ম মেনে প্রশ্ন ফাঁস হতে থাকে, তাহলে বছরের প্রথম দিন ঘটা করে বই বিতরণের উৎসব করার কী দরকার। শিক্ষার্থীরা বই পড়বে পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য। কিন্তু প্রতিটি পরীক্ষায় যদি প্রশ্ন ফাঁস হয়, তাহলে পড়ে কী লাভ? তাই সরকারের উচিত সময় নষ্ট না করে প্রযুক্তিবিদ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের উৎস চিহ্নিত করা। একই সাথে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। কয়েকজন অভিভাবক জানান, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্র একেবারে ঘোষণা দিয়েই প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে। এতেই বোঝা যায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পর্যায়ে আছে। ক্রমাগত প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনোসংযোগে প্রভাব পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থী মেধার চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বছরের প্রথম দিন বই বিতরণ করে সরকারের রেকর্ড করার দরকার কী। তারা বলেন, বই বিতরণের পাশাপাশি পরীক্ষার আগে যারা প্রশ্ন ফাঁস করে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, যেকোনো পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা অনৈতিক ও অনাকা িত। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। প্রশ্ন্‌ ফাঁসকারী চক্র শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তাই সরকারকে দ্রুত প্রশ্ন ফাঁসের উৎসগুলো খুঁজে বের করে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমবার প্রশ্ন ফাঁস হলে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা নেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। কারণ এতে বিশাল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর সাথে চরম অবিচার করা হবে। প্রথমবার যেভাবে মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুতি, দ্বিতীয়বার সেটি কোনোভাবে সম্ভব হবে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে ১৯৮০ সালে আইন প্রণীত হয়; যা সংশোধিত হয় ১৯৯২ সালে। ওই আইনে প্রশ্ন ফাঁসের দায়ে কমপক্ষে তিন থেকে দশ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের কথা উল্লেখ আছে। তবে আইন প্রণয়নের পর থেকে আজ পর্যন্ত কাউকে ওই আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার নজির নেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা না গেলে কম মেধাবীরা সামনে চলে আসবে। এই সংকট থেকে উত্তরণ করতে চাইলে সরকারকে আরো আন্তরিক হতে হবে। আমাদের স্কুলকলেজের শিক্ষাব্যবস্থায় একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে। কে কার থেকে বেশি মার্কস পাবে, সেটি নিয়ে খুব মগ্ন থাকে। আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যেভাবে পরীক্ষা নিয়ে থাকি, বেশি মার্কস পাওয়ার পরে আবার পরীক্ষা দিয়ে টিকতে হবে, কলেজ পর্যায়েও এখন আবার সেই নিয়ম চালু করার দরকার আছে। তখন বেশি মার্কস পেয়ে ভালো কলেজে ভর্তির এই প্রতিযোগিতাটা কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব। এদিকে দেখা যায়, কম মেধাবীরাই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের পেছনে ছুটে। ধরা যাক, সেই প্রশ্ন পেয়ে তারা পরীক্ষা দিল, ভালো মার্কসও পেল। পরবর্তীতে সে ভালো কলেজ ভর্তি হয়ে পুনরায় প্রশ্ন ফাঁসের পেছনে ছুটবে; যা একটি জাতির জন্য অশনি সংকেত।

বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির (বাকশিস) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবু তাহের চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাগুলো আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সামিল। কথায় আছে, একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হলে তার শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে হবে। আমার মেয়েও এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সে খুবই হতাশ। তার মনে অজানা আশঙ্কা কাজ করছে। কারণ, এত দিন সে শ্রম ও মেধা দিয়ে পড়াশুনা করেছে। পরীক্ষায় যদি তার প্রতিফলন না ঘটে, এটি অত্যন্ত হতাশার। অভিভাবক হিসেবে আমি নিজেও চিন্তিত।

তিনি বলেন, অপরদিকে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে প্রমাণিত হলে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। ওনার বোঝা উচিত, প্রশ্ন ফাঁসের বলি কেন দেশের কোটি কোটি পরীক্ষার্থী হবে। তারা মেধার চর্চা করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীর ব্যর্থতার দায় কেন পরীক্ষার্থীরা নেবে? আমার পরামর্শ হচ্ছে, যেখানে প্রশ্ন ছাপানো হচ্ছে, সেই স্থানে কড়া নজরদারি করা দরকার। এছাড়া প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাগুলো সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস) চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি লকিতুল্লাহ বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের দায় সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। সরকার জঙ্গিবাদ দমন করতে পারলে প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরতে পারবে না কেন? তবে কি সরকার এক্ষেত্রে আন্তরিক নয়! যদি আন্তরিক হয়, তাহলে প্রতিবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন? এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বিভিন্ন সময় বলেছেন, শিক্ষকরা প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত। কিন্তু এ বছর তো পরীক্ষা শুরুর আধ ঘণ্টা আগে হলে প্রশ্নপত্র যাচ্ছে। আবার পরীক্ষার্থীদেরকেও আধা ঘণ্টা আগে হলে ঢুকতে হচ্ছে। তারপরেও প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রশ্ন ফাঁসকারীদের হাতে আগে থেকেই প্রশ্ন থাকে। প্রশ্ন ফাঁসের সমস্যাটি আজকের একদিনের নয়। আগে তো শিক্ষামন্ত্রী স্বীকারই করতেন না। এখন যা একটু স্বীকার করেন। প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা অবশ্যই সম্ভব। পৃথিবীর অন্য দেশ যদি পারে, আমরা কেন পারব না? এটা ঠিক, অন্য দেশের তুলনায় আমাদের মূল্যবোধ নিচের দিকে।

ডা. সুমনা দাশ নামে একজন অভিভাবক দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় দেশের সকল অভিভাবক উদ্বিগ্ন। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে অযোগ্যরা সামনের কাতারে চলে আসবেণ্ডএটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পক্ষান্তরে মেধাবীরা ভালো মার্কস না পেয়ে ভালো কলেজে পড়তে পারবে না। আমার ছেলে কলেজিয়েট স্কুলে পড়ে। সে নিজেও খুব শঙ্কিত। শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, প্রশ্ন ফাঁস হলে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা নেবেন। দ্বিতীয়বার যে প্রশ্ন ফাঁস হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? তার মানে ওনি কি তৃতীয়বার পরীক্ষা নেবেন?

জান্নাতুল ফেরদৌস নামে একজন পরীক্ষার্থী জানান, প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার খবর জানার পর থেকে পড়াশুনায় মনোযোগ দিতে পারছি না। গত দুইটা বছর আমরা কষ্ট করে নিজেদের প্রস্তুত করেছি। পরীক্ষার দিন শুনি প্রশ্নপত্রটি ফাঁস হয়ে গেছে। এখন আবার সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা হচ্ছে। তাই একজনে প্রশ্ন পেলে সেই প্রশ্ন দ্রুত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে। এই কারণে আমরা পরীক্ষার্থীরা খুবই হতাশ।

নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, বর্তমানে পুরো শিক্ষা প্রশাসন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমরা শিক্ষা নিয়ে ছাত্রদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অধিকার আদায়ে মাঠে আছি। প্রশ্ন ফাঁসের উৎসটি আসলে এখনো বের করা সম্ভব হয়নি। তাই আমরা অপে ায় ছিলাম। তবে আমরা আগামী কিছুদিনের মধ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করব।

প্রগতিশীল ছাত্রজোট নেতা ও ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সাধারণ সম্পাদক আতিক রিয়াদ বলেন, গত বছর জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় আমরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছিলাম। এসএসসি পরীক্ষায় যেহেতু লাগাতার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, আমরা দুইএকদিনের মধ্যে আন্দোলন কর্মসূচি দেব।

x