ময়ুখ চৌধুরীর কবিতায় ভালোবাসার জ্যামিতি

মোহাম্মদ জাকের হোছাইন

শুক্রবার , ২৫ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
75

ময়ুখ চৌধুরী কবি। কবি তিনি ভালোবাসার। সেই ভালোবাসার আছে আবার নানান প্রকৃতি আর জ্যামিতি। তাঁর সাথে মিশিয়েছেন রাজনীতির পরিভাষা। প্রথম কাব্য কালো বরফের প্রতিবেশী (১৯৮৯)। সাদা বরফ নয়- কালো বরফ। ভাবনা জাগায় পাঠকের মগজে-হৃদয়ে। আর চুপি চুপি ভালোবাসলে তো হবে না। ‘প্রেম তো চোর’ নয়। সে তো ‘ডাকাতের মতো চিঠি দিয়ে আসে।’ কবি চান ভালোবাসার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি – সামাজিক মূল্যায়ন। কবি তাই শির উঁচু করে বলেন: ‘‘সংসদের শেষ সভার প্রস্তাবমতে, একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে আমাদের ভালোবাসাকে স্বীকৃতি জানানো হবে”।
তারপর না হয় ‘দুজন দুদিকে চলে যাবে’। কিন্তু চোখের জলের কথা সংসদের প্রস্তাবে বলা হবে না। তখন সকলেই জেনে যাবে ‘ভালোবাসা মরে, / তবু পিছুটান কখনো মরে না।’ অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতায় ভরে যায় পাঠকের মন। আধুনিক বাংলা কাব্যে এ যে নতুন শিহরণ। প্রথম কাব্যেই কবি হয়ে ওঠেন প্রিয় কবি। বাংলা কাব্যভুবনে দখল করে নেন অন্য এক উচ্চতা।
তার মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কবিতা বুড়োর মনেও ঢেউ তুলে। তাকে নষ্টালজিক করে দেয়। ভালোবাসার মানুষের নামটি দুচোখের আড়ালে গেলেও শ্রুতির আঁধারে তো ঢুকে আছে মাছি হয়ে। চোখে রুমাল বাঁধা ছিলো এতোকাল। সেই রুমাল খুলতে খুলতে দয়িতার কেটে গিয়েছে তেরোটি বছর। তাও আবার ‘নির্জন ভীড়ের মধ্যে একাকী দুপুরে।’ সময় যা-ই হোক। তখন তার ঘুমন্ত হৃদয় জেগে ওঠেছে নীল পিপাসায়, ঘুমন্ত চোখ জেগে ওঠেছে স্বপ্নের কার্নিসে। বুকের ভেতর তখন ভালোবাসার চোরা টান। শৈশবে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মার্বেলটি খুঁজে পেলে কবি আবার খেলতে চান, ভেঙে ফেলবেন তিনি বয়সের ফ্রেম।
ময়ুখ প্রকৃত অর্থেই একজন প্রেমের কবি। কিন্তু হলে কী হবে! যে স্বপ্নাকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন সেই নামের মাঝেই তো কাঁটার মতো গেঁথে আছে একটা ‘না’। কবি আবার কাঁটার ভয়ে ফুল তুলতে পারেন না। যে কবি সংসদে একুশবার তোপধ্বনি দিয়ে ভালোবাসাকে স্বীকৃতি জানানোয় অধিবেশন ডাকতে পারেন তাঁর আবার ভয় কিসের? তাই তিনি বারবার স্বপ্ন দেখেন, ঘুমের অতলে তলিয়ে যান। সেই ঘুমের প্রতিটি পৃষ্ঠা জুড়ে স্বপ্ন। স্বপ্নের মাঝে কবি প্রিয়ার নামের বানান উল্টে পাল্টে দেন। এক সময় ‘জোছনার জলে প্রিয়ার নামের প্রতিটি অক্ষর ভেসে যায়’। সেই সাথে উলের মতো গোলগোল শাদা দুঃখও ভাসে। কবি তাই জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার চেয়ে স্বপ্নের ভেতরে জেগে ওঠতে চান। সব ‘না’-এর মুখে পেরেক ঠুকে দিতে চান। রোমান্টিক স্বপ্নিক কবি তো এমনই চাইবেন। তাই বলে নিজের জন্মদিনকে জন্মরাতে পরিণত করবেন কেন? ২২ অক্টোবরে ফ্যানের বাতাসে অস্থির কেন হবে ক্যালেন্ডার! তিনি না হয় ভুলে গেছেন। কিন্তু কেউ কেন এসে পকেটে বলপেন গুঁজে দিয়ে বললো না ঐধঢ়ঢ়ু নরৎঃযফধু! জ্বরে পুড়ে পুড়ে সেদিন কবির কপালটাও প্রশস্ত হয়ে ওঠেছিলো। অথচ একটি ‘হাতও ছিলো না তপ্ত ললাটে’। কবির অভিমান তো হবেই। তাই সারা রাত জুড়ে মোমবাতির শিখার মতো জ্বলতে থাকবে কবি। কেউ না আসুক শেষ পর্যন্ত নিশিজাগা একটি প্যাঁচা এসে হলও বলুক ‘বাতিটা নেভাও, আমি কষ্ট পাচ্ছি।’ এতে অন্তত নিশীথের নৈঃশব্দটুকু ভেঙে যাবে, ক্ষণতরে অবসান হবে একাকীত্বের।
কবি হিসেবে ময়ুখের অনুভূতি অনেক প্রখর, সংবেদনশীল। তাই কেবল নিজের দুঃখ নিয়ে লিখেন না কবিতা। অন্যের দুঃখও তাঁকে ভাবায়, কাঁদায়। সুন্দরীর চোখে জল নামলে সুন্দরের চোখে নামবে না কেন? কবির আছে সহানুভূতি, আছে সমবেদনা হোক না সেটা গভীর রাতে, একাকী নির্জন প্রহরে। লোকালয়ে সব সুন্দরীরা যখন ঘুমিয়ে পড়েছে জেগে জেগে কাঁদছে একজন। বাড়ির পাশে আরশিনগর। সেই নগরের জানালাটি হয়তো খোলা। সেই জানালা গলিয়ে কবির দৃষ্টির খেয়া পড়েছে পড়শির নির্ঘুম ঘরে (কক্ষ/রুমে)। কবি দেখছেন সুন্দরীর চোখে জল। ‘কি দুঃখ কাঁদায় তাকে এই বোবা রাতে? কি দুঃখ রয়েছে বাঁধা ঝুলন্ত চাঁদের বেহালাতে/ কি দুঃখ সুখের মতো গাঁথা থাকে প্রিয় কবিতাতে? কবির ভাবনার দরোজা তখন খুলে যায়:
সব সুন্দরীরা ঘুমে, স্বপ্নমগ্ন সব ঘরবাড়ি
সুন্দর পৃথক হয় সুন্দরীর কাছ থেকে ক্রমে
একথা জেনেছে শুধু রাতজাগা একজন নারী।
নিঃসঙ্গ সুন্দরী এক রাতে হয়ে ওঠে যথার্থ সুন্দর। তাই সুন্দরের চোখেও নামে জল। ময়ুখের নরোম নরোম কবিতাগুলো সব বয়সের মানুষকে ডুবিয়ে দেয় ভালোবাসায়। নিয়ে যায় কিশোরবেলার পুকুর পাড়ে। বয়স ‘বিরাশি’ হলেও ‘পুকুর পাড়ে বয়স বারো।’
এমনি অনিন্দ্যসুন্দর কবিতা লেখেন ভালোবাসার কবি ময়ুখ চৌধুরী। জীবনের পরম সত্য ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার প্রতি একান্তভাবে বিশ্বস্ত কবি। ভালোবাসার মানুষটি যেখানেই থাকুক, যার সাথেই থাকুক, যেভাবেই থাকুক আজীবন ভালো থাকুক। এটিই কবির আরাধনা। চোখে ঘুম নেই তার জন্য যে কিনা আজ অন্য কারো। ভৌগোলিক দূরত্ব বেড়েছে, সময়ের দূরত্ব বেড়েছে। কিন্তু সে তো থেকে গেছে হৃদয়ে, মগজে, করোটিকায় সেরেব্রামে। ‘সাক্ষী আছে উদাসীন হাওয়া।’ শুধু আসা-যাওয়াতেই হয়তো কেটে গেছে অনেকটা বছর। বলি বলি করেও বলা হয়নি- যে কথা ছিল অনিবার বলবার। তাই না বলা কথার ঘ্রাণে কাঁপে বনতল অবিরত/ কিছুই বলোনি তুমি, তবু / গাছ থেকে শব্দ ঝরে পাতালের মতো।
ময়ুখ শব্দ দিয়ে যে চিত্রকল্প তৈরি করেন তা একেবারেই অনন্য। এক একটা অনুভূতিই যেন এক একটি চিত্রকল্প। শব্দের জাদুকরী স্পর্শে আঁকা হয়ে যায় এক একটি চিত্র :
“আমি ঠিক দুপুরকেই রাত্রি মনে করে ঘুমোতে যাচ্ছিলাম/ রেলিঙে তোমার এলানো চুল দেখে ভেবেছিলাম রাত্রি নেমেছে।”
ময়ুখও সুনীলের মতো উৎকণ্ঠায় পড়ে যায় প্রিয়ার বিরহে বিরহে। নীরার অসুখ হলে কলকাতা শহরে ট্রাফিক জ্যাম লাগে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলির ছেলে ময়ুখের বুকে বেদনাটা আরও বেশি বাজে:
বুকের ভেতর থেকে ধোঁয়া ওঠে, কিছু পোড়া যায়,
আমি ভয় পেয়ে যাই, একবার তাকে দেখে আসি।
পাঠকেরাও কি কম ভয় পায়? ময়ুখের বুক পুড়ে গেলে এ রকোম কবিতা যদি আর না আসে?
দু’তিন লাইনের কবিতা। বিন্দুর মাঝেই যেন সিন্ধুর গভীরতা। ভাব যেখানে গভীর ভাষা সেখানে সংক্ষিপ্ত। ময়ুখের কবিতায় এ কথা যথাযথ:
“সেদিন থেকে ভুলেও আর কাঁদিনি, যেদিন তোমাকে প্রথম দেখি কেননা
চোখের জলের সঙ্গে যদি জলছবি ঝরে যায়, ঝরে যাও তুমি।”
এ ধরনের কবিতা পাঠ নীরবতা নিয়ে আসে মনে। সেই নীরবতার নাম প্রশান্তি। মৌন আনন্দ। তাই ময়ুখ প্রশান্তির কবি, মৌন আনন্দের কবি। নিজের সাথে নিজে কথা বলার কবি।
ভালোবাসার জন্য প্রেমের কবি সুনীল হাতের মুঠোয় নিয়েছেন প্রাণ, দুরন্ত ষাড়ের চোখে বেঁধেছেন লাল কাপড়, বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনেন ১০৮টি নীল পদ্ম। আর এপার বাংলার কবি ময়ুখ চৌধুরী ‘আগুন! আগুন!’ বলে চিৎকার দিয়ে ওঠেন! তিনি অনেক বেশি সরব এবং কৌশলী :
তোমাকে দেখবো বলে একবার কী কাণ্ডটাই না করেছিলাম
‘আগুন আগুন’ বলে চিৎকার করে
সমস্ত পাড়াটাকে চমকে দিয়ে
তোলপাড় করে
সুখের গেরস্থালিতে ডুবে যাওয়া লোকজনদের
বড়শী গাঁথা মাছের মতো
বাইরে টেনে নিয়ে এলাম
তুমিও এসে দাঁড়ালে রেলিঙে
কোথায় আগুন?
আমাকে পাগল ভেবে যে যার নিজের ঘরে ফিরে গেলো।
কবি আর তাঁর প্রিয়া আছে কাছাকাছি। হয়তোবা পাশাপাশিও। কিন্তু কাছে বা পাশে থাকলেই কি সব হয়? আছে নিষেধের বেড়াজাল। চীনের দেয়াল। তাই বন্ধ দেখাদেখি, চোখাচোখি। তাই বলে কবি কী হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবেন? তখন তিনি আশ্রয় নেন কৌশলের। ‘আগুন আগুন’ চিৎকারে সবাইকে বের করে নিয়ে আসেন ঘরের বাইরে। সবার ভিড়ে তিনি চকিত চাহনিতে দেখে নেবেন তার ভালোবাসার ভেনাসকে। বাইরে আগুন নেই দেখে কবিকে পাগল ভেবে যে যার ঘরে ফিরে গেলো। কিন্তু একমাত্র তাঁর প্রিয়াই দেখতে পেলো শিক্ষিত দুই চোখে কবির ‘বুকের পাড়ায় কী জবর লেগেছে আগুন।’
‘ভালোবাসার শেষ অধিবেশন’-এ কবি ঘোষণা করেন:
চলে যেতে পারো, তবু এসেছিলে এই কথা ঠিক
মানুষেরা ভুল করে, ভুলে যেতে তবুও পারে না
সামান্য চুড়ির শব্দে বেজে ওঠে রক্তের ঘুঙুর,
প্রেমিক-প্রেমিকা হারে, তবু প্রেম কখনো হারে না।
কবি আছে ট্রেনে, ভালোবাসা প্ল্যাটফর্মে। গার্ড এসে পতাকা নাড়লেই ট্রেন যাবে ছুটে। সবকিছু বুঝে ওঠা বা বুঝে ফেলার আগেই দু’জন দু’দিকে। বোঝার সুযোগ থাকলেই কি সবকিছু বোঝা যায়? যায় না তো। তাই ময়ুখ বলেন :
সবকিছু বোঝা শেষে থেকে যায় কিছুটা না বোঝা
বিচ্ছিন্ন পথের মতো ভালোবাসা দীর্ঘ হতে থাকে।
বিশ্বশান্তি সম্মেলনে শহর যখন কূটনীতিবিদ, রাষ্ট্রপতি, বুদ্ধিজীবী, গোয়েন্দা-সাংবাদিকে ঠাসা ঠিক তখন একটি তরুণ আর একটি তরুণী আদম হাওয়ার মতো মুখোমুখি হয়েছিল। ছেলেটির মৃদুহাসি আর মেয়েটির চোখের কালোয় দূর আকাশের তারা কেঁপে ওঠেছিল। অথচ-
“ছেলেটি জানতো না – মেয়েটি কএই
মেয়েটি জানতো না – ছেলেটি ঈওঅ
ছেলেটি জেনেছিলো – মেয়েটি প্রেমিকা
মেয়েটি জেনেছিলো – ছেলেটি প্রেমিক।
শান্তি সম্মেলনের অশান্ত বিতর্ক আর কোলাহল ছেড়ে সেই দুজন দেশের মানচিত্র ভুলে মেতেছে জাতি নিরপেক্ষ ভালোবাসায়। তখন পিরামিড আয়োজন গলে যেতে দেরি থাকে না। ঘনত্রিভুজের মধ্যে জেগে ওঠে দুটি হৃদয়। আর কল্লোলিত স্বপ্ন দেখে কেঁদে ওঠে কালো বরফের প্রতিবেশী।
সময়ের আবর্তে কবি আটকে আছেন সংসারের কূটজালে। কিন্তু সেই জাল কি তাঁকে ধরে রাখতে পারবে অনন্ত সময়? তিনি তো কবি। মুক্তবিহঙ্গ। ঘুরে বেড়াবেন আকাশে আকাশে। জলে জলে। সেই জলে ভ্রমণ করতে গিয়েই হয়েছে যত বিপত্তি। তখনই তার হৃদয় অনুভূতি : অর্ধেক রয়েছি জলে, অর্ধেক জালে। যাবেন কোথায় তিনি? কবি হিসেবে তার যাত্রা তো হবে কবিতার কাছে। কবিতার দরোজায় গিয়ে টোকা দেন : কবিতা, দরজা খোলো, আমি এক অনিদ্র জোনাকি / নিজের আগুনে পুড়ে রয়ে গেছি অবুজ সবুজ। / তোমাকে রচনা করি এ রকম সাধ্য বলো কই। এটি তাঁর কবিসুলভ বিনয়। তাঁর আর বলার দরকার নেই – কবিতা, তোমার ঘরে জায়গা হবে? ময়ুখ ইতোমধ্যেই বাংলা কবিতার অঙ্গনে শক্তপোক্ত জায়গা করে নিয়েছেন। কেবল আরো আরো অনুসন্ধানের অপেক্ষা।
মিলন-বিরহ নিয়েই ভালোবাসা। তাই ময়ুখের কবিতায় কেবল মিলন কিংবা মিলনের আকাঙ্ক্ষা নেই। আছে বিরহও। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে কালিদাসের মতো তাঁর মনও কেঁদে ওঠে বিরহে। হাহাকার করে সমস্ত হৃদয়। তখন গেয়ে ওঠে মন :
“আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে
এ মন ময়ূর হতে চায়,
তবু কেনো বিরহের হাওয়া
উদাসীন আমাকে নাচায়।”
কবি কিছুই চায়নি প্রিয়ার কাছে। উল্টো সে-ই দিতে চেয়েছিল সবকিছু কবিকে। সবকিছু দিতে গিয়ে সবকিছু নিয়ে গেছে। সবকিছু পেতে গিয়ে সবকিছু হারিয়েছে।
তাই “আষাঢ়-শ্রাবণ দুই চোখে / বয়ে যাক বেহুলার নদী / ভাসানে প্রেমের লাশ নিয়ে / তুমি চলে যেও নিরবধি। কবিও ফিরে যেতে চায় ভালোবাসার রামগিরিতে যেখানে মেঘেরা কবিকে চুমু খায়।’ কবির কাছ থেকে নতুন প্রস্তাব আসে :
ভেসে যাই জল ভালোবেসে
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে।
আষাঢ়ের প্রথম দিবসে বৃষ্টির কান্নায় কবির চোখে যদি লোনা জল ঝরে সেও ভালো। কিন্তু উপেক্ষার তীরে যদি রক্তাক্ত হয় হৃদয় কবির মনে জেগে ওঠে অপ্রতিরোধ্য অভিমান :
তোমার কিসের এতো অহংকার, না-চেনার শিল্পীত প্রয়াস।/ তুমি তো জানোই; আমি আজও ভালোবাসি।/ তবু যদি হও তুমি রাজহংসী, তবে আমি ঘুমভাঙা শঙ্খচূড় আজ/ তুমি রাণী বিভাবতী, আর আমি কুমার সন্ন্যাসী।
কবিরা প্রত্যাখ্যাত হলে সন্ন্যাসী হয়ে যায় মনে মনে। কিন্তু আজীবন এ সন্ন্যাসব্রত পালন করতে পারে না। বেনারসীর আঁচল রেশমি হাওয়ায় জ্বলে ওঠলে কবি-সন্ন্যাসীর ধ্যান ভেঙে যায়। বরফঘুমও থাকে না আর চোখে।
কবির ভালোবাসা কেবল প্রিয়ার জন্যে নয়। তিনি ভালোবাসেন তাঁর দেশ, তাঁর শহর, বিশেষত চাটগাঁ শহরের সাথে আছে তার অন্তর আত্মার নিবিড় সম্পর্ক। বিনিসুতার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। তাইতো তার হৃদয় থেকে উৎসারিত হয় :
এ শহর আমার শহর
এখানে বৃষ্টি-মেঘে কেটেছে হাজার বছর।
জীবনানন্দ যেমন হাজার বছর ধরে পথ হাঁটেন পৃথিবীর পথে। তেমনি কবি ময়ুখও হাজার বছর ধরে বাস করেন চাটগাঁ শহরে। বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী, পরীর পাহাড় তাঁরে বার বার হাতছানি দিয়ে ডাকে। এ শহরে এসেছে জলের ডাকাত, এসেছেন যুবক কবি। এখানে নদীরা নারীর মতো। মেঘের পরীরা গল্প বলে। কবি কান পেতে থাকেন সেই গল্প শোনার জন্য। শুভক্ষণে, শুভলগ্নে সময় না হয় একটু থেমে থাক :
থেমে থাক কালের ঘড়ি, থেমে থাক আলোক বছর
বেঁচে থাক নীল আবেগে চিরদিন বৃষ্টি-মেঘে
প্রাণের এ মুগ্ধ প্রহর। তোমার আর আমার শহর
এখানে বৃষ্টি-মেঘে কেটেছে হাজার বছর
কেটে যাক হাজার বছর
কেটে যাক হাজার বছর।
যখন প্রিয় রমণীর নামের গন্ধ ঝরে পড়ে ভোরের বাতাসে তখন কবি অর্ধেক প্রেমে পড়ে যান। তাহলে বাকি অর্ধেকের কী হবে? তিনি কি একটু দূরে থাকতে চান ভালবাসা থেকে? না, তিনি বাকি অর্ধেকটাও পূর্ণ করতে চান। তবে অর্ধেক নিবিড় শ্রমে, অধোক্রমে / আমাদের অভিযাত্রা পূর্ণ হবে পরিশ্রান্ত প্রেমে।
কবি তার ভালোবাসা দিয়ে ছাদ থেকে আকাশের নীলের দূরত্বও মাপতে পারেন। যেখানে সকল মাপকাঠি ব্যর্থ হয় এ আয়োজনে, ভালোবাসাই পারে সঠিক পরিমাপটা নির্ণয় করে দিতে। আবার এ দূরত্ব মাপার সঠিক মাপকাঠি হওয়া সত্ত্বেও ভালোবাসায় থাকে রাগ-অনুরাগ। থাকে না বলা অনেক কথা। অনুরাগ একদিন অভিমান হয়ে ঝরে। তাই বলে কি প্রিয়া চলে যাবে?
মুখের ভাষায় হয়তো বিরাগ ছিল
তাই বলে কি এমনি করেই যাবে?
চোখের ভাষা দেখলে না তো সখি
সেইখানে প্রেম জ্বলছিল কীভাবে।
কবিরা দ্রষ্টা। দেখতে পায় অনেক দূর। তাদের সবকিছু খুলে বলতে হয় না। ইশারা ইঙ্গিতে, আড়ালে আবডালে বুঝে নেয় সব। প্রথম পরিচয়েই গ্রীবায় সুদৃশ্যমান একটি তিল বাদ দিয়ে আর কটা তিল গোপন করেছে কুমারী তাও দেখে ফেলেছে কবি। কারণ কবির আছে কল্পনার চোখ। কবি হঠাৎ চিবুকে টোকা মারে আর হেসে বলে ওঠে-
“বুকের আগুনটুকু চোখে এনে একবার চোখ টিপে দিলে
আড়াই সেকেন্ড স্থায়ী ভূমিকম্পে সীমানা ওপার
তারপর সব একাকার।”
কুমারীর ঘুম কেড়ে নিয়েছে কবি। বিনিদ্র শয্যায় সারারাত ছটফট করে। সারারাত খোলাচুলে মেঘের প্রেরণা এসে তার দুচোখে ময়ুর এঁকে দিয়েছে। জানলার শিক ধরে চাঁদ দেখেছে রাতের আকাশে। কবির সামনে কবিতা ভাল্লাগেনা বললেও গোপনে গোপনে কবিতা তার ভাল লাগে। শুধু কি কবিতাকে? কবিকেও তার ভাল লাগে। শুধু ভাল লাগা নয়, ভালও বেসে ফেলেছে।
কবি মাত্রই ভালোবাসা চায়। ভালোবাসাহীন জীবন তার কাছে যেন মানবজনমের কলঙ্ক। তাই ঠোঁট বেঁকিয়ে কেউ কবিকে ‘জাহান্নামে যেতে’ বললেও কবি যেতে রাজি আছেন। কিন্তু পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করেন ‘কোন ইস্টিশনে গোলাপি রং-এর টিকেট পাবেন? ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিয়ে কবি ঠিকই প্ল্যাটফর্মে চলে যান আর আকাঙ্ক্ষিতাকে জিজ্ঞেস করেন : জান্নামের ট্রেনটি নাকি ছাড়ে তোমার ইস্টিশনে, / তাই কি তবে!
কবি ময়ুখের মতে, ‘প্রতিটি মানুষই ভিতরে ভিতরে কবিতা, বাইরে প্রবন্ধ।’ বাইরে হিসেব নিকেশ – ভেতরে আবেগ অনুরাগ। তাই অ্যাকুরিয়ামের মতো সংসার ভেঙে, ছন্নছাড়া ফড়িঙের ডানা হয়ে পতেঙ্গার সমুদ্র সৈকতে ছুটে যায় দু’জন মানব-মানবী। তাদের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হবে সমুদ্র সাময়িকী, যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় জলের অক্ষর এসে ছুঁয়ে দেবে নুড়ি ও পাথর।’ সামাজিক বিধিনিষেধের মতো অনেক সিগন্যাল উজিয়ে কর্ণফুলীর হাত ধরে মোহনা পর্যন্ত উপনীত হয়েছিল তারা। পাশাপাশি বসেছিল কিন্তু কাছাকাছি হতে পারেনি। কারণ, আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে উপযুক্ত উদ্যোগ ছিলনা, ছিল উৎকণ্ঠা। অপমানিত সমুদ্রকে পেছনে ফেলে অবশেষে তারা জেব্রা-ক্রসিঙের সন্ধানে ওঠে পড়ে। দুজন আলাদা আলাদাভাবে ফিরে আসবে নগরে, অ্যাকুরিয়ামের সংসারে।
ভালোবাসা দূরত্ব মুছে দিতে চায়। তাই খুঁজে নৈকট্য। তাই বলে মাত্র ‘এক পৃষ্ঠার দূরত্ব’? কবি আর প্রিয়া দাঁড়িয়ে আছে সেই দূরত্বে। সময় গেছে থেমে:
একটি পৃষ্ঠার ব্যবধানে
তুমি আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি / মাঝখানে
অলিখিত একটি কবিতা।
সেই অলিখিত কবিতাটি আবার পড়ে শোনাতে বলেন তার দয়িতাকে। পড়ে শোনাবার কি প্রয়োজন। কবিতাটি অনুভব করলেই তো হয়।
প্রেমিক-প্রেমিকার বয়স বাড়ে। প্রেমের কখনো নয়। বয়সের ভারে চুলে পাক ধরতে পারে। শর্করাবিহীন রং চা খেতে হতে পারে। কিন্তু প্রেম দাঁড়িয়ে থাকে আগের জায়গায়। তাই বহুকাল পরে দেখা হলেও তারা অনুভব করে সেই শিহরণ। সেই অনুরাগ যা ছিল প্রথম যৌবনে, প্রথম জীবনে। তাই কবির উপলব্ধি :
জ্যামিতি গিয়েছে সরে তোমার লাবণ্য থেকে দূরে
তোমার শরীর থেকে সমুদয় অহংকার আজ
রিকশার চাকার সঙ্গে ঘুরে গেছে সূর্যাস্তের দিকে।
তবুও তোমায় তিল যথাযথ আগের মতন
তবুও তোমার মন যথারীতি আগের মতন
তবুও আমার মন কেঁপে ওঠে আগের মতন।
যে একবার প্রেমে পড়েছে তার মন অবশ্যই কেঁপে ওঠবে আগের মতন। মাঝখানে হোক না সময়ের অনেক ব্যবধান। দেহের জ্যামিতি যা-ই হোক, মনের জ্যামিতি তো আগের মতই থাকে।
ভালোবাসায় বয়সের কোনো সমীকরণ নেই। অসম বয়সেও হতে পারে ভালোবাসা। জীবনের শেষ বিকেলে এসেও মনে পড়তে পারে কৈশোরের প্রেম যা ছিল দুটি ভিন্ন বয়সের মাঝে। কৈশোরের কনক আপা কবির মনে আজো অনুরাগ তুলে। তার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। হয়তো সেই কনকচাঁপা এখন ঘুমোচ্ছে অন্য পাড়ায় । কিন্তু স্মৃতিরা তো আর মরেনা। তাই কবি উচ্চারণ করেন :
কনক আপা ডাক দিয়ে আজও
একটা বালক ঝাপসা অনুরাগে
পায়রা বুকে রাখবে বলে মাথা
ইচ্ছে করেই ছিলো অন্য দলে
বেশ দেরিতে কনকচাঁপা
নম্র কঠিন শিল্পিত কৌশলে।
বালকবেলার ‘শুদ্ধতম ভুলগুলো’ এখন বিকালের ফুল। অন্য রকম আনন্দের সুরভি ছড়ায়। ভালোবাসায় তার শিক্ষক তার দাদা। যে প্রেম করেছিল বোসের মেয়ের সঙ্গে। দাদার দেখাদেখি তারও ভালবাসতে ইচ্ছে করে। তাই একদিন বুকটান করে বলেই ফেলে : রিনুদি, তোমাকে আমি ভালোবাসি,/প্রেম করবো। রিনুদি তাকে আদরে আদরে ভরে দেয়। তারপর নাকটাকে মৃদু টেনে দিয়ে বলে : দুষ্টু, এবার ফিরে যা। কবি সেদিন অপমান বোধ করেছে কিনা জানি না। কিন্তু বার বার সেই স্মৃতির কাছে ফিরে যেতে চায় তার মন। কৈশোরের সেই অনুরাগ মানুষকে পিছনে টেনে নিয়ে যায়। বলে : তোমার সেই প্রেমই সত্য ছিল, বুড়ো খোকা ।
কেবল কনক আপা, রিনুদি নয়। যুগান্তরের গল্পে কবিকে নীলোফারও ডাক দেয়। ডাক দেয় টিপ বোতামের ঘর, ভুল বানানের নাম, রুলটানা খাতা, বটপাতা, বারো বছরের মেঘ, বৃষ্টিপাত। পৃথিবী সূর্যকে বহুবার প্রদক্ষিণ করেছে ইতোমধ্যে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটার মতো ঘুরে ফিরে আসে শৈশব, কৈশোর, বালকবেলা আর নিষ্পাপ ‘কাফ লাভ’ (ঈধষভ ষড়াব)। বয়স বাড়তে বাড়তে মানুষ বৃদ্ধ হয়ে যায়, চুলে কলপ লাগায়, চোখে ভারি কাঁচের চশমা তুলে। যে মেহেদী একদিন গোলাপি নখে আর হাতের তালুতে লাগাতো তা এখন চুলে মাখে, সাদাটাকে একটু ঢেকে দিতে। চারদিকে পাতা ঝরে, সারা ঘরে বৈশাখের মেঘ আর নখ-রেখা । কবি মৌন চিৎকারে ফেটে পড়ে-দাও দেখা, দাও দেখা, কাছে এসে বলো একবার/এইতো বৃষ্টির মতো আবার এসেছি ফিরে সেই নীলোফার ।
ময়ুখের ক্যালেন্ডারে ১৯৭০ সালে ৩৬২ দিনে হয়েছিল এক বছর। বাকী তিনদিন কী হয়েছিল পৃথিবীতে? ঐ তিন দিন কোথায় ছিলেন কবি? তিনি আত্মগোপন করেছিলেন কোন হৃদ-মাঝারে, যেখানে সময়দাঁড়িয়ে থাকে? মনের ক্যালেন্ডার আর দেয়ালের ক্যালেন্ডারের পার্থক্য কতোদিন? আমরা জানিনা, কবিই কেবল জানেন। কিন্তু তিনি কাউকে বলবেন না । কারণ তিনি ভালোবাসাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :
আমি কথা দিচ্ছি, কাউকে কিছু বলবো না
বলবো-এসবের জন্যে তুমি দায়ী নও ।
নদী এলে কবি ভিজে যাবে। চাঁদ এলে পুড়ে যাবে । বৃষ্টি এলে আগুন হবে। জোনাকি এলে অন্ধকার হবে। ওদের সবাইকে কনভিন্স করে ফেলবে। বলবে- ‘কেউ কাউকে দুঃখ দিতে পারেনা, দুঃখ পেতে হয়।’ শুধু চন্দ্রমল্লিকা এলে কবি আকাশ হয়ে যাবে। কারণ চন্দ্রমল্লিকার জানালার পাশে বেচারা কবি অনেক বছর দাঁড়িয়ে ছিল একটু ভালোবাসার জন্যে ।
ময়ুখ চৌধুরী অনিবার ভালোবাসার কবি। তিনি ভালোবাসাকে কবিতায় আঁকেন নিপুণ শিল্পীর তুলির আঁচড়ে। তাঁর কবিতা পাঠকের মনে শিহরণ জাগায়, দোলা দেয়। ভাসতে বলে প্রেমের বানে। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, মুক্তক-সব ছাড়িয়ে ময়ুখের লেখা হয়ে উঠে মৌলিক কবিতা। প্রকৃত অর্থেই আধুনিক বাংলা কাব্যে ময়ুখ চৌধুরী একজন মৌলিক কবি। তাঁর কবিতা নিয়ে অনেক অনেক আলোচনা হওয়া দরকার। সমালোচকদের নীরবতা তাঁর কবিতা আর কতোকাল সহ্য করবে? তাঁর গুটিকয়েক কবিতাকে নিয়ে এ লেখাটি। তাই এ লেখার আছে সীমাবদ্ধতা। ময়ুখের কবিতার বিষয়বস্তু কেবল ভালোবাসা নয়। কবিতার দেহে ছড়িয়ে আছে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, ইতিহাস। তাঁর কবিতার পরিধিও কম বড়ো নয়। আবার বেশি বড়ো নয়। প্রকাশিত কাব্য দশের কাছাকাছি। কবিতার নামে বেশি বেশি অ-কবিতা লেখা ময়ুখের খুব বাধে। তাই তিনি দৈনিকিতে খুব একটু লেখেন না। কবিতা সৃষ্টিতে তিনি অনেক যত্নশীল, পরিশীলিত। কবিতার শিল্প মানে বরাবরই বিশ্বাসী ময়ুখ চৌধুরী ।

x