ম্যালেরিয়া জ্বর নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ
63

ইতিহাসবিদ টিমোথি সি উইনোগার্ড মন্তব্য করেছেন পৃথিবীতে যতদিনে গ্রহাণু বৃষ্টি হয়েছিল তার আগেই মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ডায়নোসররা বিলুপ্ত হওয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ম্যালেরিয়া প্রাচীন আফ্রিকাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই রোগটি প্রাচীন গ্রীক এবং রোমানদেরও গণহারে মেরেছিল। এমনকি সে সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধের ফলাফলও নির্ধারণ করে দেয় মশা। গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটসের বর্ণনায় ম্যালেরিয়া জ্বরের মহামারী সম্পর্কে ধারণা করা যায়। তিনিই প্রথম এই রোগের লক্ষণ সমূমের বর্ণনা দেন এবং বছরের কোন সময় এটা হয় ও কোন জায়গায় রোগীরা বাস করে সেই তথ্যের সঙ্গে একটা সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। ম্যালেরিয়া প্রাচীন রোগ। ম্যালেরিয়া ইটালিক শব্দ হতে উৎপত্তি। যার অর্থ দূষিত বায়ু। ফলে মানুষ তখন ভাবত ম্যালেরিয়া হলো মন্দ বাতাসের ফল। গত ২২ আগস্ট ২০১৯ তারিখের কালের কণ্ঠের বরাত দিয়ে জানাচ্ছি এই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫৮ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিলেও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে আছে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ। দেশের ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ রয়েছে বেশি এবং মোট ম্যালেরিয়া রোগী ৯১ শতাংশই তিন পার্বত্য জেলায়।

ম্যালেরিয়া জ্বরের কারণ : এর কারণ হল ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট নামক প্রোটোজোয়া। ১৮৯৭ সালে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ ডা. স্যার রোনাল্ড রস প্রথম এই প্রোটোজোয়ার আবিস্কার করেন এবং তিনিই ঘোষণা করেন যে, এ্যানোফিলিস স্ত্রী জাতীয় মশা এই রোগের প্রোটোজোয়াদের বাহক। যা মূলত বিভিন্ন প্রজাতির প্লাজমোডিয়াম। এই প্যারাসাইটগুলো ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে মশার কামড়ের মাধ্যমে মশার দেহে ঢোকে। বিভিন্ন প্রজাতির মশার মধ্যে কেবলমাত্র স্ত্রী এ্যানোফিলিস মশার মধ্যে এর একটি চক্রবৃদ্ধি ঘটে এবং এই ধরনের মশা যখন সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ায় তখন ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট তার দেহে প্রবেশ করে ও ম্যালেরিয়া সৃষ্টি করে। মানুষের দেহে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ঢোকার অল্পক্ষণের মধ্যেই ম্যালেরিয়ার জীবাণূ রক্ত থেকে লিভারে চলে যায় এবং সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে। কয়েক দিন পর লিভার থেকে বেরিয়ে এরা রক্তের লোহিত কণিকা আক্রমণ করে। লোহিত কণিকার মধ্যে এদের আবার বংশবৃদ্ধি ঘটে এবং এক পর্যায়ে লোহিত কণিকাগুলো ফেটে গিয়ে ম্যালেরিয়ার জীবাণু রক্তে ছেড়ে দেয়। এটাই ম্যালেরিয়ার জ্বরের কারণ।

ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট কত প্রকার : ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট ৪ প্রজাতির হয়। যেমন-
১. প্ল্যাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স (৪৮ ঘন্টা পর পর জ্বর আসে)
২. প্লাজমোডিয়াম ওভেল (৪০-৪৮ ঘন্টা পর জ্বর আসে)
৩. প্লাজমোডিয়াম ম্যালেরি (৭২ ঘন্টা পর পর জ্বর আসে)
৪. প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম (অনিয়মিত) ম্যালেরিয়া রোগ হয়।

ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রকৃতি
* প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাঙ ও ওভেল : যে জ্বর সৃষ্টি করে তা প্রতি তৃতীয় দিনে বা একদিন অন্তর একদিন আসে বলে একে টারসিয়ান ম্যালেরিয়া বলা হয়। এখানে মাঝের একদিন জ্বর থাকেই না।
* প্লাজমোডিয়াম ম্যালেরিয়া : যে জ্বর সৃষ্টি করে তাকে দুদিন অন্তর জ্বর আসে এবং এটিকে কোয়াটার্ন ম্যালেরিয়া বলে।
* প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম ঃ যে জ্বর সৃষ্টি করে তাকে বলা হয় সাবটারসিয়ান ম্যালেরিয়া। এতে জ্বর চলতেই থাকে তবে দৈনিক একবার জ্বর ছাড়ে আবার আসে। তবে যেভাবে বর্ণনা করা হল ম্যালেরিয়ার জ্বর ঠিক সেভাবে নাও আসতে পারে।
* কখনো কখনো জ্বর উল্টো-পাল্টা ভাবে হঠাৎ আসে। ওষুধ খেলে সেরে যায়, আবার জ্বর চলে আসে। ওষুধের ফলে রক্তের জীবাণুগুলো মারা গেলেও লিভারে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থাকে একে বলা হয় ল্যাটেন্ট ম্যালেরিয়া।

ম্যালেরিয়া রোগের লক্ষণ
* শীত অবস্থা ঃ ম্যালেরিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জ্বর। রোগী শীত শীত অনুভব করে হাত-পা ঠান্ডা হয়, প্রবল কম্পন দিয়ে জ্বর আসে। রোগী এতে বেশি কাঁপতে থাকে যে লেপ কাঁথা কম্বল দিয়ে রোগীর সমস্ত শরীর ঢেকে রাখলেও কমপন বন্ধ হয় না। এই অবস্থায় জ্বর বেড়েই চলে। জ্বর খুব বেড়ে গেলে রোগী অনেক সময় প্রলাপ বকতে থাকে। দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ১০৩-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠে।

* উত্তাপ অবস্থা : জ্বর পূর্ণ ওঠে গেলে অর্থাৎ ১০৪-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর ওঠার পর কম্পন বন্ধ হয়। তাই এই অবস্থাকে বলা হয় উত্তাপ অবস্থা। তখন রোগী শরীরে কাপড় রাখতে পারে না। গাত হাত পা জ্বালা শুরু হয়। সাথে মাথায় যন্ত্রনা, বমি, মাথাধরা, প্রলাপ, অবসাদ প্রভৃতিও দেখা যায়।
* ঘর্মাবস্থা : জ্বর কিছুক্ষণ চলার ঘাম শুরু হয়। ঘাম হলে আরাম বোধ হয়। তাপমাত্রা কমতে থাকে।
পরীক্ষা নিরীক্ষা : ব্লাড ফর এম.পি ও ব্লাড ফর আর.ই টেস্ট করে রোগ নির্ণয় করতে হবে।
ম্যালেরিয়ার জটিলতা : ১) রক্তস্বল্পতা ২) সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া-দ্বিধাগ্রস্ততা, সংজ্ঞাহীনতা ৩) কিডনি-প্রস্রাব কম তৈরি হয়, ইউরেমিয়া, হঠাৎ কিডনির কার্যকারিতা লোপ পাওয়া। ৪) ফুসফুস-কাশি, পালমোনারি শোথ ৫) অন্ত্র- ডায়রিয়া ৬) লিভার-জন্ডিস ও লিভার বড় হতে পারে ৭) প্লীহা বড় হতে পারে ৮) গর্ভাবস্থায় মায়ের মৃত্যু, গর্ভপাত মৃতশিশু প্রসব, বাচ্চার ওজন কম ইত্যাদি।

আনুষঙ্গিক চিকিৎসা ব্যবস্থা : ১) অত্যাধিক তাপমাত্রা হলে তাই বরফ বা ঠান্ডা পানি দ্বারা রোগীকে শরীর ও মাথা মুছতে হবে। ২) অত্যধিক বমন হলে তরল খাবার দেয়াই ভালো। জ্বর ছাড়ার পর স্বাভাবিক খাবার খাবে। ৩) জ্বরের সময় পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে। ৪) ঠান্ডা না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৫) সবসময় মশারী টাঙ্গিয়ে ঘুমাতে হবে।

হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : ম্যালেরিয়া জ্বর নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ ব্যবহৃত হয়। যথা- ১. জেলসিমিয়াম, ২. এন্টিমক্রুড, ৩. ইউপেটোরিয়াম পার্ফিউরা, ৪. আর্সেনিক এলবাম, ৫. ইগ্নেসিয়া, ৬. এন্টিম টার্ট, ৭. ইপিকাক, ৮. সিনা, ৯. ব্যাপটিসিয়া, ১০. সিয়েনোথাস, ১১. নেট্রাম সালফ, ১২. ল্যাকেসিস, ১৩. নেট্রাম মিউর, ১৪. নাক্সভমিকা, ১৫. এপিস মেল, ১৬. সিড্রন, ১৭. ম্যালেরিয়া অফিসিন্যালিস, ১৮. এসিড কার্বলিক, ১৯. লাইকোপোডিয়াম, ২০. ফেরাম মেট, ২১. চিনিনম আর্স, ২২. মার্ক-বিন আয়োড, ২৩. ক্যালকেরিয়া আর্স, ২৪. চায়না উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x