মোহছেনা তোমার জন্য

আনোয়ারা আলম

মঙ্গলবার , ২৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

আহা কি কষ্ট … কি কষ্ট। সন্তানের জন্য হাহাকার, বিলাপধ্বনি আর অশ্রু মিলে একাকার। বুকের মানিক, প্রাণের সন্তান। যাকে ঘিরে সব কল্পনা-আশা-সব নিমিষেই ধুলিস্যাৎ। একদিকে পৃথিবী অন্যদিকে মা। সন্তানের বিচ্ছেদ বেদনার চাইতে বড় কোনো শোক আর কিছুতেই হতে পারে না। মেয়ে আমার। আমি জানি এবং বলি- যে হারায় তারই সব বেদনার বোঝা বহন করতে হয়। কেউ এর অংশীদার হতে পারে না। আমরা তোমার শোকে বিহ্বল, ভারাক্রান্ত, এবং সান্ত্বনা দিচ্ছি। কিন্তু ঐ নিঃসীম শূন্যতার অন্ধকারে আলো দেখাতে পারছি কী? ফুটফুটে চাঁদের মতো শিশু- চিরতরে হারানোর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত যাকে আগলে রেখেছো সে-তো তোমাকে এবং শামীমকে জড়িয়ে আছে। প্রিয় মায়াবী পরশে তোমরা তো স্বর্গীয় আনন্দে বিভোর ছিলে। আকস্মিক বজ্রপাতে সব ছারখার। এই আঘাত মেনে নেয়া তো কঠিন। মেয়ে আমার, জীবনের আয়োজনে স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ত আমি আমরা। কিন্তু সব কিছুর মাঝেও ক্ষণে ক্ষণে অনুভবে তুমি। বুকের গহীনে এক অব্যক্ত যন্ত্রণার হাহাকার। মনের মাঝে তোমার মিষ্টি হাসি হাসি মুখ। মেয়ে তুমি লিখেছিলে ‘ম্যাডামকে দেখলে সুখী সুখী ভাব জেগে ওঠে।’ তোমরাই ছিলে আমার সব প্রেরণার উৎস। কলেজ নামক বাগানে অতীতের সেই রঙিন দিনগুলোতে প্রজাপতির মতো তোমরা। তোমাদের উচ্ছলতা, চাঞ্চল্য। স্বপ্নমাখা চোখে কত আশা। জীবন নামক ভ্রমণে তুমি একজন সফল মানুষ। তোমার মেধাদীপ্ত লেখনীতে আমার ভেতরে মুগ্ধতার সাথে গর্ব। আমারই ছাত্রী। যাদের অর্জনে শিক্ষক হিসেবে পরম প্রাপ্তি যোগ হয়। ‘শাটল ট্রন’ সিমেনার রচয়িতা হিসাবে আমার নীরব উচ্ছ্বাস। কে জানতো নিয়তি হাসছে নিষ্ঠুরভাবে। কে জানতো আমার প্রিয় ছাত্রীর জীবনে নেমে আসবে এমন এক বিপর্যয়। সন্তানের লাশ বাবার কাঁধে এবং মায়ের হাহাকার। আমিই তো সাক্ষী। মাত্র ষোল বছরের ঝকঝকে ছোট ভাইটা যখন রাঙামাটির লেকে হারিয়ে গেল। মমতাময়ী মা’কে আর কখনো উচ্ছলভাবে হাসতে দেখিনি। দৃষ্টিতে নীরব বিষণ্নতায় কেবলই মনের মাঝে অদৃশ্য ক্ষরণ। ফেসবুকে তোমার লেখনীর আর্তস্বরে সবার মাঝে কষ্টের ঝড়। বাতাস যেন ভারী। তবুও বলি, মেয়ে আমার- যদি আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখি তবে বলতে হয় গভীর কষ্টেও সবার আয়ু নির্ধারিত। এটি মানতেই হবে। প্রিয়র আয়ুও একবছরের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন মহান প্রভু। কষ্ট নিও না মেয়ে। তোমার আছে অসাধারণ সৃজনশীল ক্ষমতা। জানোতো সৃজনশীল মানুষের অনেকের জীবনে মৃত্যু শোক এসেছে নানাভাবে। শোককে ভেতরে রেখে তোমার কলমকে সচল রেখো। জানি মেয়ে। সন্তানকে নিয়ে গড়ে তোলা স্বপ্নের প্রাসাদ তোমার ভেঙে গেছে। তোমার সাধনার ধন পুরো পৃথিবীর বিনিময়েও ফিরে পাবে না। এ কষ্টের আবর্তন থামানোর সাধ্য কারো নেই। একমাত্র আল্লাহতায়ালা ছাড়া। তবুও শেষ করি রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়ে। পুত্র শমীকে হারিয়ে লিখলেন তিনি- ‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে। …সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনখানে কোন সূত্র যেন ছিন্ন না হয়ে যায়…যা ঘটছে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।’

x