মোখতার আহমদ স্মরণে

মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিবিদ

মোঃ খোরশেদ আলম

সোমবার , ২১ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৪৭ পূর্বাহ্ণ
48

আজ ২১ অক্টোবর ষাট দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোখতার আহমদ এর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজ থেকে ৭৬ বছর আগে ৩১ আগস্ট বাঁশখালী সাধনপুর ইউনিয়নের রাতাখোর্দ্দ মোজাফফরাবাদ অজপাড়া গাঁয়ে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এই বীরের জন্ম। তাঁর পিতার নাম আবদুল আলী সওদাগর, মাতা মাইমুনা খাতুন। ৪ ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। ২১ অক্টোবর ২০০৬ সালে পৃথিবীর সকল মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন এই মহান নেতা। মাসটি ছিল পবিত্র রমজান আর দিনটি ছিল পবিত্র শবে কদরের রজনী। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার তাঁর জানাযার নামাজে অংশগ্রহণ করতে পারিনি, কারণ সেই সময় আমি কদমমোবারক জামে মসজিদে এতেকাফ পালন করছিলাম। আমি শুনেছি তাঁর জানাজায় হাজারও মানুষের ঢল নেমেছিল। আগস্ট হচ্ছে বাঙালি জাতির শোকের মাস। ’৭৫এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করেছিল দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা। ২০০৬ সালে ১৯ আগস্ট আমার একমাত্র ছেলে মিনহাজুল আলম এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। তাই আগস্ট মাস আমার জন্য আরো বেশি শোকের। ঐ বছর ২১ অক্টোবর মোখতার ভাইও মারা যান। তিনি সে সময় কঠিন কিডনি রোগে ভুগছিলেন। আর্থিক অনটনের কারণে সময়মত চিকিৎসাও হয়নি তাঁর। অথচ বহুমাত্রিক রাজনীতিবিদ ও মেধাবী রাজনৈতিক কর্মী সৃষ্টির সৃজনশীল কারিগর মোখতার আহমদের অনেক কর্মী দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসক ছিলেন। রাজনীতিতে তাঁর পদার্পণ ১৯৬২ সালে কুখ্যাত হামিদুুর রহমানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সেইসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত অগ্রণী বাহিনীর গোপন সংগঠন (নিউক্লিয়ার্স) চট্টগ্রামের তিনি সদস্য নির্বাচিত হন। সেই সংগঠনের প্রধান ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। ’৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতে রাজ্জাক ভাই বাকশালের নেতৃত্ব দেন। এম এ আজিজ এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ৬ দফা থেকে ১ দফার আন্দোলনে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন দ্রুত কার্যকর করতেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতনের নীলনকশা হিসেবে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হল তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি। ১৯৬৭/৬৮ সালে মোখতার আহমদ অবিভক্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামের জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। সেই সময় তার সাথে সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন ছিলেন চট্টগ্রামের আরেক রাজনৈতিক প্রবাদপুরুষ এসএম ইউসুফ। ’৬৯ এর গণ আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলার আহবায়ক। তার এই কমিটিতে অন্যান্য যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন আব্দুল্লাহ আল নোমান চৌধুরী, আবু তাহের মাসুদ ও কবীর আহমদ চৌধুরী সহ নেতৃবৃন্দ। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছালে ১৮ মার্চ আন্দরকিল্লা বন্দুকের দোকান ও আইসফ্যাক্টরী রোডের অস্ত্রাগার তার নেতৃত্বে লুট হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে মোখতার আহমদ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই সময় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কেন্দ্রীয় প্রধান ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। মোখতার আহমদ চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পান। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই ঘোষণা শোনার পর তিনি চট্টগ্রামে এসে ছাত্রজনতাকে সাথে নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ১নং সেক্টর কর্তৃক তিনি বাঁশখালী, আনোয়ারা ও কুতুবদিয়া থানার আঞ্চলিক অধিনায়ক নিযুক্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীকে পরাস্ত করেন।
আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক ছিলেন মোখতার ভাই। আমার মরহুম পিতা আবদুল মাবুদ সওদাগর কে তিনি মামা বলে সম্বোধন করতেন। সেই সূত্রে আমি ছিলাম তার মামাত ভাই। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে মোখতার ভাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মোখতার ভাই অনেক বড় মাপের নেতা ছিলেন। কিন্তু কোনোদিন তার মাঝে কোনো অহংকার দেখিনি। ১৯৭৩ সালে মোখতার ভাই চট্টগ্রাম-১৫ (বাঁশখালী) আসনে জাসদ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেন। ঐ সময় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামীলীগের শাহ-ই-জাহান চৌধুরী। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তার উপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল। ১৯৮২ সালে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ১৫ দলীয় জোটের একটি গোপন বৈঠক থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৮৬ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি চট্টগ্রামের আরেক কিংবদন্তি নেতা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ এর তখনকার সভাপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সাথে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দী ছিলেন। ১৯৮৮ সালে আনোয়ারা পশ্চিম পটিয়া আসনে জাসদ থেকে এম পি নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে মোখতার ভাই আখতারুজ্জামান বাবুর হাত ধরে জাসদের কয়েকশ নেতা কর্মী নিয়ে পুনরায় আওয়ামীলীগ এ ফিরে আসেন, বন্দর রেস্ট হাউজে বিরোধী দলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে। ঐসময় তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ এর কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর চার খলিফাখ্যাত নুরে আলম সিদ্দিকী, আ.স.ম রব, শাহজান সিরাজ কেউ পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছাড়া। শাহাজাহান সিরাজ বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আব্দুল কুদ্দুস মাখন কিছুদিন পরে মারা গেলেন। নুরে আলম সিদ্দিকী রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন। আ.স.ম. রব জাসদের সভাপতি থেকে গেলেন একমাত্র মোখতার ভাই দলে ফিরে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন। ২০০১ সালে জামাত-বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন ও জুলুম অত্যাচার। পুলিশের বাধার কারণে কোথাও মিছিল মিটিং করার সুযোগ ছিলনা। মোখতার আহমদ সেই সময় নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। আমার বিরুদ্ধেও ঐ সময় একাধিক মামলার হুলিয়া। আমি গোপনে মোখতার ভাইয়ের ঘাটফরহাদবেগস্থ বাসায় গিয়ে মাঝেমধ্যে দেখা করতাম। ২০০২ সালে জুলাই মাসের মাঝামাঝি তিনি আমাকে তাঁর বাসায় দেখা করতে খবর দিলে পরের দিন সন্ধ্যায় আমি সেখানে যাই। গিয়ে দেখি আগে থেকে সেখানে বখতেয়ার নুর সিদ্দিকী, আব্দুল্লাহ কবির লিটন, আবু সৈয়দ, রণতোষ দাশ, নুরুল আলম, মৌলভী নুর হোসেন সহ আরো অনেকেই উপস্থিত। ১৫ আগস্ট উপলক্ষে বাঁশখালীতে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচী পালন করার লক্ষে একটি শোক কমিটি করার বিষয়ে আলোচনা করছেন সকলে। ১৮ জুলাই বিকালে আমার চাঁদপুরস্থ বাড়ীতে উপজেলা আওয়ামীলীগসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগরে সভাপতি সম্পাদক, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে বর্ধিত সভা হলো সেই সভায় মোখতার আহমদকে আহ্বায়ক ও আমাকে সদস্য সচিব করে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট শোক কমিটি গঠিত হয়। ঐ সময় উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী (বর্তমান এম.পি) গুরুত্বর অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাঁকে চট্টগ্রাম হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হলে দীর্ঘদিন সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন তিনি। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলার হুলিয়া ছিল। মোখতার ভাই চট্টগ্রাম শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা পরিষদ, বৈশাখী মেলা, একুশে মেলার উপদেষ্টা এবং স্বাধীনতা মেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০৭ সালে ২রা আগস্ট চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সাবেক এম.এন.এ ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম আবু ছালেহ্‌ এর সভাপতিত্বে মোখতার ভাইয়ের শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম.এ. মান্নান, বিশেষ অতিথি আতাউর রহমান খান কায়সার, বখতেয়ার নূর সিদ্দিকীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। এরপর মোখতার ভাইয়ের স্মরণে দীর্ঘ ১০ বছর কোন সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে সেক্টর কমান্ডার ফোরাম চট্টগ্রাম উত্তরের সভাপতি মালেশিয়া আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. মাহমুদ হাসানকে সভাপতি ও আমাকে সাধারণ সম্পাদক ও মোখতার আহমদের বড় ভাইয়ের ছেলে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক নজরুল ইসলাম মোস্তাফিজকে সমন্বয়কারী করে ২১ সদস্যের মোখতার আহমদ নাগরিক স্মরণ সভা কমিটি গঠিত হয়। ঐ বছর ২৯ অক্টোবর বিকাল বেলা দোস্ত বিল্ডিং চত্বরে মোখতার ভাইয়ের ১০ম মৃত্যু বার্ষিকী পালিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী এম.পি, প্রধান বক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এম. রেজাউল করিম চৌধুরী। আমার জানামতে এটাই ছিল তাঁর মৃত্যুর ১০ বছর পরে প্রথম স্মরণ সভা। সকল লোভ-লালসার উর্ধ্বে ছিলেন তিনি। রাজনীতি যে মাটি ও মানুষের জন্য এবং দেশের জন্য মোখতার আহমদ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। মোখতার ভাইয়ের মত সৎ ও যোগ্য নেতার আজ বড়ই অভাব। এরশাদ সরকারের আমলে এম.পি থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম শহরে কোথাও তাঁর একখন্ড জমি নেই। পৈত্রিক ভিটেমাটি সবকিছু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ইচ্ছে করলে ঐসময় অবৈধভাবে প্রচুর অর্থ সম্পদ অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু অবৈধ অর্জন, অর্থের মোহ, লোভ লালসা কোনটাই তাকে নীতি, আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। আসুন আমরা সকলে এই ক্ষণজন্মা বীর পুরুষের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করি আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করেন।
লেখক: শ্রম সম্পাদক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ।

x