মেলা : রাজনীতির রাজনীতি

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ

 

 

মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা চট্টগ্রামের বহু রুটিন সংস্কৃতির মত একটা নিয়মিত সংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছে। স্লোগান বক্তব্যবাণীতে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী মূল্যবোধ, অর্জন সুরক্ষা ও সমুন্নত রাখার দৃপ্ত অঙ্গীকার ঘোষিত হলেও বাস্তব সুফল কতটুকু অর্জিত হয়েছে সেটা হিসাব করার দায় এখনো কেউ নেননি। অবশ্য বাণিজ্যিকায়নের কাজটা বেশ ভালই হয়েছে! মূল্যবোধের চারাগাছটা কতটুকু বড় বা ডালপালা বেড়েছে, ফল দিয়েছে, সে হিসাব আগামীতে কেউ নেবেন, এমন আশা বা ভরসা একেবারেই ক্ষীণ। শুরুটা সর্বজনীন হলেও পরে চট্টগ্রামের প্রবল জনপ্রিয় ও গণবান্ধব নেতা মরহুম এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বিজয়মেলার ব্যাটন নিজের হাতে তুলে নেন। ৯১ সাল থেকে ২০১৭ টানা তাঁর তত্ত্ব্বাবধানে পরিচালিত হয় বিজয়মেলা। তাঁর মহাপ্রয়াণের পর গত বছর সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন মেলার দায়িত্ব নেন। এবছর যৌথ উদ্যোগে অর্থাৎ মেয়র নাছিরের সাথে এবার প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর পত্নী নগর মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন এবং তাঁর পুত্র সালেহীনও যুক্ত হয়েছেন। কদিন আগে দলের বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৬ জেলার প্রতিনিধি সভায় হাসিনা মহিউদ্দিনকে মঞ্চে তোলানামা নিয়ে মেয়র নাছির সমর্থক ও মহিউদ্দিন চৌধুরী তথা হাসিনা মহিউদ্দিন সমর্থকদের তুমুল চাপান উতোর চলে। যা সবগুলো মিডিয়া লুফে নেয়। বিরোধের তাপ শীতল হওয়ার আগেই তারা দুজন আবার একই মঞ্চে! যারা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে মেয়র নাছিরকে হাসিনা মহিউদ্দিনের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন, তারা বিষয়টা কীভাবে নিচ্ছেন জানি না! আসলে এটাকেই বলে রাজনীতি! প্রতিপক্ষের সাথে স্বার্থের মিল এক মোহনায় মিলে গেলে রাজনীতিতে সব সম্ভব! এটাকে ইংরেজিতে কয়, “পলিটিক্স ফর পলিটিক্স“! তো, বিজয়মেলা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ লালন ও চর্চায় সফল বা ব্যর্থ যাই হোক, চট্টগ্রামে নানা নাম, বর্ণ ও গ্রুপ মিলে গড়ে তোলা অগুনতি সংগঠনের মত প্রচার ও বাণিজ্যে অন্যতম সফল।

চট্টগ্রামের দুর্ভাগ্য, এখানে সবকিছুতেই আগাম দৌড় থাকেইথাকে কাজের চেবিশাল প্রচারণার ঢোলও! আদতে প্রাপ্তি ভোঁ ভোঁ! বিশাল বিশাল প্রকল্প, মহাপ্রকল্প হচ্ছে, কিন্তু পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জলাবদ্ধতা, জনদুর্ভোগ ও প্লাবন। এখন জুটেছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। নগরীর আকবরশাহ থানার বিশ্বকলোনী, কোতোয়ালিসহ নানা উপজেলায়ও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পরিচালিত ডেঙ্গু নিয়ে প্রথম সমীক্ষা রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করবে। তাছাড়া সিডিএর ব্যবস্থাপনায় নগরীর জলাবদ্ধতা অসুখের স্থায়ী চিকিৎসায় পৌণে ৬ হাজার কোটি টাকার মহাপ্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কেও হালনাগাদ কোন তথ্য নেই। অথচ কমাস পরই বর্ষা নামবে। তিন ডজনের বেশি হারিয়ে যাওয় খালসহ, নদী নালা অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পুনঃখনন, কর্ণফুলী শতভাগ নাব্য ও দখলমুক্ত করা না হলে চট্টগ্রামের সকল উন্নয়ন সূচি জলাবদ্ধতা নামের বিশাল অজগরের পেটে তলিয়ে যাবে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ সম্মেলন নিয়ে মহাব্যস্ত! মাসের শেষেই কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর নেত্রী দলের সব পর্যায়ে স্বচ্ছ, নিবেদিত এবং ত্যাগীদের পদায়নের নির্দেশ দিলেও বাস্তবে দলটিতে ত্যাগীদের দেহ বর্জ্যের মত পরিত্যাগই করা হচ্ছেনিষ্ঠুরভাবে! ওবায়দুল কাদের সাহেব বিবেকের মত ত্যাগের গানই শুনিয়ে যাচ্ছেন কেবলবাস্তবতা পুরোই উল্টো!

এদিকে বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কেবিনে চিকিৎসাধীন। বিএনপির অভিযোগ, সেখানে বেগম জিয়ার কোন সুচিকিৎসা হচ্ছেনা। তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা খুবই নাজুক। শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যাচ্ছে, সাহায্য ছাড়া উঠে দাঁড়াতে পারেন না, নিজ হাতে খেতেও পারেন না। তাই দলটি বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য আপিল বিভাগে তাঁর জামিন চেয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলের দাবি উল্টো। তারা বলছেন, তিনি শারীরিকভাবে ভাল আছেনযথাযথ চিকিৎসাও চলছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক টিমের তত্বাবধানে। বিএনপির জামিন আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত তাঁর চিকিৎসা ও সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার মেডিক্যাল রিপোর্ট তলব করেন বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের কাছে। ৫ ডিসেম্বর মামলার জামিন শুনানির দিন রিপোর্টটি আদালতে পাঠানোর নির্দেশ ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে তা পাঠায়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সময়ের আবেদনে আদালত আগামী ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার শুনানির দিন ধার্য করেন। এর পরপরই সর্বোচ্চ আদালতের ঘটে যায় তুলকালাম কাণ্ড। হল্লা, ঠেলাঠেলিহুড়োহুড়ি! এতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদুল ইসলামসহ আপিল বিভাগের সব বিচারক প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন । প্রধান বিচারপতি এক পর্যায়ে বলেছেন, বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে। আপিল বিভাগে এমন অবস্থা আমরা আগে কখনো দেখিনি।

এর আগে মামলার আপিল শুনানির আদেশে ১১ ডিসেম্বর বেগম জিয়ার মেডিকেল প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেন আদালত। কিন্তু বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা তারিখ এগিয়ে আনতে একযোগে চাপ তৈরি করেন। কিন্তু আদালত সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ দেশবাসীর জানা। আসলে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে এধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। সর্বোচ্চ আদালত আদেশ দেয়ার পর সেটা ফিরিয়ে নেয়া স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে বিরল। তবুও যা ঘটেছে, তাতে বিচার লাভের চেরাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা প্রাধান্য পেতেও পারে। রাজনীতির কোণটাসা অবস্থা ঝেড়ে ফেলতে বিএনপি তথা বিরোধী দলের একটা বড় ঝাঁকির দরকার ছিল। পিঁয়াজ, চাল ও নিত্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ জনগুরুত্বপূর্ন নানা ইস্যু থাকা সত্বেও বিএনপি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট বেগম জিয়ার মুক্তি বা জামিন প্রাপ্তির বিষয়টাকে সামনে নিয়ে এগুচ্ছে।

বেগম জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে সরকারের প্রতি বিরূপ গন আবেগে বড় একটা ঢেউ তোলা গেলে অন্য সব ইস্যু আপনাই সামনে চলে আসবেএমন কৌশল নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট। তাদের পূর্ণ বিশ্বাস, একবার গণ অসন্তোষের আবেগের জোয়ারে ঢেউ উঠলে সরকারের পক্ষে তা সামলানো কোনভাবে সম্ভব না। কারণ, সরকারের নৈতিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। আর দুর্বল স্থানেই বড় আঘাত দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি ও সমমনা ঐক্যফ্রন্ট। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা হুঙ্কার ছাড়লেও আপদ মোকাবেলার সামর্থ্য প্রমাণিত হবে রাজনীতির ময়দানে।

x