মেরিকালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বাড়ানোর চিন্তা

উপকূলীয় ও বঙ্গোপসাগরের জলজসম্পদ উন্নয়নে ২ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্প

আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার

মঙ্গলবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৯:২৬ অপরাহ্ণ
127
মেরিকালচার প্রজনন-প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে মৎস্য মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে মেরিকালচার প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানে আছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। এসব দেশে মেরিকালচার লাভজনক হওয়ায় আমাদের দেশেও এই প্রজনন-প্রযুক্তি অর্জনের জন্য গবেষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু।
উপকূলীয় ও বঙ্গোপসাগরের জলজসম্পদ উন্নয়নে গৃহীত প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগাপ্রকল্পের অধীনে মেরিকালচার নিয়ে শীঘ্রই গবেষণা শুরু হবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
আজ মঙ্গলবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও)-এর যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ‘বাংলাদেশ ব্লু ইকোনমি ডায়ালগ অন ফিশারিজ অ্যান্ড লাইভস্টক’ শীর্ষক একটি কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য প্রকাশ করেন।
মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আমাদের সামুদ্রিক এলাকায় বা বঙ্গোপসাগরে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ। এগুলোর মধ্যে কেবল ৬৫ প্রজাতির মাছ আহরণযোগ্য। তাছাড়া আছে ৩৬ প্রজাতির সামুদ্রিক চিংড়ি, ৩ প্রজাতির লবস্টার, ২৫ প্রজাতির কাছিম ও ১১ প্রজাতির কাঁকড়া। এরমধ্যে ইলিশ, রূপচান্দা, টেকচান্দা, ফলি চান্দা, ঘোড়া চান্দা, চান মাছ, কামিলা, চামিলা, নাইল্লা, অলুয়া, ফাইস্যা, তেইল্যা ফাইস্যা, চইক্কা ফাইস্যা, পাতা মাছ, কোরাল, নাককোরাল, দাড়কোরাল, লাক্ষা, সুরমা, রকেট মাইট্টা, বোম মাইট্টা, জাতি মাইট্টা, ঠুইট্টা, ঘুইজ্জা, মাথা ঘুইজ্জা, কেলা ঘুইজ্জা, কাওয়ালি ঘুইজ্জা, নাথু ঘুইজ্জা, পিয়া ঘুইজ্জা, ছাতা ঘুইজ্জা, মোচ ঘুইজ্জা, আগুরা ঘুইজ্জা, পোপা, কালা পোয়া, সোনালী পোয়া, বাঁশ পোয়া, তিল্পিপ পোয়া, রম্বু পোয়া, লইজ্জা পোয়া, ঠেঁড়ি পোয়া, রাঙ্গাচঁই (রাঙ্গাচোখা) সহ কয়েক প্রজাতির মাছ বেশি পাওয়া যায়। তবে বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত মাছের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই ইলিশ। বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলাশয় মৎস্য সম্পদে অনেক সমৃদ্ধ ও এর জীব-বৈচিত্র্য অত্যন্ত বিস্তৃত বলে জানান সামুদ্রিক মৎস্য বিজ্ঞানীরা। তবে এর উৎপাদন ক্ষমতা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি বলে অভিমত তাদের।
মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, ২০১৭-১৮ সালে দেশের উৎপাদিত মোট ৪৩ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন মাছের মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টনই এসেছে সমুদ্র থেকে, যা মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ। বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের ৫ লক্ষাধিক জেলে প্রায় ৭০ হাজার যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানের মাধ্যমে মৎস্য আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সেসাথে মৎস্য উৎপাদনেও ব্যাপক ভূমিকা রাখছেন। আর এই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয় ২৪০ মিলিয়ন ডলারের সমমানের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট’ শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প-গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পর্কে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় মূলপ্রবন্ধ পাঠ করেন এফওএ-এর প্রতিনিধি জ্যাকলিন আল্ডার।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রইছউল আলম মন্ডলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তৃতা করেন, এফএও-এর বাংলাদেশের প্রতিনিধি রবার্ট ডলাস সিম্পসন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের সচিব রিয়াল এডমিরাল (অব.) খুরশেদ আলম, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত সিডসেল ব্লিকেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (ব্লু-ইকোনমি) তৌফিকুল আরিফ, মৎস্য অধিদফতরের ডিজি আবু সাইদ মো রাশেদুল হক।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রচেষ্টায় ভারত ও মিয়ানমারের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় যুক্ত হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উত্তরণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক সম্পদের গুরুত্ব ও অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, উপকূলীয় ও বঙ্গোপসাগরের জলজসম্পদ ও সুযোগ কাজে লাগাতে মন্ত্রণালয় নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আরভি মীন সন্ধানী নামক সমুদ্র গবেষণা ও জরিপ-জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রের চিংড়িসহ তলদেশীয় ও উপরিস্থ মাছের জরিপের কাজও চলছে। ব্লু-ইকোনমির বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই পাইলট কান্ট্রি হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
খোলা সমুদ্রে ট্যাংক বসিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সামুদ্রিক মৎস্য চাষ হলো মেরিকালচার। এ পদ্ধতিতে চিংড়ি, ওয়েস্টার, সেলফিশ, ফিনফিশ  ও সী-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন করা হয় মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য। ইতোমধ্যে কক্সবাজারের নাজিরারটেক, ইনানী ও সেন্টমার্টিনে বাংলাদেশ সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র (বিএফআরই)-এর উদ্যোগে সী-উইডের পরীক্ষামূলক চাষাবাদ করা হয়েছে।
এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগেও আলাদাভাবে বিভিন্ন পুকুর ও ঘেরে সামুদ্রিক শৈবালের পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে। তবে সেন্টমার্টিনেই সী-উইডের সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে বলে জানান কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী।
তিনি জানান, সী-উইড চাষের গবেষণার ফলাফলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তুলনায় মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের সাফল্য অনেক বেশি। মেরিকালচার পদ্ধতির সম্ভাবনার কথাও বারবার তুলে ধরছিলেন বিজ্ঞানীরা।
x