মেঘ দেখতে কংলাক পাড়ায়

সমির মল্লিক : খাগড়াছড়ি

সোমবার , ৮ জুলাই, ২০১৯ at ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
242

ভরা বর্ষায় অনন্য পাহাড়। পাহাড় প্রেমীদের কাছে বর্ষা যেন পাহাড় দর্শনের শ্রেষ্ঠ সময়। ঘন সবুজ আর সাদা মেঘ উঁচু পাহাড়ের নিয়মিত দৃশ্য। পাহাড়ের চূড়োয় কখনো হালকা কুয়াশায় আচ্ছন্ন, আবার কখনো শেষ বিকেল পেরিয়ে পশ্চিমের আকাশ বিদায়ী সোনার সিংহ-সূর্যদেবতা তখন পাহাড়ের কোলে হেলে পড়ছে মাত্র। বৃষ্টির দিনে সূর্যের সোনালী রঙে মোড়ানো সবুজ পাহাড় এক অনবদ্য দৃশ্যপট। দিন শেষ আর শুরুতে এই রঙ যেন পুরো পাহাড়কে সোনায় মুড়িয়ে রাখে। অদূর সীমান্তে ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের নীল পাহাড়। অত্যন্ত নির্জনতা পাহাড় চূড়োর পাড়া কংলাক।
পাহাড়ি বাতাস মেখে মাচাংয়ে বসে যেন তারা গননার প্রতিযোগিতা চলছে। নক্ষত্র আর মিল্কওয়েতে ভরা কংলাক, সাজেকের আকাশ। থোকায় থোকায় আকাশে জ্বলছে তারার দল। মৌসুমী হাওয়ায় থেমে থেমে বয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের চূড়োয়। আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের চুড়োয় দাঁড়িয়ে চেনা রাতকেও অচেনা মনে হয় বাতাসের বুকে মাচাংয়ে পেতেছি তাবু, রাতটা তাবুতে কাটাব। পাহাড়ের রহস্যের ডানা মেলতে হিম হওয়া রাতে, হাজার ফুটের পাহাড় পেরিয়ে রাতের দিগন্তে পূর্ণিমায় শীতল আলো। জ্যোৎস্নার আলোয় ঢেকে আছে পুরো প্রকৃতি অরণ্য। তাবুতে শুয়ে পাহাড়ের চূড়ো থেকে নীল মেঘের সমুদ্র পেরিয়ে পাহাড় দর্শনের জন্য সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ চুড়ো কংলাক যেন অনন্য। চূড়ো থেকে দাঁড়িয়ে পাখির চোখে ভোরের মেঘ দেখে বিস্মিত হওয়ার মতো। সকালের মেঘমুখর পাহাড়ি জনপথ আর শেষ বিকেলে পশ্চিমের মেঘের সোনার সিংহ, সূর্যাস্তের বিরল রূপ এখানে ধরা দেয় অনায়সে। পূর্ণিমায় রাতের মায়াবী সৌর্ন্দয্যের ষোলয়ানাই কংলাকের চূড়োয় ধরা দেয়।
সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে কংলাকের হাইল্যান্ডের নীচের মূল উপত্যকা। উপত্যকায় রেখার মত ছড়িয়ে আছে সাজেক, পাইলিং পাড়াসহ বেশ কিছু পাহাড়ি গ্রাম। আরো দূরে সীমান্তের লাগায়ো অচেনা পাহাড়ি পাড়া। অনাদিকাল থেকে সেখানে বসবাস করছ ভূমিপুত্ররা। পূর্ণিমা রাতে পাড়াগুলোতে সৌরবিদ্যুতের আলো জ্বলছে, গভীর অরণ্যে যেন ঢেকে রেখেছে পুরো উপত্যকা। রাতের আকাশে মেঘ উড়ে যাচ্ছে থেমে থেমে, যেন মেঘ গ্রাস করে নিচ্ছে চন্দ্রের মায়াবী আলো। নিঃশব্দের মত জেগে আছে পুরো অরণ্য প্রকৃতি। পাহাড়ের নির্জনতায় কেবলই জেগে থাকা পাখিরা, রাতে অদূর থেকে ভেসে আসে অচেনা পাখির ডাক, রাত জাগা পূর্ণিমা রাতে পাখির ছন্দ যেন অরণ্যের চেনা রূপ। কংলাকের চূড়োয় বসে এমন রাত পাওয়ায় সত্যিই বিমুগ্ধ করে। পাড়ায় বসবাসরত লুসাই আর ত্রিপুরা বসতিগুলো তখন ঘুমের রাজ্যে, গভীর রাতে যেন পূর্ণিমার আলো গাঢ় পাহাড়ের গ্রাম-অরণ্য-প্রকৃতি। কংলাক চূড়ো থেকে পাখির মত চোখে পড়ে ধবধবে পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত পুরো উপত্যকা। রাতের আহার পর্ব শেষ করে তাবু বসে দেখছি ধীরে ধীরে মেঘ জমছে উপত্যকার ভাজে ভাজে, মেঘের সাদা রঙে ঢেকে যাচ্ছে সবুজ বনানী। পূর্ণিমা রাতে মেঘ যেন বৃত্তের মত চারপাশ থেকে ঘিরে রাখছে পাহাড়ের গ্রাম কংলাককে। ১৮০০ ফুটের এ পাড়া যেন সাজেক ভ্যালী’র মুকুট। পুরো সাজেক উপত্যকার সর্বোচ্চ চূড়োর কংলাক পাড়া রাঙামাটির ছাদ, কংলাক থেকে মেঘ মুক্ত আকাশে সুদূরের কাপ্তাই লেকের জলধারা। উপত্যকা পেরিয়ে ক্রমশ পাহাড়ের ভাঁজ যেন আকাশচুম্বী হয়েছে ওখানে, আর এই দীর্ঘ ভ্যালীজুড়ে অরণ্যের সীমানা। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামতেই নৈসর্গিক নিরবতা পাহাড়ের চারপাশে, কেবল মৌসুমী হাওয়ার মত তীব্র বাতাস ছুটে আসছে নীচের পাহাড়গুলো ছুঁয়ে। কংলাক পাড়া আশেপাশের পাড়াগুলো থেকে সবচেয়ে উপরে বিধায় বাতাসের ঝাপটা যেন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। তবে এমন বর্ষায় দিবারাত্রি মেঘ দেখতে কংলাক তুলনীয়। রাঙামাটি সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে মাত্র ২০ মিনিটের হাঁটা পথে পৌঁছানো যাবে এই মেঘের দেশে।

x