মৃত্যু ফাঁদে পরিণত গোটা রেলপথ

মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন-কোচ, জরাজীর্ণ রেল লাইন আছে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:০৩ পূর্বাহ্ণ
294

রেল নামক ‘নিরাপদ বাহনে’ চড়েও ঝরছে প্রাণ। পরিসংখ্যান বলছে, রেলে যত দুর্ঘটনা ঘটছে তার প্রথম কারণ যদি হয় লেভেল ক্রসিং, দ্বিতীয় কারণ হলো ঝুঁকিপূর্ণ লাইন ও সেতু। প্রতিদিন ৩ বার করে পুরো রেল লাইন, সিগন্যাল ও সেতু পরিদর্শনের কথা থাকলেও অনেক সময় বছরে একবারও পরিদর্শনে যাওয়া হয় না। দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, লাইনচ্যুত ও লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ছাড়াও অবহেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে শত শত লোকের মৃত্যুতো আছেই। রেলের দুরবস্থা নিয়ে খোদ সংসদেও আলোচনা হয়েছে একাধিকবার। ব্রিটিশ আমলের রেলসেতু, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন-কোচ, জরাজীর্ণ রেল লাইন ও লোকবলের ঘাটতি নিয়ে কথা হয়েছে। রেলওয়ের একাধিক প্রকৌশলী বলছেন, রেললাইনকে খুব যত্ন করে রাখতে হয়। রেলপথে পর্যাপ্ত পাথর থাকবে এবং কোনো অবস্থাতেই একটি স্লিপারও ক্লিপ কিংবা হুকবিহীন থাকবে না। কিন্তু স্বাধীনতার পর রেলপথ পাথর শূন্য হতে শুরু করে। স্লিপার নড়বড়ে, এর সঙ্গে ক্লিপ-হুক ও ফিশপ্লেট খোলার হার বাড়ছে। এখন যেসব পাথর দেয়া হয়, তা খুবই নিম্নমানের। প্রভাবশালী ঠিকাদারদের হস্তক্ষেপ থাকায় এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথাও বলা যায় না। অপরদিকে ট্রেনের সিডিউল ঠিক রাখতে ‘নিয়ন্ত্রণাদেশ’ অমান্য করে ট্রেন চালানোর কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত ১১ নভেম্বর রাত পৌনে তিনটার দিকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় শেষোক্ত কারণটি এখন পর্যন্ত প্রাধান্য পাচ্ছে তদন্ত কমিটির কাছে। জানা গেছে, দেশের প্রায় ৩ হাজার ৩৩২ কিলোমিটার রেলপথের বিভিন্ন স্থানে প্রায় সময়ই খোলা থাকে ফিশপ্লেট, ক্লিপ,
হুক, নাটবল্টুসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ। এমনকি রেললাইন মজবুত ও স্থিতিশীল রাখতে স্থাপিত স্লিপারগুলোর অবস্থাও নাজুক। আবার এসব স্লিপারকে যথাস্থানে রাখতে যে পরিমাণ পাথর থাকা প্রয়োজন, অধিকাংশ স্থানেই তা নেই। কোনো কোনো স্থানে পাথরশূন্য অবস্থায় আছে স্লিপারগুলো। শুধু তাই নয়, সারা দেশে আছে ৩ হাজার ৬টি রেলসেতু। যার ৯০ শতাংশই তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। জোড়াতালি দিয়ে সচল রাখা হয়েছে সেতুগুলো। এগুলোর ওপর দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে চলছে বিভিন্ন রুটের ট্রেন। সব মিলিয়ে এক রকম ‘মৃত্যু ফাঁদ’-এ পরিণত হয়েছে গোটা রেলপথ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরো রেলপথে প্রতি বছর ২২ লাখ ঘনফুট পাথর প্রয়োজন হলেও দেয়া হচ্ছে ১০-১২ লাখ ঘনফুট পাথর। পুরো রেলপথে পূর্ণ মাত্রায় পাথর দিতে এক বছরে খরচ হয় ৩৩ কোটি টাকা। সেখানে রেলওয়ের লাইনচ্যুত বগি ও ইঞ্জিন উদ্ধার এবং লাইন মেরামতে প্রতি মাসেই খরচ করছে ৮ কোটি টাকারও বেশি, যা বছরে খরচ দাঁড়ায় শত কোটি টাকায়।
রেল দুর্ঘটনা নিয়ে কথা হয় রেলের চালক, গার্ড ও মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে। তারাও দুর্ঘটনার জন্য ব্রিটিশ আমলের ইঞ্জিন, বগি ও ব্রিজকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, রেল লাইনে পাথর না থাকা, সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটি, লাইন ক্ষয়, স্লিপার নষ্ট, লাইন ও স্লিপার সংযোগ স্থলে লোহার হুক না থাকার কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। লাইনে নির্ধারিত দূরত্বের মধ্যে (প্রায় ৪০-৫০ ফুট) পয়েন্ট রয়েছে। এসব পয়েন্টের মধ্যে দু’পাশে ৮টি করে মোট ১৬টি নাটবল্টুসহ ১৬টি হুক, ক্লিপ থাকার কথা। কিন্তু দেখা গেছে অধিকাংশ পয়েন্টের মধ্যে ১৬টির স্থলে ৫-৭টি রয়েছে। তারা আরো বলেন, প্রতিদিন ৩ বার করে লাইন, সিগন্যাল ও ব্রিজ পরিদর্শন করা ছাড়াও ট্রেন ছাড়ার পূর্বে ইঞ্জিন ও প্রতিটি বগির বিশেষ বিশেষ যন্ত্রাংশ ও চাকা চেক করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। এদিকে প্রতি বছরই বিভিন্ন রুটে নামছে নতুন নতুন আন্তঃনগর ট্রেন। কিন্তু সবকিছুই এক রকম নিষ্ফল করে দিচ্ছে জরাজীর্ণ রেললাইন।

x