মুঠোফোনের ব্যবহার ও পুুরুষ বন্ধ্যাত্ব

ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

শনিবার , ২৬ অক্টোবর, ২০১৯ at ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
160

মানুষ বিভিন্ন উপায়ে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনে আক্রান্ত হয়। যেমন- মুঠোফোন, তারবিহীন ফোন, ওয়াই-ফাই, ব্লু-টুথ, রেডিও, রাডার, এন্টেনা, ডাক্তারি সরঞ্জাম ইত্যাদি। বর্তমানে কানের কাছে মুঠোফোনের ব্যবহার একটি অতি সাধারণ ঘটনা। মুঠোফোন দুর্বলভাবে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণ করে যার ফ্রিকোয়েন্সি হলো ৪৫০-২৭০০ মেগাহার্জ। মুঠোফোনে যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহৃত হয় তা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ হিসেবে ওই মুঠোফোন থেকে নিকটস্থ বেইস স্টেশনে সংযোগ করে আর বার্তা বা ম্যাসেজ, ই-মেইল আর ছবি আদান-প্রদান করে। এই ধরনেণর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ আয়নিত বিকিরণ বা আয়নাইজিং রেডিয়েশন যেমন এক্স-রে, গামা-রে ইত্যাদির মতো নয়। এই ওয়েভ রাসায়নিক বন্ধন ভাঙতে পারে না বা কোষস্থিত ডিএনএ’র কোনো ক্ষতি করতে পারে না কিন্তু এরূপ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ নিকটস্থ দেহকোষ শোষণ করে আর দুর্বল তাপীয় প্রতিক্রিয়া বা থার্মাল ইফেক্ট করতে পারে।
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ ও মানবদেহের ক্ষতিকর প্রভাব: নিকটস্থ কোষের তাপীয় প্রভাব হলো রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভের মাধ্যমে মানবদেহে ক্ষতি করার প্রধান উপায়। মুঠোফোন যে ধরনের ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে তা নিকটস্থ চামড়া আর শরীরের সামান্য তাপ বৃদ্ধি ছাড়া তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া করে না। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর ক্ষতিকর প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
মুঠোফোনের ব্যবহার আর পুরুষ বন্ধ্যাত্বের সম্ভাব্য কারণ:
১। তাপীয় প্রভাব: ‘রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভের উৎপাদিত তাপ দেহের ক্ষতি করতে পারে’, এটি একটি গ্রহণযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত ধারণা। তবে কানের কাছে ব্যবহৃত মুঠোফোন স্থানীয় তাপ বৃদ্ধি করতে পারে কিন্তু এন্টেনা ইত্যাদি নিকটে থাকলে তা দেহের তাপমাত্রা ০.১ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
২। বিকিরণ: ‘মুঠোফোনে যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ ব্যবহৃত হয় তা রেডিয়েশন ছড়ায়’, এটি একটি ভুল ধারণা। রেডিয়েশন সাধারণত আয়নিত বিকিরণ বা আয়নাইজিং রেডিয়েশনকে বুঝায় যা এক্স-রে, আলফা-রে, বিটা-রে, গামা-রে, আল্ট্রাভায়োলেট-রে দ্বারা ছড়ায় আর তা কোষের মিউটেশান এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। তাই মুঠোফোনে যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ ব্যবহৃত হয় তা কার্যত কোষের ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে না। টেস্টিস বা অণ্ডকোষ রেডিয়েশনে খুব সংবেদনশীল এবং তা এর কার্যকর পরিবর্তন করতে পারে।
৩। জারণ-বিজারণের চাপ বা অক্সিডেটিভ স্ট্রেস: পুরুষ জনন কোষ জারণ-বিজারণের চাপ বা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসে সংবেনশীল। জনন কোষের বাইরে স্নেহ পদার্থের আবরণ থাকে যা অক্সিডেটিভ স্ট্রেসে নষ্ট হতে পারে। নষ্ট জনন কোষ রিয়েক্টিভ অক্সিজেন স্পেসিস তৈরি করে যা পুরুষ বন্ধ্যাত্যের জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়। তাপীয় আর অতাপীয় উভয় প্রক্রিয়াতে রিয়েক্টিভ অক্সিজেন স্পেসিস তৈরি হতে পারে।
২০১০ সালে বিজ্ঞানী কেসারী ও তার অনুসারীরা ইঁদুরের উপর একটি গবেষণায় দেখান যে মুঠোফোন কাছে থাকলে তা পুরুষ ইঁদুরের স্পার্মের সংখ্যা কমিয়ে দেয়। ২০১১ সালে অন্য একটি গবেষণায় তিনি দেখান যে মুঠোফোন পুরুষ ইঁদুরের এন্টি-অক্সিডেন্ট এনজাইমের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়।
২০১২ সালে বিজ্ঞানী আল ডামেগ দেখান যে মুঠোফোনের ব্যবহার পুরুষ প্রাণীর অণ্ডকোষের বিভিন্ন ক্ষতি করে। যেমন: সেমিনিফেরাস টিবিউলের (অণ্ডকোষের নালিকা যা দিয়ে পুংজনন কোষ চলাচল করে) আকার আর আয়তনের পরিবর্তন, জনন কোষের জীবন চক্রের পরিবর্তন, জনন কোষের সংখ্যা কমে যাওয়া ইত্যাদি।
বিজ্ঞানী কেসারী আর বেহারী ২০১২ সালে তাঁদের গবেষণায় দেখান যে মুঠোফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ পুরুষ ইঁদুরের দেহের টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় আর জনন কোষের আকারের পরিবর্তন ঘটায়।
২০১৬ সালে বিজ্ঞানী জাং ও তার অনুসারীরা দেখান যে মুঠোফোনের ব্যবহার পুরুষের বীর্য্যের পরিমাণ, জনন কোষের ঘনত্ব আর সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আর সংস্পর্শ পুরুষ জনন কোষের ওপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলে যা জনন কোষের আকৃতিগত, সংখ্যাগত আর কার্য্যগত পরিবর্তন আনতে পারে। তাই মুঠোফোন ব্যবহারে আমাদের আরো অনেক সচেতন হওয়া জরুরি।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ

x