মুজিববর্ষ এবং জাতীয় আপদ

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২০ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
68

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে মুজিববর্ষ উদযাপনের ক্ষণ গনণা এখন শেষ লগ্নে। ১৭ মার্চ থেকে জাতীয় ও সরকারি আয়োজনে শুরু হবে মুজিববর্ষ উদযাপনের সূচি। একই সাথে মহান স্বাধীনতার ৪৯ তম বার্ষিকীও দোরগোড়ায়। মহান মাতৃভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি শেষ।
দু’টো মহান লগ্ন সামনে রেখে সরকার, স্বশাসিত ও বেসরকারি সংস্থা, সরকারি দল, সরকারি ছায়ায় থাকা দল, সহযোগী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পেশাজীবি সংগঠনগুলোও নানা সূচি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। কেউ কেউ আগেভাগেই স্ব-উদ্যোগে মুজিববর্ষের কর্মসূচি পালন শুরু করেছে। এককথায় দেশব্যাপী এখন মুজিববর্ষের আবহ।
মুজিববর্ষ নিঃসন্দেহে জাতির অহঙ্কার ও গর্বের একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, সংগ্রাম, দেশ ও মানুষের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ থেকে দীক্ষা নেয়ার উপলক্ষতো অবশ্যই। কিন্তু তেমনটা কী হচ্ছে বা হবে? প্রশ্নটা বার বার খোঁচা দিচ্ছে বিবেকবান ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত অনুরাগীদের মনে। সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহের অভিঘাত ও দেশের চলমান রাজনীতির উল্টোযাত্রা এর জন্য দায়ী। হঠাৎ করে কিছু রাস্তার মানুষ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে শত শত কোটি টাকা ও সম্পদের মালিক হয়ে যাচ্ছে। কিছু নেতা ও প্রভাবশালী জন প্রতিনিধি নিজেদের প্রভাব ও দলীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করে লোভ-লালসার আগুনে সরকার ও দলের সব অর্জন ছাইভস্ম করে দিচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরা বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার মাদুলি গলায় ঝুলিয়ে সব অপকর্ম জায়েয করছে। দলে অনুপ্রবেশকারী কিছু অপশক্তি লাই পেয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে অপমানসহ এমন সব কুকর্মে জড়াচ্ছে, যার দায় চাপছে প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর রক্তঘামে তিল তিল করে গড়ে তোলা দলের উপর। এরমাঝে ঢাকার ক্যাসিনো মাফিয়া এনু-রূপনের নগদ টাকার একের পর এক বিশাল বিশাল খনি আবিস্কার, শত শত বাড়ি, ফ্ল্যাটের মালিক বনে যাওয়ার কাহিনি রূপকথার গল্পকে পর্যন্ত টিস্যু পেপার বানিয়ে ফেলেছে। আছে মহিলা যুবলীগ নেত্রী পরিচয়ের মক্ষিরানী পাপিয়া ও স্বামী সুমনজুটির আরব্য উপন্যাসকে টেক্কা দেয়া অনৈতিক সাম্রাজ্যের গা হিম করা বাস্তব উপাখ্যান। পাপিয়ার আঁচলে কতো ভিআইপি রাজনীতিক, আমলা, কর্পোরেট চরিত্র তথা কলির রাজা-মহরাজা বাঁধা আছে, তা এখনো পর্দার আড়ালে। প্রতিটি গা হিম করা কাহিনী এখন মিডিয়ার শীর্ষ খবর। সারা দেশে কতো হাজার বা লাখ এনু-রূপন, পাপিয়া-সুমনের মত চরিত্র বঙ্গবন্ধুর তজবি মালা জপ করে বহাল তবিয়তে লুঠ, ভোগ আর অনৈতিক জমিদারি চালাচ্ছে, তার হিসাব নেবে কে? এসব রক্তবীজ তথা কচুরিপানার ঝাড় নির্মূল না করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী তথা মুজিববর্ষ উদযাপন কতটুকু সফল হবে, তা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে জাতির সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে! কারণ, মুজিববর্ষ নিয়ে এরাই বেশি সোচ্চার। মুজিববর্ষ যদি এদের অন্যায় বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধুর অবদান, কর্ম, ত্যাগ, সপরিবারে আত্মবিসর্জন সবতো নর্দমায় ডুবে যাবে।
এমনিতেই চীনের করোনাভাইরাস আতঙ্ক পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রচন্ড চাপে ফেলে দিয়েছে। যার অভিঘাত আমাদের স্বস্তিও কেড়ে নিয়েছে। করোনাভাইরাস আতঙ্ক প্রায় পুরো পৃথিবীকেই গ্রাস করেছে। এটার উৎস যেমন এখনো অজানা, তেমনি রোগটির প্রতিষেধকও বের করা যায়নি। প্রতিদিন চীনসহ আক্রান্ত দেশগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। একই সাথে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যাও। দ্রুততম সময়ে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে মহামন্দার কবলে পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি। যার বড় ধাক্কা সামলাতে হবে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। বাংলাদেশের সীমিত অর্থনৈতিক অবকাঠামো এই ক্ষত প্রতিরোধ বা সামলানোর শক্তি রাখেনা। করোনাভাইরাসের সাথে যুক্ত হয়েছে ভারতে মোদি সরকারের জনতুষ্ঠিবাদী হিন্দুত্ববাদ। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাশ করে মোদি-অমিত শাহ জুটি পুরো ভারতকে রাজনৈতিক ও সামপ্রদায়িক অস্থিরতায় আগুনে ছুঁড়ে ফেলেছে। রাজধানী দিল্লিতে দাঙ্গায় মৃতের সংখ্যা আশঙ্কার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ভারতীয় উগ্র সামপ্রদায়িক নেতৃত্ব দেশটির বহুত্ববাদকে ছুঁড়ে ফেলে দেশটির ৩০ কোটি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। এই ভয়ঙ্কর ক্ষত বাংলাদেশকেও অস্বস্তিকর এক হুমকির মুখে রেখেছে।
এসব নিষ্ঠুর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে এগুতে হবে অতি সাবধানে। সরকার তথা আওয়ামী লীগের সবচে’ বড় ভ্যানগার্ড হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর প্রতি নিবেদিত কর্মীবাহিনী। দলের সাধারণ কর্মীরা এখনো বঙ্গবন্ধু ও নেত্রীর প্রতি নিবেদিত। কিন্তু টানা ১১ বছর ক্ষমতায় থাকায় দলের পরিচর্যা ঠিকমত হয়নি। প্রচুর অনুপ্রবেশকারী পোষাক পাল্টে দল ও সরকারে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এরা কিন্তু বঙ্গবন্ধু এবং নেত্রী বন্দনায় একেবারে সামনের কাতারে। আবার দীর্ঘ ক্ষমতার আমেজে দলের ভেতরে তৈরি হয়েছে অগনিত ছোটবড় সর্বভূক রাক্ষস খোক্কস। এরা অনুপ্রবেশকারীদের সাথে নিয়ে নিজ নিজ গ্রুপ ভারি করে তৃণমূল থেকে শীর্ষ সবখানে বিষাক্ত শিকড়-বাকড় ছড়িয়েছে। এমনকী নেত্রীর চারপাশে এদের আনাগোনাও দিনে দিনে বাড়ছে।
স্বাভাবিক কারণে দলের নিবেদিত ও ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন হয়নি, হচ্ছেনা। একদম না! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, দলীয় ক্ষমতা আওয়ামী লীগের পুরানো বিশ্বস্ত লাখ লাখ কর্মীর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। উপর সারির নেতাদের এদের খবর নেয়ার গরজও নেই। স্বাভাবিকভাবেই দলের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে। কারণ, নব্য ও অনুপ্রবেশকারি সুবিধাভোগীরাই নেতাদের ঘিরে রাখে। হালুয়ারুটি লুটেপুটে খায়। নিবেদিত কর্মীরা বুকভরা অভিমান পুষে আরো দূরে সরে যায়। নেতাদের এমন মানসিকতা, বঙ্গবন্ধুর মত কর্মী ও জনগনের জন্য সর্বস্ব নিবেদিত মহান নেতার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন ছাড়া আর কী! দ্রুত পরজীবি কীট, আগাছা মুক্ত করে মুজিববর্ষে দলকে যদি বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শের মহাসড়কে তুলে আনা না যায়, তাহলে মুজিববর্ষের মূল লক্ষ্য কিন্তু অধরাই থেকে যাবে। অন্য দশটি রুটিন সূচির মত মহাড়ম্বরে মুজিববর্ষ উদযাপন হবে সত্য। কিন্তু লাভের গুড় যাবে পরজীবি ছারপোকার পেটে। আশা করি সংশ্লিষ্ট উদযাপনকারী কর্তৃপক্ষ বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করবেন।