মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা

এমিলি মজুমদার

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ

নতুন ভোরের , নতুন সূর্য
জানাই প্রণাম তোমারে
মনের আঁধার দূর করে তুমি
আলোকিত করো সবারে ।
এসো হে বৈশাখ এসো এসো -ধ্বনিত হবে সমস্বরে আকাশে বাতাসে। আমরা সবাই মেতে উঠবো আমাদের এই প্রাণের উৎসবে, গানের উৎসবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, আবালবৃদ্ধবনিতা মিলিত হয়ে এই উৎসব পালিত হয় বলেই অসাধারণ এক অনুভূতির উৎসব এ পহেলা বৈশাখ। যত দিন যাচ্ছে, নানা প্রতিকূলতার মাঝেও এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এ উৎসব এখন আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান উৎসব। প্রস্তুতি চলে অনেক আগে থেকেই পহেলা বৈশাখকে রঙিন থেকে রঙিনতর করে তোলার জন্য। সব মার্কেটগুলো সেজে ওঠে বৈশাখী সাজে, ভরে ওঠে বৈশাখী পোশাক, আর গৃহসজ্জ্বার সামগ্রীতে। ছোটবড় সবাই চেষ্টা করে সামর্থানুযায়ী কেনাকাটা করে নিজেকে আর নিজ গৃহকে একটু নতুন সাজে সাজাতে। ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে বকেয়া আদায় করে নতুন হালখাতা খোলার জন্য। বিভিন্ন সংগঠনগুলো ব্যস্ত বৈশাখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে। শহরে শহরে আয়োজন চলে বৈশাখী র‌্যালিকে হরেক রঙে রাঙিয়ে তোলার জন্য। ঢাকার মঙ্গল শোভাযাত্রার দৈর্ঘ্য দিনে দিনে বেড়েই চলেছে যা আমাদের আশার আলো দেখায়। ব্যানার, ফেস্টুন, মুখোশ (এবছর অবশ্য মুখোশ পরা নিষিদ্ধ), সাজানো গাড়ী, বিভিন্ন মাঙ্গলিক প্রতীক, বৈশাখী শাড়ী, পাঞ্জাবী পরিহিত ছেলে-মেয়ে, বাচ্চাবুড়ো সবাই মিলে ঢাক-ঢোল, নানা বাদ্যযন্ত্রে সজ্জিত আমাদের এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখলে মন প্রাণ দুটোই আনন্দে দুলে ওঠে আমাদের । আর এ আনন্দধারা আরো প্রাণবন্ত করে তুলছে আমাদের এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। আমাদের সংস্কৃতিতে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের চারুশিল্পীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। কুমোর কামার ব্যস্ত রয়েছে মেলার প্রস্তুতি নিয়ে। তাদের জীবনে হয়তো রঙের অভাব, কারণ তারা তাদের জীবনের সবটুকু রঙ উজার করে দিয়ে তৈরি করে বিভিন্ন সামগ্রী আমাদের জীবন রঙিন করে তোলে। আমাদেরও উচিত এদের তৈরি জিনিসগুলো ন্যায্যদামে কিনে ওদের জীবনেও একটু রঙের ছোঁয়া দেয়ার চেষ্টা করা ।
অবশেষে আসে সে কাঙ্ক্ষিত দিন । সূর্যাস্তে “বর্ষ বিদায়”, সূর্যোদয়ে “বর্ষ বরণ”। চারদিকে ধ্বনিত হয় :
এসো হে বৈশাখ এসো এসো –
নতুন বছরের বরণ করে নেই সবাই এই কামনায় :
“মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা
অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা”
সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই নতুন বছরকে গানে, নাচে , কবিতা, নাটকে বরণ করে নেয় আমাদের শিল্পীকলাকুশলী। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মুক্ত মঞ্চগুলোতে চলে ছোট বড় অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বড় বড় শিল্পী সবাই মুক্ত মঞ্চে তাঁদের পরিবেশনা দিয়ে বরণ করে নেন নতুন বছর, আমোদিত করেন আমাদের। আলপনায় সেজে ওঠে চারদিক, ছোটবড় সবাই নতুন পোশাকে বাঙালি সাজে সজ্জিত হয়ে মনের আনন্দে ছুটে যায় মুক্ত মঞ্চগুলোর দিকে। ছোটছোট আলপনাতে সাজিয়ে নেয় নিজেদের। মুক্তমঞ্চের আশপাশ হয়ে ওঠে বর্ণিল বাগান। মেলাগুলো মুখরিত হয়ে ওঠে, কানে আসে হরেক রকমের বাঁশীর আওয়াজ চারদিক থেকে। রঙবেরঙের ঘুরানীগুলো জোড়ে ঘুরতে থাকে বাতাসে বাচ্চাদের হাতে হাতে। হরেক রঙের বেলুনগুলো আকাশমুখী হয় যেন ছোট বড় সবাইকে ডাকছে তার সাথী হবার জন্য –
বিভিন্ন হোটেল রেঁস্তোরা গুলোতে রয়েছে বিশেষ দেশীয় খাবারের আয়োজন। মিষ্টির দোকানে থাকে উপচে পড়া ভিড়। সারাবছর আমরা যে যেমনটাই থাকি না কেনো, এ সময়টাতে গানে, কবিতায়, গৃহসজ্জায়, সাজে, পোশাকে, খাবারদাবার সবকিছুতে আমরা পুরোপুরি খাঁটি বাঙালি।
পশ্চিমা দেশগুলোতেও এখন বাঙালিরা জাঁকজমকের সাথে বাংলা নববর্ষ পালন করে থাকে । বিশ্ব দরবারে আমরা বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করতে পারি। পহেলা বৈশাখে আমাদের সংস্কৃতির নতুন নতুন সব সংযোজন আদরনীয় , যা আমাদের এই উৎসবকে করে তুলছে মহিমান্বিত। তবে এই পহেলা বৈশাখ উৎসবে “পান্তা-ইলিশের” সংযোজন কেনো যেন গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, তবে তা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত।
অনেকে পহেলা বৈশাখকে হিন্দুদের উৎসব বলে আখ্যায়িত করে থাকে -যা মোটেও সঠিক নয়।এটা ঠি ক যে চৈত্র মাসের শেষ দিন হিন্দুরা ধর্মীয়ভাবে সংক্রান্তি পালন করে থাকে। চৈত্র মাসে বাড়ির সমস্ত জিনিস ধোয়ামোছা করে পরিস্কার করে, সংক্রান্তির দিন নিরামিষ খেয়ে থাকে। পূজোও করে থাকে অনেকে। বাঙালি হিসেবে নতুন বছর বরণ করার মাঝে কোন হিন্দুয়ানী নেই। আমরা বাঙালি। বাংলা সনের প্রথম দিন আমাদের নববর্ষ পালিত হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।
গ্রামগুলো এখন প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ায়, শহুরে বৈশাখ বেশী জাঁকজমকপূর্ণ। অথচ একসময় গ্রামগুলো
সংক্রান্তির আয়োজনে থাকতো মুখরিত। অনেক মেলা বসতে গ্রামে গ্রামে। আমি চট্টগ্রামের মেয়ে বলে চট্টগ্রামের গ্রামগুলোর কথা বলতে পারি। মাটির বাড়িগুলো লেপে ঝকঝকে তকতকে করা হতো, খইয়ের নাড়ু, কড়ইয়ের নাড়ু, খই-মুড়ির মোয়া, মুড়কি বানানোতে ব্যস্ত থাকতো প্রতিটা হিন্দু গৃহস্তবাড়ির মেয়ে বৌ । অনেক কষ্ট এগুলো বানানো ।সেই স্বাদ এখন হাজার খুঁজলেও আর এখন পাওয়া যায় না। এখন খুব কম বাড়িতেই এগুলো বানিয়ে থাকে ।শহরে বিভিন্ন বড় বড় কিছু দোকান, সুদৃশ্য আকর্ষণীয় মোড়কে জড়িয়ে খাবারগুলো বিক্রী করে। পহেলা বৈশাখে উপহার দেবার জন্য কেউ কেউ কিনে থাকেন এগুলো , তবে কেউ এগুলো খেতে পারে বলে মনে হয় না , কারণ ওগুলো স্বাদহীন । যত্ন করে কেউ বানায়না বলেই হয়তো কোন স্বাদই পাওয়া যায় না। একদিকে যেমন মিস্‌ করি সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে, অন্যদিকে তেমনি আনন্দিত ও গর্বিত হই পহেলা বৈশাখের বর্তমান রূপে এবং কামনায় থাকে দেশমাতৃকার উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার

x