মুছে গেল ১০৩ বছরের স্মৃতি

সবুর শুভ

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ

ফতেয়াবাদ রামকৃষ্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বয়স ১০৩ বছর। বিদ্যালয়ের সামনের পুকুরের বয়সও প্রায় সমান। তালতইল্যা পুকুর নামে পরিচিত এটি। ভরাটে বিলীন হয়েছে শতবর্ষী পুকুরটি। উঁচু বাউন্ডারি দেয়ালের ভেতরে থাকা এ পুকুরের ভরাট জায়গায় একটি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তোলা হবে বলে জানা গেছে।

তবে কারখানা গড়ে তোলার স্থানটি নাল জমি হিসেবেই জায়গার মালিক প্রণব কান্তি পাল (নটু পাল) থেকে ক্রয় করেছেন বলে জানালেন ওই শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ তুষার ইমরান। তিনি জানান, এ জমির যাবতীয় কাগজপত্র দেখে দেশের শিল্পায়নের স্বার্থে আমরা জায়গাটি ক্রয় করেছি। এখানে টিনশেড ঘরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজেদের মালিকানাধীন পার্শ্ববর্তী গার্মেন্টসের শ্রমিকদের আনা হবে। এতে পাশের বিদ্যালয়ের পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

২০১২ সালের কথা। চৌধুরীহাটে এই পুকুরটি ভরাটের একেবারে গোড়ার দিকে স্থানীয় জনগণ ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে আবেদন করা হয় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ে। ২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কার্যালয়ে এ সংক্রান্তে অভিযোগ জমা হওয়ার পর ভরাট বন্ধের তৎপরতা শুরু হয়। এরপর কেটে যায় অনেক সময়। পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ আর নোটিশ জারি হয় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে পুকুর ভরাট হয়ে যায়। ভরাটের ধাক্কায় প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

এর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক গোলাম মোহাম্মদ ভুঁইয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারির মধ্যে পুকুরের ভরাটকৃত অংশের মাটি পুনঃখননসহ পুকুরপাড়ে নির্মিতব্য ঘর এবং অন্যান্য স্থাপনা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট জমির মালিক প্রণব কান্তি পালকে। একইসাথে পুকুরকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে তার স্থিরচিত্র দপ্তরকে অবহিত করারও নির্দেশ দেন তিনি। এরপরও পুকুরটি হারিয়ে যায়।

চার বছর আগে পুকুর সম্বলিত জায়গাটি কিনে সেখানে এসএস ফ্যাশন ওয়্যার, গার্মেন্টস পার্ক বিডি লিমিটেডের শেড স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়। গার্মেন্টস কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, তারা এ পুকুরের জায়গাটি নাল হিসেবেই কিনে সেখানে শিল্প স্থাপনের চেষ্টায় আছেন। এ সংক্রান্তে তারা বিএস খতিয়ানের নামজারিতে ওই পুকুরের জায়গা ‘নাল’ উল্লেখ থাকার বিষয়টি প্রদর্শন করেন এ প্রতিবেদকের সামনে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তৎপরতা জানতে চাইলে অধিপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফেরদৌস আনোয়ার বলেন, পুকুর ভরাটের অভিযোগ সংক্রান্তে সংশ্লিষ্ট মালিকদের আমরা নোটিশ দিয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এখন প্রতিবেদন দেয়া বাকি

রয়েছে। সেটাও আমরা দ্রুততার সাথে দিয়ে দেব।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ফতেয়াবাদ রামকৃষ্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঠিক সামনে ৪৮ শতাংশ (২৪ গণ্ডা) আয়তনের পুকুরটির অবস্থান ছিল। বর্তমানে যার অস্তিত্ব নেই। ৩০০ শিক্ষার্থীর এ স্কুল থেকে দেড়শ গজ দূরেই ফতেয়াবাদ মহাকালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফতেয়াবাদ মহাকালী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের অবস্থান। এই দুই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০০।

ফতেয়াবাদ রামকৃষ্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের জায়গায় যদি গার্মেন্টস গড়ে তোলা হয় তাতে পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশংকা করছেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সৌমেন চৌধুরী সুমন। স্থানীয় বাসিন্দা প্রবাল ঘোষ জানান, পুকুর ভরাট করে শতবর্ষী তিনটি বিদ্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থানে গার্মেন্টস কারখানা নির্মাণ হলে এলাকার পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার পাশাপাশি লেখাপড়ার পরিবেশও বিঘ্নিত হবে।

এ বিষয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ তুষার ইমরান বলেন, দেড় বছর আগে একই স্থানের কাছাকাছি আমরা বড় একটি গার্মেন্টস করেছি। এতে এলাকার ছেলেমেয়েরাই চাকরি করছে। সকাল ৮টা থেকে রাত অবধি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ চলে। কর্মীরা কাজ করার সময় কোনো আওয়াজ করার সুযোগ নেই। এ কারণে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ারও সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসাযাওয়ার সিডিউলের সাথে গার্মেন্টস কর্মীদের চাকরিতে আসাযাওয়ার সিডিউল একই সময়ে নয়।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২৮ নভেম্বর ফতেয়াবাদ রামকৃষ্ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সৌমেন চৌধুরী ও মহাকালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি অনুপ কুমার ঘোষ টিটু পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে একটি আবেদন করেন। ৩৮০৯ বিএস খতিয়ানের ৮৯১১ দাগের পুকুরটি ভরাট করে গার্মেন্টস কারখানা স্থাপনের পাঁয়তারার কথা উল্লেখ করা হয় এতে। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধিদপ্তরের দৃষ্টি আর্কষণ করেন দুই আবেদনকারী। সর্বশেষ এ তৎপরতার পর পরিবেশ অধিদপ্তর আবার তৎপর হয়। পুকুর ভরাটের স্থান পরিদর্শন করে অধিদপ্তরের একটি দল।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের (জেলা) উপপরিচালক মোহাম্মদ ফেরদৌস আনোয়ার জানান, আমরা ১৫ দিন আগে পরিদর্শনে যাই। এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রস্তুত করছি।

পরিবেশ সংক্রান্ত আইনে বলা আছে, ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত২০১০) অনুযায়ী জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ব্যতীত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর ভরাট করা বা শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না।’ এ ধরনের করলে তার শাস্তি হিসেবে জেলজরিমানার কথা বলা হয় আইনে।

x