মুক্ত সাংবাদিকতার আবশ্যিক শর্ত গণতন্ত্র ও আইনের শাসন

নাসির উদ্দিন তোতা

শুক্রবার , ২২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:১৩ পূর্বাহ্ণ

২১ নভেম্বর ছিল বিশ্ব টেলিভিশন দিবস। ১৯২৬ সালের এই দিনে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি বেয়ার্ড (ঔড়যহ খড়মরব ইধরৎফ) টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। যদিও উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর গবেষণা এবং মৌলিক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে টেলিভিশন আবিষ্কারের পথ তৈরি হতে থাকে এবং ১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর সফলতা পায়। দিনটিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত এক ফোরামে ২১ নভেম্বরকে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৪১ সালের ১ জুলাই বাণিজ্যিক সমপ্রচার শুরু হয় নিউইয়র্কে।
তৎকালীন এনবিসি এবং বর্তমানে ডব্লিইএনবিসি এর মাধ্যমে। বাংলাদেশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে। নাম ছিল পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশন। দেশ স্বাধীন হবার পর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন। যদি কিছু মনে না করেন, চতুরঙ্গ, আপনার ডাক্তার, হারজিত, সপ্তবর্ণা, আনন্দ মেলা, নতুন কুঁড়ি, ভরা নদীর বাঁকে, ইত্যাদি, মাটি ও মানুষ, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, বহুব্রীহি, নক্ষত্রের রাতসহ বহু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও নাটক দর্শক-শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই টেলিভিশন চ্যানেলটি। দেশে গণমাধ্যমের বিকাশ অভূতপূর্ব। অর্ধশত টেলিভিশন, ডজন খানেক এফএম রেডিও, কয়েকশ’ জাতীয় দৈনিক, শত শত আঞ্চলিক পত্রিকা এবং অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল।
রাষ্ট্র বোঝাতে চায়, এই সংখ্যাধিক্যই সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার প্রমাণ। বাস্তবে সংখ্যার বেশ উন্নতি হলেও মানে বেশ পিছিয়ে যাওয়ায় মানুষ সংবাদ মাধ্যম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে । একই খবরের বার বার চর্বিত চর্বনে নাগরিকরা ত্যাক্ত বিরক্তও। তাই গণমাধ্যম এখন গভীর সংকটে। এর সাথে জড়িতরা যেমনি জানেন তেমনি জানেন, নাগরিক সমাজও। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বোঝা এবং পক্ষান্তরে আয় কমে যাওয়া সংবাদ মাধ্যমকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। মালিকরা আয় কমে যাওয়ায় এখন ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নিয়েছেন। গণমাধ্যমের বহুমাত্রিক সংকটে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। যেখানে যাছাই বাছাই ও সম্পাদনা ছাড়াই তথ্য ও মতামতের তাৎক্ষণিক আদান-প্রদান ঘটছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, দক্ষ কর্মশক্তি এবং দরকারি বিনিয়োগের অভাবে সংবাদ মাধ্যম এখন আর গণমাধ্যম হয়ে উঠতে পারছে না।
বিশ্বাসযোগ্যতাও সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশের রাজনীতি,অর্থনীতি, প্রশাসন সব জায়গার মতো সংবাদ মাধ্যমেও দুর্বৃত্তায়নের চরম নমুনা দেখা যায়। বেশির ভাগ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কোনো-না-কোনো কর্পোরেট হাউজের মালিকানাধীন। তারা মূলত গণমাধ্যম না হয়ে সেই সব করর্পোরেট প্রতিভূর ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হয়ে পড়েছে এবং নিজ নিজ কর্পোরেট দৈত্যর কল্কি বহন করছে। ফলে তৈরী হয়েছে কর্পোরেট সাংবাদিক। ভালো কথা বলা সাংবাদিকের অভাব নেই। অভাব শুধু সেই কথামতো কাজ করার।
মানুষ কারো তল্পিবাহক সাংবাদিক চায় না। আবার জঙ্গিদের উকিলও চায় না। তারা পোষমানা সাংবাদিক চায় না। সাংবাদিকদের কোনো পক্ষ নাই। ভূত যেমন জলাশয়ের কাছে থেকে রাত-বিরাতে কোনো পথচারীকে একা পেলে পথ ভুলিয়ে অন্য পথে নিয়ে যায়,একইভাবে এরা নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার্থে পাঠককে বিভ্রান্ত করে,পথ ভুলিয়ে প্রায়ই অন্য পথে নিয়ে যায়।
সংবাদ মাধ্যমের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেমন অনেক বেশি। তেমনি দায়িত্বের ব্যাপ্তিও অনেক বিস্তৃত। সংবাদ মাধ্যম এই দায়িত্ব প্রত্যাশামতো পালন করতে পারে তখন, যখন নির্ভয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে। তাই মুক্ত সাংবাদিকতার আবশ্যিক শর্ত গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন।
সময় দেখার প্রয়োজন হলে ঘড়ি দেখতে হয়। হাতে যদি ঘড়ি না থাকে, আগে ঘড়ি খুঁজতে হবে; অতঃপর সময় দেখতে হবে অথবা কাউকে-না-কাউকে সময় জিজ্ঞেস করতে হবে। সময় দেখার পর যদি ওই সময়ের কাজটি করা না হয়, তার জন্য ‘সময়’ দায়ী নয়। দায়ী যিনি সময় দেখলেন না অথবা যিনি দেখার পরও অবহেলা করলেন। অবহেলার মূল্য পৃথিবীর বহুদেশ, সমাজ, জাতি ও ব্যক্তি দিয়েছে। আমরাও যে অবহেলার মূল্য দিইনি, সে কথা বলা যাবে না। আবার যেন দিতে না হয়,এ জন্য সচেতন হওয়া দরকার।
আশার কথা, সংবাদ মাধ্যমগুলোর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন সাংবাদিকতায় মনযোগী হয়েছে, তারা সব প্রতিকূলতার মাঝেও ভালোভাবে টিকে আছে। তারা নাগরিক সমাজের তথ্য চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়েছে। সাদাকে সাদা বলা এবং কালোকে কালো বলার সাহস ও সততা লালন খুবই দরকার সাংবাদিকদের জন্য। এরজন্য সবার আগে দরকার সুশিক্ষা।
লেখক : সাংবাদিক

x