মুক্তিযোদ্ধার মুখে রণাঙ্গনের গল্প শুনলো শিক্ষার্থীরা

আকাশ আহমেদ : রাঙ্গুনিয়া

সোমবার , ২১ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৩০ পূর্বাহ্ণ
27

মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশে রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা শুনলো মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে রণাঙ্গনের নানা গল্প। ৭ম শ্রেণির বাংলা পাঠ্য বইয়ে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ একটি অধ্যায় রয়েছে। এর আলোকে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দলে ভাগ করে একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে স্থানীয় এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বা প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার নিকটজন বা মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে এমন ব্যক্তিদের কাছে যাচ্ছে তারা। রণাঙ্গনের গল্প শুনে শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে নাম্বার। এজন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ থেকে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শোনাতে তিনজন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এ আয়োজন করছে উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
গত ১৭ অক্টোবর দুপুরে রাঙ্গুনিয়ার বঙ্গবন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। রণাঙ্গনের নানা কাহিনী শুনাতে এদিন বিদ্যালয়ে আসেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন রাঙ্গুনিয়ার কমান্ডার মো. নুরুল আলম। তিনি ছাড়াও শিক্ষার্থীদের রণাঙ্গনের নানা কাহিনী শুনান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনকারী ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জহির আহমদ চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা, মাস্টার নুরুল হুদা, শামসুল আলম ও মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহেরের মেয়ে শামীমা সুলতানা।
গল্প শুনাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল আলম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মতো আদর্শিক নেতা হতে হবে। সত্যবাদী হতে হবে। তাঁর আদর্শ ধারণ করে তাঁর মতো দৃঢ়চেতা, ঈমানদার, দূরদর্শী নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে লালন ও ধারণ করে নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কাজে-কর্মে, চিন্তা-চেতনায় দেশপ্রেম থাকতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে সরকারের এই ধরণের কার্যক্রম প্রশংসার দাবিদার। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের কাহিনী শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে জানতে পারবে।’ তিনি সহ এদিন নিজের জীবনের নানা গল্প শোনালেন অনুষ্ঠানে আসা অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাও। কিভাবে একের পর এক সশস্ত্র সম্মুখযুদ্ধ ও গেরিলা হামলায় অংশ নেন, কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন, মৃত্যুর কাছ থেকে কিভাবে বার বার ফিরে এসেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের নানান স্মৃতি শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের ভিত্তিতে তুলে ধরেন তাঁরা। মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরের অগ্নিঝরা রণাঙ্গনের বীরত্বগাথা বিভিন্ন গল্প যখন শুনাচ্ছিলেন, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল পিনপতন নীরবতা। তেজোদীপ্ত লড়াই-সংগ্রামের গল্প শুনে কখনো শিক্ষার্থীরা শিহরিত হচ্ছিল। কখনো মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী নিরীহ বাঙালির ওপর পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনী শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলো শিক্ষার্থীরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নুরুল আবছার বলেন, বাংলা বইয়ের ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধকে জানি বিষয়ক শিখনফল অর্জনে বিশেষ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই আয়োজন করা হয়েছে।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা দলগতভাবে ভাগ হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে রণাঙ্গনের গল্প শুনে ভিডিও চিত্র ও লিখিত প্রতিবেদন তৈরি করবে। এই কার্যক্রমের জন্য তাদের মোট ২০ নাম্বার দেয়া হবে। এ নাম্বার সপ্তম শ্রেণির বাংলা ধারাবাহিক মূল্যায়ণের অংশ হিসেবে যোগ হবে। উপজেলার প্রতিটি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।’
কথা হয় বঙ্গবন্ধু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সাথে। তারা জানায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধারা সেইসব দিনের গল্প শোনালেন। আগে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বিভিন্নভাবে শুনলেও মুক্তিযোদ্ধাদের এমনভাবে কাছে পাইনি। তাঁদের কথা শুনে শিহরিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে জানার পাশাপাশি দেশ, জাতি তথা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা ভীষণভাবে জেগে উঠছে বুকের ভেতর।
মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষক নুরুল হুদা বলেন, এ কর্মসূচির ফলে একজন শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস শুনার সুযোগ পাচ্ছে। এতে করে ওই শিক্ষার্র্থীরা অনুপ্রাণিত হয়ে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠবে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে।

x