মুক্তিযুদ্ধে সংবাদপত্রের অবদান স্মরণীয়

বৃহস্পতিবার , ১৯ মার্চ, ২০২০ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ
54

বাঙালি জাতির সুদীর্ঘকালের স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের সূর্যোদয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় আত্মাহুতি, রক্তদান, ত্যাগ-তিতিক্ষা, মরণপণ সংগ্রাম, ভায়োলেন্স, সশস্ত্র যুদ্ধ বাঙালি তা যথেষ্ট করেছে এবং দিয়েছে। পাকিস্তানিদের ২৫ বছরের অত্যাচার, নির্যাতন, বঞ্চনা, হত্যা সহ্য করে, তিরিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়ে, দু’লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়ে, লক্ষাধিক মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করে, এক কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাসের ফসল এই বাংলার স্বাধীনতা। চব্বিশ বছর এক অসম দীর্ঘ লড়াইয়ে কে বা কাদের ভূমিকা ছোট-বড় সেটা বিচার্য নয়। যে কোনো জাতির স্বাধীনতার ইতিহাসে আপামর জনসাধারণের ভূমিকাই থাকে মুখ্য। থাকে অসংখ্য উপাদান ও উপাত্ত উপকরণ। সব মিলে বিকশিত হয় একটি মৃণাল, যে মৃণালে ফোটে শেষাবধি স্বাধীনতা নামক পুষ্পটি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একদিকে যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসে, তেমনি বিশ্ব গণমাধ্যমেরও সাড়া জাগানো ঘটনা। যুদ্ধ সংগঠিত করতে, মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করতে, জনগণের মনে প্রত্যাশা তৈরিতে ও জনমত গঠনে স্বাধীনতার স্বপক্ষে বাংলাদেশ ও বিদেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য নিয়মিত ও অনিয়মিত পত্রপত্রিকা। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বাংলাদেশকে নিয়ে লেখা হয়েছে সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, সংবাদ, কবিতা, গান, কার্টুন ইত্যাদি। প্রকাশিত পত্র পত্রিকাগুলো আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, মুজিবনগর সরকার ও প্রবাসী বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকা পাকবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ, ধ্বংসলীলা, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ, শরণার্থী শিবিরের বর্ণনা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছিল।
আমরা জানি, সকল গণমাধ্যমের মধ্যে সংবাদপত্র হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর গণমাধ্যম। যে কোনো দেশের জনগণের মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকার, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে সংবাদপত্রের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। সংবাদপত্র যে সত্য প্রকাশের বাহন, বাস্তবচিত্র তুলে ধরার গণমাধ্যম এবং প্রয়োজনের শিল্প সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে শিল্পটি তখনই সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে যখন জনগণ তাদের অধিকার, স্বাধিকার সম্পর্কে সচেতন উদ্দীপনা প্রকাশ করে। জনচিত্তের সরব প্রতিফলন ঘটানোই সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকের কাজ। আর এই দুরূহ ও সাহসী কাজটি সম্পন্ন করতে গিয়ে শাসককূলের ঝুলন্ত খড়গের তলায় সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বলিদান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে একশ ভাগ। জেল-জুলুম, পীড়ন, নির্বাসন তো আছেই। দেশের মঙ্গলার্থে, জনকল্যাণে, সত্য উদঘাটনে, অধিকার আদায়ে সংবাদপত্র যে বলিষ্ঠ ভূমিকা যুগে যুগে পালন করে এসেছে সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালে আমাদের সাংবাদিকরা এবং সংবাদপত্রসমূহ স্বাধীনতা আনয়নে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
দালিলিক তথ্য তুলে ধরে গাজী আজিজুর রহমান এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, অমৃতবাজার, আনন্দবাজার, যুগান্তর, বসুমতী, ধূমকেতু, লাঙ্গল, ইত্তেহাদ, স্বরাজ, স্টার অব ইন্ডিয়া ইত্যাদি সংবাদপত্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে ভূমিকা পালন করেছিল ইতিহাস তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুদ্ধপূর্ব পাকিস্তান আমলে দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ, জনপদ, অবজারভার বাঙালির জনচৈতন্যকে যেভাবে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ ও ঐকমত্য তৈরিতে ভূমিকা পালন করেছিল তা কি বিস্মৃত হওয়ার? শ্রদ্ধেয় মানিক মিয়া, জহুর আহমেদ চৌধুরী, আহমেদুল কবির, আব্দুস সালাম, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, এম. আর আক্তার মুকুল, রণেশ দাশগুপ্ত, সন্তোষ গুপ্ত ইত্যাদি নির্ভীক সাংবাদিকদের ভূমিকা আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে আজো মাইলফলক হিসেবে চিহ্নমান। জীবন দিতে হয়েছে সাংবাদিক চিস্তি হেলালুর রহমান, খন্দকার আবু তালেব, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ আরো অনেক সাংবাদিক বন্ধুকে। এসব শহীদের রক্ত শপথে ’৭১-এর মার্চ থেকেই একদল সাহসী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক দেশের ভেতরে-বাইরে, অবরুদ্ধ রণাঙ্গনে বসে, পালিয়ে, গোপনে, প্রকাশ্যে বের করেন একাধিক সংবাদপত্র। সে ইতিহাস আমাদের আজ আবার নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন আলোকে উদ্ভাসিত করা।
মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক আজাদীর অসামান্য ভূমিকা আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, যা অত্যন্ত গৌরবের আর অহঙ্কারের। গত ১৭ মার্চ দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘জয় বাংলা ও আজাদী’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আজাদীর অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর সাথে জয় বাংলার আত্মিক ও ঐতিহাসিক বন্ধন আছে। যদিও এদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে দৈনিক আজাদীর ভূমিকা সর্বজনবিদিত। দৈনিক আজাদী প্রকাশের সময় ছিল দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের প্রতিকাল। বাঙালি জাতি বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছয়দফা কর্মসূচির আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়। আর এসব আন্দোলন-সংগ্রামে দৈনিক আজাদী নির্ভীকভাবে গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেয়। পাকিস্তান আমলে সংবাদপত্রের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দৈনিকটি আপোষহীন ভূমিকা পালন করেছে।