মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদীপ্ত গান- ইতিহাসের অংশ

বাসুদেব খাস্তগীর

সোমবার , ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচাইতে বড় প্রাপ্তি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ উদ-দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে যে গোলামী শিকল বাঙালিদের পায়ে পড়ানো হয়েছিলো, সে গোলামীর শিকল ছিঁড়তে সময় লেগেছে প্রায় দু’শো বছরেরও বেশি। সেই বাঙালির স্বপ্নকে পূর্ণতা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি জাতিকে তিনি ধীরে ধীরে কীভাবে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবে এনে দিলেন তা সত্যই বিস্ময়কর। সেই ইতিহাস কোন কল্পনার গল্পে বাঁধা কাব্য নয়, বরং বাস্তবতার একটি বর্ণিল উদাহরণ। ইতিহাসের পরতে পরতে সে সেই গৌরবময় ইতিহাস আমাদের পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাঁড়াতে সবসময় সাহস যোগায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন বাঙালির জীবনের বড়ই আরাধ্য ধন। বাঙালির এ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ৫২, ৬২, ৬৯ এর পথ যেনো এক একটি মাইলফলক। দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ত্রিশ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগে ও দু’লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম হারানোর দুঃসহ ইতিহাসে এসেছিলো আমাদের মুক্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, আমাদের হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন মহান স্বাধীনতা। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক পরিকল্পনা দিয়ে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। কিন্তু বাঙালিরা তো বীরেরই জাতি। তারা বুকে ধারণ করেছিলো সেই স্লোগান ‘ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ লড়ে যায় বীর।’ পাকিস্তানীরা বাঙালিদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালালেও স্তব্ধ করা যায় নি সেই বীর বাঙালিকে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয় আমাদের জীবন মরণ স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই। দেশকে হানাদার মুক্ত করতে মরণপণ প্রতিরোধে সামিল হয়েছিলেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী, শিল্পী সংগ্রামী নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। এই সশস্ত্র যুদ্ধে নানা মানুষের নানা ধরনের ভূমিকা লক্ষণীয়। কেউ হয়তো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে, কেউ গোপনে সাহায্য করেছে, কেউ কবিতা, ছড়ায় কিংবা গানে গানে মানুষকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। প্রত্যেকের অবদান স্ব স্ব জায়গা থেকে স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। কবিতা, ছড়া, গান কিংবা অন্য কোন লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে গতিশীল করার যে ভাবনা বা ধারণা সেটাকে মননশীলতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে উজ্জীবিত করার প্রয়াসই বলতে পারি এবং সেই প্রয়াস ছিলো অন্যতম একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে উজ্জীবিত করেছিলো এমন কিছু দেশের গানের কথাই এখানে আলোচনা করবো। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর নির্মাণ করেছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ নামক চলচ্চিত্রটি। এ চলচ্চিত্র নির্মাণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইল ফলক ও সাহসী পদক্ষেপও বটে। কারণ সে চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত কয়েকটি গানের ব্যবহার আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণার অন্যতম উৎস ছিলো। এ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি?’, ‘ও কারার ঐ লোহ কপাট ভেঙ্গে ফেল করলে লোপাট’সহ এ উদ্দীপনামূলক গানগুলো। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে এ গানের ব্যবহার জহির রায়হানের সাহসী পদক্ষেপই ছিলো। এ গানগুলোর মধ্যে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’এখন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা যোগানো গানের মধ্যে এই অমর গানটির কথা সবচেয়ে বেশি স্মরণযোগ্য। কারণ এ গান শুনে অবসরে মুক্তিসেনারা দেশের জন্য আবেগময় হয়ে পড়তেন আর দেশপ্রেমের উৎসাহে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। অন্য গানটি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ একুশের গান হিসেবে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার আগে চলচ্চিত্রে এমন গানের ব্যবহার এ দেশের মুক্তিযোদ্ধার ভিতরে ভিতরে যুদ্ধে নামতে এক ধরনের প্রেরণা যুগিয়েছে নিঃসন্দেহে বলা যায়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীর মনোবলকে উদ্দীপ্ত করতে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ এর ভূমিকা ছিলো অবিস্মরণীয়। একাত্তর সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিদিন মানুষ অধীর আগ্রহে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করত। গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা এবং সুরকার আনোয়ার পারভেজের সুর করা ‘জয় বাংলা,বাংলার জয়’ গানটি এ বেতার কেন্দ্রের সূচনা সঙ্গীত হিসাবে প্রচারিত হতো। সেটা ছিলো এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। একাত্তর সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একাত্তরে বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী সনজিদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিলো সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা।’ মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দানে তারা নানামুখী কর্মকাণ্ডে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিলেন। এ সংস্থার একটি গানের দল বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পগুলোতে ট্রাকে ঘুরে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের গান পরিবেশন করে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই উদ্দীপনামূলক গান শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার চেয়ে কম শক্তিশালী ছিল না। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র গঠনের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডিএল রায়, নজরুল ইসলামসহ আরো অনেকের দেশপ্রেম ও দ্রোহ বা প্রতিবাদী গানগুলো গাওয়া হতো। পরবর্তী সময়ে গোবিন্দ হালদার, আবদুল লতিফ, গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার, অপরেশ লাহিড়ী, সিকান্দার আবু জাফর, ফজল এ খোদা, আপেল মাহমুদসহ বিভিন্ন গীতিকারের লেখা গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে প্রচার হতো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে চলত এক ধরনের সাংস্কৃতিক লড়াই। এ সময় প্রচারিত এসব গানের মধ্যে ছিল- ১.রবি ঠাকুরের ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ ২.অতুল প্রসাদের ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা’ ৩. কাজী নজরুলের ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী’ ৪.ডি এল রায়ের‘ধনধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’ ও ‘বঙ্গ আমার জননী আমার ধাত্রী আমার দেশ’ ৫. রজনীকান্তের‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’ ৭.চারণকবি শামসুদ্দিন আহমেদের ‘তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ ৮.আবদুল লতিফের.‘আমি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়’ ৯. মুকুন্দ দাসের ‘ভয় কি মরণে রাখিতে স্মরণে’ এমন অনেক দেশপ্রেমের উদ্দীপনামূলক গান। এ গানগুলোতো আমাদের ইতিহাসেরই অংশ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আরো অনেক দেশাত্মবোধক গান এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে দিয়েছে গতিময়তা, জাগিয়েছে দেশপ্রেমের চেতনা এবং দেশের আপাময় মানুষের মনে স্বাধীনতার আলোক বর্তিকা জ্বালিয়েছে আপন শক্তিতে। কিছু নিবেদিত প্রাণ শিল্পী, সুরকার, গীতিকারের সমন্বয়ে তৈরি করা গানগুলো শিল্পীরা তাদের দরদী কণ্ঠে তুলে নিতেন। সেই গান তো হারিয়ে যেতে পারে না। সেই সব গান মানেই তো আমাদের গর্বিত ইতিহাস। এসব শিল্পী-কুশলী গেরিলা যোদ্ধাদের চেয়ে তো কম না। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে রচিত গান মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে উদ্দীপ্ত করার অন্যতম হাতিয়ার ছিলো। সে সময় গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ স্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি ওঠে রণি’ গানটি তো ইতিহাসে অমলিন। গানটিতে প্রথমে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন অংশুমান রায়। পরে গানটিতে কণ্ঠ দেন শিল্পী আবদুল জব্বার। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা গীতিকার শ্যামল গুপ্তের কথায় এবং বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে আব্দুল জব্বারের গাওয়া ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম, মুজিবর, মুজিবর, মুজিবর। সাড়ে সাত কোটি প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলাম,মুজিবর মুজিবর’ গান মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহিত করার অন্যতম হাতিয়ার ছিলো বলা যায়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অবদুল জব্বার এর কণ্ঠে‘মুজিব বাইয়া যাও রে’ গানটিও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদীপ্ত একটি গান। গীতিকার গোবিন্দ হালদার সে সময় লিখেছিলেন এক স্বপ্ন জাগানো গান আর সে গানে সুর দিলেন সঙ্গীত পরিচালক সমর দাস। সে গান মুক্তিযোদ্ধাদের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে দিলো কী এক উম্মাদনা। সে কথা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। গানটি ছিলো ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্তলাল রক্তলাল রক্তলাল, জোয়ার এসেছে জনসমুদ্রে, রক্তলাল রক্তলাল রক্তলাল।’ কবি সিকান্দার আবু জাফরের লেখায় গানে সুর দিলেন সুরকার শেখ লুৎফর রহমান। শিল্পীরা সমবতে কণ্ঠে গাইলেন ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই, জনতার সংগ্রাম চলবেই।’ গীতিকার নঈম গহরের লেখা
গানে সুর দিয়েছিলেন সুরকার ও সংগীতজ্ঞ আজাদ রহমান এবং প্রথম কণ্ঠ দেন শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। গানের কথা ছিলো‘’জম্ম আমার ধন্য হলো মাগো, এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো, তোমার কথায় হাসতে পারি,তোমার কথায় কাঁদতে পারি, মরতে পারি তোমার বুকে, বুকে যদি রাখো আমায়, বুকে যদি রাখো মাগো।’ কী এক দেশপ্রেমের আবেগ জড়ানো এ গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগম। এ গানে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দেশপ্রেম চেতনা যেনো অন্যভাবে আলোড়িত করে তোলে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রের মত আর একটি গান আমাদের মুক্তিযোদ্ধদের প্রেরণা যুগিয়েছিলো, সে গানটি লিখেছিলেন বিখ্যাত গীতিকার গোবিন্দ হালদার। গানটিতে সুরারোপ ও কণ্ঠ দিয়েছিরেন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী আপেল মাহমুদ। গানটি ছিলো সবার মুখে মুখে। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি। মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’ মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট এ গান ছিলো অস্ত্রের মত শক্তির এক জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ। শিল্পী আপেল মাহমুদের লেখা এবং সুর করা অন্য একটি কালজয়ী গান যেটি শুধু মুক্তিসেনাদের প্রেরণার উৎসই ছিলো না , আজও এ গান শুনে মানুষ প্রেরণা খুঁজে পায়, উদ্দীপ্ত হয় । ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে, আমরা ক’জন নবীন মাঝি, হাল ধরেছি শক্ত করে রে।’ কী চমৎকার কথা ও সুর। মুক্তিযোদ্ধা কবি-গীতিকার ফজল-এ-খোদা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে লিখেছিলেন এক অবিস্মরণীয় গান। শিল্পী আব্দুল জব্বার এই জনপ্রিয় দেশাত্মক গানে সুরারোপ ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম, সকল শহীদ স্মরণে, আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই,তাদের স্মৃতির চরণে।’ মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের এই গান প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছে অবিরত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এ গান যখন বেজে উঠতো মুক্তিযোদ্ধরা আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠতেন। যুদ্ধের দামামায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা দিতে গীতিকার নঈম গহর লিখলেন আরো একটি জনপ্রিয় গান। তাতে সুর দিয়েছিলেন সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার সমর দাস- ‘নোঙ্গর তোল তোল, সময় যে হলো হলো নোঙ্গর তোল তোল।’ গীতিকাররা সে সময়ে শব্দকে কী এক উপমায়, ব্যঞ্জনায় গানের বাণীতে ধারণ করেছেন তা এক কথায় অতুলনীয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বরেণ্য গীতিকার, ভাষাসৈনিক ও সুরকার আবদুল লতিফ মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করতে লিখেছিলেন,‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা, সোনা নয় তত খাঁটি, বলো যত খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি, বাংলাদেশের মাটি রে, আমার বাংলাদেশের মাটি।’ চমৎকার এ গানটি গেয়েছিলেন শিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ। এ গানগুলো যেনো আমাদের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই অংশ। বাংলাদেশের রূপ লাবণ্যের চিত্রকল্প রচনা করে সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের গীতিকার শ্যামল গুপ্ত লিখেছিলেন চমৎকার একটি দেশাত্মবোধক গান। গানটি কথা ছিলো এ রকম- ‘হাজার বছর পরে আবার এসেছি ফিরে, বাংলার বুকে আছি দাঁড়িয়ে।’ বাংলার চিরকালীন শাশ্বত রূপে দেখে কে না মুগ্ধ না হয়ে পারে? বাংলার রূপ লাবণ্যের আকর্ষণে হাজার পর হলেও বাংলায় বার বার ফিরে আসতে ইচ্ছে হয়। এমন গানের কথায় যখন সুরের দোলা লাগে তখন সে গান হয়ে ওঠে প্রাণের গান। এমন কথা সুরের অনুরণনে যখন বেজে উঠতো মুক্তিযোদ্ধাদের ঘর ছাড়া করতো দেশ মাতৃকার টানে। অপরেশ লাহিড়ীর সুরে এ গানটি গেয়েছিলেন শব্দসৈনিক মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বা শিল্পী সংগ্রাম পরিষদের ভূমিকা ছিলো বিচিত্রমুখী। তারা বেতারে গান পরিবেশন করতেন, তাদের রেকর্ডকৃত গান প্রচারিত হতো, আবার তারা গাড়িতে করে ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করতেন। মার্কিন নির্মাতা লেভিন লিয়ার তাদের ১১ টি গান রেকর্ড করেন। লেভিনের রেকর্ডের ফুটেজে গানগুলো ছিল অসম্পূর্ণ। ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় নির্মাতারা সে সব শিল্পীকে দিয়েই সেই ১১টি গান আবার রেকর্ড করিয়েছিলেন। ছবিতে ব্যবহৃত গানগুলো ছিল ১.‘পাক পশুদের মারতে হবে’, ‘২.‘এই না বাংলাদেশের গান’, ৩.‘কিষান মজুর বাংলার সাথী রে’, ৪.‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’, ‘৫.বলো রে বাঙালির জয়’, ‘৬.যশোর খুলনা বগুড়া পাবনা’, ৭.‘বাংলা মা-র দুর্নিবার আমরা তরুণ দল’। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গানও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো ৮. ‘দেশে দেশে ভ্রমি’, ৯.‘আমার সোনার বাংলা’, ‘১০.আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে ‘ এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ১১.‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ গানগুলো। আর সেখানে ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী। ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবণী। রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল, আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল। ঝঞ্ঝার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল লয়ে অশনি’, কাজী নজরুল ইসলামের এ গানের সুর বেজে উঠতো। একাত্তর সনে পাক বাহিনীর আত্মসমর্থনের খবর পাওয়ার পর পরই ১৬ই ডিসেম্বর প্রচারিত হয় ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যাঁরা, আমরা তোমাদের ভুলবো না’ কালজয়ী এ গান। একটি লাল-সবুজ পতাকা আকাশে উড়তে দেখে কলকাতার গীতিকার গোবিন্দ হালদার লিখে ফেললেন সেই গান, আর সে গানে সুর দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদ এবং এ গানের মূল কণ্ঠশিল্পী ছিলেন স্বপ্না রায়। পরে
এ গানে আপেল মাহমুদসহ অন্যান্য সহশিল্পীরা কণ্ঠ দেন। এ গানগুলো ছাড়াও আছে আরো অনেক গান যেগুলো আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস ছিলো। তেমন কিছু গান হলো ১. বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ (গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার, সুর – অংশুমান রায়।) ২.আয়রে চাষী মজুর (গীতিকার-কবি দেলোয়ার,সুর -সুজেয় শ্যাম।) ৩.বিজয় নিশান উড়ছে ওই ( সুর -সুজেয় শ্যাম) ৫. রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম ( আবুল কাসেম সন্দীপ সুর- সুজেয় শ্যাম) ৬.ছোটোদের বড়োদের সকলের, আমার দেশ সব মানুষের ( সুর -খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া, শিল্পী – রথীন্দ্রনাথ রায়) ৭. বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা (কথা ও সুর – সলিল চৌধুরী) ৮. গানের দেশ প্রাণের দেশ বাংলাদেশ ৯. সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে? ইয়াইয়া তোমার আসামীর মত জবাব দিতে হবে (গীতিকার ও সুরকার- মোকসেদ আলী সাঁই ১০.আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা ১১.একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি ১২. মানুষ ’হ আবার তোরা মানুষ ’হ ( গীতিকার -গুরু সদয় গুপ্ত) ১৩.মুক্তির মন্দির সোপান তলে (কথা -মোহিনী চৌধুরী, সুর-কৃষ্ণ চন্দ্র দে) ১৪.গঙ্গা আমার মা পদ্মা আমার মা ( গীতিকার ও শিল্পী- ভূপেন হাজারিকা) ১৫. ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল (গীতিকার- আবু বকর সিদ্দিকী , সুর- সাধন সরকার) ১৬.আমার নেতা তোমার নেতা শেখ মুজিব( কথা-আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ১৭. রক্তেই যদি ফোটে জীবনের ফুল ( কথা-শামসুল হুদা) ১৮. আমি এক বাংলার মুক্তি সেনা ( কথা-নেওয়াজিস খান) ১৯. মুক্তির একই পথ সংগ্রাম (কথা- শহীদুল ইসলাম ) ২০.জগৎবাসী বাংলাদেশকে যাও দেখিয়া( কথা-সরদার আলাউদ্দীন ) ২২.অনেক ভুলের মাশুল তো ভাই (কথা-অনল চট্টোপাধ্যায়, সুর অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়) ২৩.আমাদের চেতনার সৈকতে- (কথা-নাজিম মাহমুদ, সুর সাধন সরকার ) ২৪.আজি সপ্ত সাগর ওঠে উচ্চলিয়া-(সত্যেন সেন, সুর অজিত রায়) ২৫.আমরা তো সৈনিক শান্তির সৈনিক-(আখতার হোসেন- সুর- সেলিম রেজা) ২৬.উঠলোরে ঝড়- দিন বদলের পালা- (কথা-ওমর শেখ) ২৭.একুশ আসে জানাতে বিশ্বে- (লোকমান হোসেন জাকির )২৮.ও বাজান চল যাই চল-(কথা- জসিম উদ্দিন) ২৯.ওরে ভাইরে ভাই বাংলাদেশে বাঙালি আর নাই-(কথা আনিসুল হক চৌধুরী, সুর শেখ লুৎফর রহমান) ৩০.ও হে কাল চাঁদ- (কথা-রুহুল আমিন প্রামাণিক, সুর- আবদুল আজীজ বাচ্চু ) ৩১.ওরে মাঝি দে নৌকা- (কথা-শহীদ সাবের, সুর- শেখ লুৎফর রহমান ) ৩২.কারখানাতে খেত খামারে-(কথা- এনামুল হক, সুর- আলতাফ মাহমুদ ) ৩৩.কে কে যাবি আয়রে- (শিল্পী- ইন্দ্র মোহন রাজবংশী) ৩৪.ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙাতে-(কথা-বদরুল হাসান, সুর- আলতাফ মাহমুদ ) ৩৫.চলছে মিছিল চলবে মিছিল (কথা- দিলওয়ার, সুর- অজিত রায় ) ৩৬.জলপথ প্রান্তরে সাগরের বন্দরে (কথা-মুস্তাফিজুর রহমান, সুর- সমর দাশ) ৩৭.ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগদাসে (কথা-ফেরদৌস হোসেন ভুঁইয়া, সুর- সুখেন্দু চক্রবর্তী) ৩৮.তারা এ দেশের সবুজ ধানের শীষে (কথা- মো. মনিরুজ্জামান,সুর- সমর দাশ ) ৩৯.দূর হতে আসে ঐ মৃত্যুর পরোয়ানা (কথা-চিরঞ্জীব দাশ শর্মা সুর- সমর দাশ) ৪০.নিষ্ফল কভু হয় না এ ধারায় (নাজিম সেলিম বুলবুল- সুর -সমর দাশ) ৪১.প্রাণে পা্রণে মিল করে দাও (স্বাধীন দাশ গুপ্ত , সুর -সমর দাশ) ৪২.ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য (সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুর-শেখ লুৎফর রহমান) ৪৩.মিলিত প্রাাণের কলরবে- (কথা-হাসান হাফিজুর রহমান, সুর- শেখ লুৎফর রহমান ) ৪৪.মানুষেরে ভালোবাসি ঐ মোর অপরাধ ( কথা-সত্যেন সেন ) ৪৫.মাগো তোমার সোনার মানিক ( রাহাত খান, সুর-সুখেন্দু চক্রবর্তী ) ৪৬.যায় যদি যাক প্রাণ ( কথা-আবু হেনা মোস্তফা কামাল) ৪৭.লাঞ্ছিত নিপীড়িত জনতার জয় (কথা-মতলুব আলী, সুর- শেখ লুৎফর রহমান ) ৪৮.স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে (কথা-আখতার হোসেন, সুর- অজিত রায়) ৪৯. মাগো ভাবনা কেনো আমার তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে (কথা- গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, সুর- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়) এ গানগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে গান সম্পৃক্ত অনেকেরই স্মৃতিকাতর ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ- নজরুল আমাদের গানের জগতের দুই দিকপাল। তাঁদের অনেক গান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রেরণা ছিলো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্দীপ্ত এসব গান শিল্পীরা কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের‘ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ ,‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ ও ‘দেশে দেশে ভ্রমি ’এ তিনটি গান ছাড়াও যে সব প্রচারিত হতো সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- ১.বাঁধ ভেঙ্গে দাও বাঁধ ভেঙ্গে দাও ২.আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি ৩.নাই নাই ভয় , হবে হবে জয় ৪.যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক অমি তোমায় ছাড়বো না মা ৫.আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে ৬.যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে ৭.বাংলার মাটি, বাংলার জল ৮.সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরে অপমান ৯. এবার মরা গাঙে বান এসেছের ১০. আমি ভয় করবো না ভয় করবো না সহ আরো অনেক গান। নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ও এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী’ গান দুটো ছাড়াও আরো যে সব গান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে প্রচারিত হতো সেগুলের মধ্যে উল্লেযোগ্য-১.এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল ২.ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি ৩.চল চল চল উর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল ৪.তোরা সব জয়ধ্বনি কর ৫.জাগো অনশন বন্দী ওঠো যতো ৬.জাগো নারী জাগো বহ্নি শিখা ৭.আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ৮.মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম ৯.র্দুগমগিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার সহ আরো অনেক গান। একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত এসব গান কোন পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা উপস্থাপনা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐ সময়ে বিভিন্ন গীতিকার , সুরকার এবং শিল্পীরা নানা ভাবে নিজেদের রচিত গান সুর করে গেয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছেন। তাঁরা সকলেই আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র এবং ইতিহাসের গৌরবময় অংশীদার। তথ্যের অভাবে হয়তো সে সব গান আমাদের অন্তরালেই রয়ে গেছে। দেশে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়া অনেক শিল্পী রয়েছেন। তাঁরা সকলেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী। ‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে কিংবদন্তী শিল্পী আপেল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘বিক্ষুব্ধ বাংলা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা থেকে শব্দসৈনিক হয়েছিলাম। এর পর নানা আয়োজনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলাম গান। গোবিন্দ হালদারের লেখা ও নিজের সুরারোপিত ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’সহ দলীয়ভাবে গেয়েছি ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’, ‘নোঙর তোলো তোলো’ প্রভৃতি গান। মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে গানই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি।’ গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় একেকটি গান একেকটি অস্ত্রের মতো কাজ করেছে। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি বঙ্গবন্ধুর বলা জয় বাংলাটাই ছিল আমার গানের শুরুর শব্দদ্বয়।’ শিল্পী তিমির নন্দীর ভাষায়, ‘মুক্তিযুদ্ধের অনেক গান আছে, যা আজকাল শোনা যায় না। সরকারি অথবা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কিংবা অ্যালবাম প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের গানগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে আগামী প্রজন্ম তা শোনার পাশাপাশি যুদ্ধের ইতিহাসটা ভালোভাবে জানার সুযোগ পাবে। আমরা একদিন থাকব না। তখন আমাদের গানগুলো নতুনরা গাইবে এটুকু প্রত্যাশা করতেই পারি।’ সংগীতজ্ঞ সুজেয় শ্যাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রধান অস্ত্র ছিল সংগীত। গানে গানে আমরা সাহস জুগিয়েছি, স্বপ্ন বুনেছি স্বাধীন দেশের। এজন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালকসহ সবাই দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।’ একাত্তরে শুধু যে বাঙালি শিল্পীরাই যে মুক্তিযুদ্ধের সময় গান গেয়ে এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত বা সাহস যুগিয়েছেন তা নয়, এগিয়ে এসেছিলেন বদেশিঅনেক শিল্পীও। তাঁদের মধ্যে জর্জ হ্যারিসন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, জোয়ান বায়েজসহ অনেকের নাম উল্লেখযোগ্য। লাখো লাখো মানুষের সমাবেশে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আরেক গৌরবজনক অধ্যায়। ইতিহাস তার অনন্য সাক্ষী। বাঙালি হিসেবে আমরা এই বদেশিগুণী শিল্পীদের কাছে চিরঋণী। গান চিরকালই মানুষের কাছে প্রিয় একটি বিষয়। আর আমাদের বাংলা গানতো আমাদের শিল্প সাহিত্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে দেশপ্রেমের চেতনায় যে সব গান রচিত হয়েছিলো সেগুলো এখনো আমাদের কাছে সমান জনপ্রিয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ গানগুলো এখনো গাওয়া হয় এবং নতুন প্রজম্ম এ গান গেয়ে কিংবা শুনে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য কে ভালোবাসতে শেখে। এ গানগুলো কখনো হারিয়ে যেতে পারে না। গানগুলো চির যৌবনেরই প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের এই প্রেরণাদীপ্ত গান ইতিহাসেরই অংশ।
লেখক : প্রাবন্ধিক

x