মায়াবী পাহাড়ের স্বর্গরাজ্যে

ড. আনোয়ারা আলম

সোমবার , ৭ জানুয়ারি, ২০১৯ at ২:৫৫ পূর্বাহ্ণ
52

“ওগো প্রসাদের শিখরে আজিকে
কে দিয়েছ কেশ এলায়ে-
কবরী এলায়ে-
ওগো নবঘন নীলবাস খানি
বুকের উপর কেলয়েছ টানি।”
– রবি ঠাকুর।
দিল্লী থেকে শ্রীনগর আকাশ পথে ভ্রমণ সময় প্রায় এক ঘণ্টা। যথারীতি নিয়তির মতো। বিমানের পাখায় নির্ধারিত আসরে, যেহেতু জানালার পাশে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেই মেঘের ভুবনে। ঘোর লাগা তন্ময়ের মাঝে কানে এল সুকন্ঠি বিমানবালার ঘোষণা “হিন্দী ও ইংরেজিতে”, প্রায় কাছাকাছি। আমরা হঠাৎ ঝুপ করে সামনে কেবলি সবুজ পাহাড় নাকি পর্বতমালা। নানা আকৃতির ছোট বড়ো মাঝারি বলা যায় চারিদিকে- কিন্তু দৃষ্টির সীমারেখা থেকে মেঘ সরছেনা কেন? ডাক্তার বললেন “মেঘ না পানি”- মনে হয় এ যেন মেঘের ভেলায় সারিবদ্ধ পাহাড়ের মালা- বিমানের গতি কমছে- পাহাড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে নামছি ধীরে ধীরে। অতঃপর নানা রঙের ফুলের সমারোহে সজ্জিত এক বাগানে। নাকি স্বর্গ রাজ্যে।
পাহাড়ের ভাজে ভাজে ওঠা অনন্য শ্রীনগর। ভারতের জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের বিমানবন্দর। ঘিরে আছে নিরাপত্তা বাহিনীর লোক- হাতে ভারী অস্ত্র। ভেতরটা ছিমছাম, অল্প পরিসরেও পরিচ্ছন্ন- প্রযুক্তিগত জৌলুস নেই তেমন। পীরপান্‌জাল পর্বতমালা ভারতের সমতল থেকে এ শহরকে প্রায় আলাদা করে রেখেছে। প্রায় ১৯,৭০০ বর্গমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠেছে। বিমানবন্দরের দীর্ঘ আস্ফালেটর রানওয়ে।
লাগেজের অপেক্ষার মাঝে ছুটে এলেন মাঝবয়সী এক কাশ্মিরী টকটকে গায়ের রঙ, ধারালো চেহারা। ক্ষিপ্রগতিতে ট্রলীতে আমাদের লাগেজ নিয়ে সোজা ইমিগ্রেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের কাছে। তেমন সময় লাগলোনা বরং ব্যবহার বেশ আন্তরিক। বাইরে অপেক্ষারত ‘দি রয়েল কেরিটেজ’ হোটেলের গাড়ি। প্ল্যাকার্ড হাতে গাড়ি চালক। গাড়ির দিকে যেতেই হঠাৎ একটা আহ্বান “বাংলাদেশ”-] বাইরের বারান্দায় নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন। যেতে হলো ওদিকে, সাথে চালককেও। খড় খড়ে চেহারা দৃষ্টি ও অপ্রসন। আমাদের কিছু প্রশ্ন গাড়ি চালকের সাথে বেশ খানিক সময় নিয়ে কাশ্মিরী ভাষায় নানা প্রশ্ন। বুঝে নিতে হল- তথ্যের অনুসন্ধান। মনটাতে জমে ওঠে বেদনাবোধ। বাংলাদেশ জেনেই বয়সী হওয়া সত্ত্বেও এতো প্রশ্ন বা জবাবদিহি। অন্যসব যাত্রীরা ইতোমধ্যে গন্তব্য স্থলের দিকে- শুধু আমরা?
গাড়িতে বসার সাথে ফোন সজীবের কাশ্মিরী বন্ধু ডাঃ রমিজ। কন্ঠস্বরের আন্তরিকতা ও বিনয়ে মনে জমে ওঠা মেঘ কেটে প্রশান্তির আমেজ। গাড়িচালক বনাম গাইড-নাম রফিক। হিন্দীও ইংরেজি ভাষায় বেশ দখল আছে-বাংলা হালকা, তবে বোঝেন আলাপচারিতায় তার ভেতরের কষ্টটা বোঝা যায়। হোটেলের পথে দু’পাশে সবুজের ছোঁয়া। নাম না জানা নানা রঙের ফুল, রাস্তা প্রশস্ত মসৃণ-যানজট বা ধোঁয়া নেই। ঘর বাড়ি গুলোর ডিজাইন একটু ভিন্ন প্রকৃতির। অনেকটা বাংলো প্যাটার্ণার ছাদ, টিন বা কাঠের। কারণ ও জেনেছি পরে।
প্রায় দু’ঘন্টার পথ শেষে যেখানে মনে হলো হোটেল পাড়া’- চারিদিকে সুদৃশ্য ভবনের হোটেল আর হোটেল। হোটেলের মালকিন- অভ্যর্থনায়- সুন্দরী কাশ্মিরী তরুণী। বাহ! এযেন সুন্দরের রাষ্ট্রে নারী ও পুরুষ প্রায় সবাই। মালকিনের জিজ্ঞাসা ‘এতো দেরি কেন? অতএব ‘বাংলাদেশ পর্ব শুনে গভীর দীর্ঘশ্বাসে-“ইয়ে হ্যায় কাশ্মির। হামলোগ মুসলমান হ্যায়না।” সেই মুহূর্ত থেকে যে কয়দিন ছিলাম কেবলি মনে হতো।-“এখানকার লোকজনের ভেতরটা অদৃশ্য বিষন্নতার চাদরে ডাকা।”
হোটেলটা থ্রি স্টার, রিজার্ভড রুমের নান্দনিক সাজ সজ্জা আকর্ষণীয়। তবে কিছুটা থিতু হতেই-হৈ হৈ করে এলেন এক কাশ্মিরী তরুণ-জিশান, বাংলাদেশের ঢাকায় এক বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্র ঈদের ছুটিতে দেশে, ডাঃ রমিজের ছোট ভাই বাংলা বলেন চমৎকার। আমাদের প্রায় জোরকরে নিয়ে গেলেন ডিলাঙ রুমে। আবারো সিম সমস্যা। কলকাতার সিম এখানে অচল। বলা যায় কাশ্মিরের সাথে মোবাইল নেটওয়ার্ক-ভারতের অন্য কোন অঞ্চলের সাথে নেই। কারণ? সেই একই বাক্য জিশানের “ইয়ে হ্যায় কাশ্মির”। জিশান ওর বন্ধুর একটা সিম ভরে দিলেন ডাক্তারের মোবাইলে-কলকাতার হোটেলে চার্জার ফেলে এসেছি, নিয়ে এলেন আরেকটি চার্জার। আবারো ফোনে ডাক্তার রমিজ-“সন্ধ্যায় কোথাও ঘুরে আসেন। হোটেলে বসে থাকা মানে সময়ের অপচয়।”- কিভাবে বলি ‘শরীর চলে না- মন চাইলেও হয়ে ওঠেনা’- তখনি কে যেন কানে কানে বলে যায়- ‘ভ্রমণেরও বয়স আছে-সেখানেরও তারুণ্যের জয়গান”। আমরাতো বেলা শেষের পথিক – তবুও মনের জোরে ‘প্রাচ্যের ভেনিসে’।
স্থানীয় ভাষায় কাশ্মিরকে বলা হয় ‘কাশীর’। মনোরম প্রাকৃতিক আবহাওয়ার কারণে যুগে যুগে সেখানে এসেছেন কবি ও সাহিত্যিক- এবং সাধুরাও। প্রথম এক শতক আগে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ শাসকের আসা যাওয়া। জানাগেল-গুগলের সূত্রে জনান্ত্তিকা নামের এক দূতের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা সম্রাট অশোক এখানে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারে ‘মনোযোগী হলেও তাঁর মৃত্যুর পরে বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা ব্রাহ্মণ আবাদূতের কাছে ধর্মীয় তর্কে হেরে যায়-শুরু হয় শিব ধর্মের প্রচার। পরবর্তীতে বিভিন্ন সুফী ও পীরের আগমনে ইসলাম ধর্মের প্রসার। তবে ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী ইসলাম ধর্ম এখানে এসেছে মধ্য এশিয়া হয়ে আরব থেকে। এখানকার বিভিন্ন পর্যটণ কেন্দ্র বা স্থাপত্য গড়ে উঠেছে মোগল শাসনামলে। শাসক হিসেবে মোগল, আফগান-শিখের পরে ১৮৪৫ সাল থেকে ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানীর দখলে। ১৯৪৭ সালের পরে জেনেছি কাশ্মির নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব ও লড়াই এবং ১৯৪৮ সালে অস্ত্র বিরতি চুক্তি। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির মাধ্যমে আপাত সমাধান। যদিও জস্মু ও কাশ্মিরের জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনের নামে নানা সময়ে সংঘর্ষ সংঘাত। সে কারণেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর নানা রকম নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে তেমন কোন শিল্প কারখানা চোখে পড়েনি। রফিক বলছিলেন-‘ভারত সরকার নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনীদের ব্যয় বহনেই আগ্রহী বেশি যে কারণে অন্য কোন স্থাপনা তেমন নেই। সাধারণ জনগণের মধ্যে যারা শিক্ষিত, তাদের ভেতরে এক চাপা ক্ষোভ ও বিষন্নতা। হয়েতো বা এখনো অনেকের প্রত্যাশা “হক হামারা আজাদি, সিনকে লেংঙ্গে আজাদি।” বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালার পশ্চিম অংশ, কাশ্মির হয়ে আফগানিস্থান ছুঁয়েছে। এখানকার তথা ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির ভ্যালীতে শতকরা পঁচানব্বই জন, জম্মুতে শতকরা ত্রিশ এবং লাদাখে শতকরা ছেচল্লিশ ভাগ মুসলিম। কাশ্মির ভ্রমণের সুন্দর সময় “মার্চ থেকে অক্টোবর”-তথা রোমাঞ্চকর সময় ‘বসন্তকাল’-যখন শুরু হয় টিউলিপ ফেষ্টিভ্যাল। জুন-জুলাই তথা আপেল সময়ে-‘ফুল ও ফলের সমারোহ’। কাশ্মিরের লেকের ভাসমান বাজারগুলো তখন ‘ফুল ও ফলের’ সমন্বয়ে একেবারে রঙিন হয়ে ওঠে।
লেখক : সাহিত্যিক; সাবেক অধ্যক্ষ, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ

x