মাহবুব উল আলম চৌধুরী : তাঁরে কি ভুলিতে পারি

অধ্যাপক শফি আহমেদ

বৃহস্পতিবার , ৭ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
30

মাহবুব উল আলম চৌধুরী তাঁর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার পূর্ব পর্যন্ত বার বার আমাদের চিনিয়ে দিয়েছেন, কারা আমাদের শত্রু, কীভাবে তারা এই সমাজটাকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করছে। তাঁর সারাটা জীবনই বলতে গেলে এই সংগ্রাহের কাহিনী। আমাদের মধ্যে অনেকেই যাঁরা তাঁকে সত্যি ভালবাসেন, সত্যিই শ্রদ্ধা করেন, তাঁরা সবাই নিশ্চিতভাবে, সঙ্গত কারণেই মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে ভাষাসৈনিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন, একুশের প্রথম কবিতার জনক হিসেবে তাঁকে সবিনয়ে স্মরণ করেন। তাঁরা এর দ্বারা এই মহান সংগ্রামীকে কিছুটা সীমায়িত করে ফেলেন বলে আমার মনে হয়। মাহবুব ভাই নিজেও একথা কয়েকবার কৌতুক করে বলেছেন। কিন্তু আক্ষরিক বিচারে তা কৌতুক নয়, সত্যিই তাঁর এই মূল্যায়ন খণ্ডিত। একথা সত্যি, আজ থেকে ৬৭ বছরেরও বেশি আগে লেখা, ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা এখনও আমাদের গভীরভাবে উদ্দীপ্ত করে, একুশের ইতিহাসটাকে আমাদের মনের সম্মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু তিনি তো ছিলেন অনেক কিছু। সেইসব দিক নিয়ে আমরা যদি আলোচনা করি, তাঁর অন্যতর ভূমিকার দ্বারা যদি নিজেদের উজ্জীবিত না করি, তা হলে যেমন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পূর্ণাঙ্গ হয় না, তেমনি কালিক পরিচয়টাও আড়ালে পড়ে যায়।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর সামগ্রিক বিচার করতে গিয়ে আমার মাথার মধ্যে কতগুলো মূল বিষয়কে তালিকাভুক্ত করতে প্ররোচিত বোধ করি। প্রথমত, তিনি এদেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছেন এবং তা তিনি চেয়েছেন শুধু সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে নয়, তিনি জনমানুষের সংগঠন গড়ে তোলার ও তাদের একতাবদ্ধ করার সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। তরুণ বয়সেই তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকেই জড়িত করেন। আজকের তরুণ ও সাধারণ মানুষ ঠিক অনুধাবনও করতে পারবেন না যে, গত শতকের চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে বামপন্থী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ কত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। একথাও স্মরণ করা দরকার যে, সেকালের যাঁরা প্রগতিবাদী মানুষ ছিলেন, যারা রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখতে চাইতেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষেই এক সুগভীর দায়বদ্ধতা থেকে এই মতবাদের বাস্তবায়নে বিশ্বাস করতেন। মাহবুব উল আলম চৌধুরী তাঁর আশেপাশে এমন অনেক নিবেদিত প্রাণ কর্মীকে দেখতে পেয়েছিলেন। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বা রফিউদ্দিন সিদ্দীকি এঁরা যে প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন ছিলেন তা নয়, তবে তাঁরা উদার দৃষ্টিভঙ্গির সমাজভাবনা দিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করেছিলেন। এঁরা ছাড়া মাহবুব উল আলম চৌধুরী অন্য যাঁদের সান্নিধ্যে নিজেকে বিকশিত করে তুলেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ, কল্পনা দত্ত প্রমুখ।
১৯৪৭ এর দেশভাগ ঘটেছিল যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে, তা আদর্শগতভাবে মেনে নিতে পারেননি উল আলম চৌধুরী ও তাঁর সাথীরা। সমকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপণ ও সাম্রাজ্যবাদের নব বিস্তার তাঁদের মধ্যে এক প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন সমাজটাকে ভিন্ন পথে চালনা করার জন্য তৎকালের শাসকবর্গ নানান পাঁয়তারা করছেন, দেশকে সামপ্রদায়িকতার কলুষে কলঙ্কিত করার একটা চক্রান্ত চলতে থাকে। প্রগতিশীল একটা পথ ঠিক করলেন। বন্ধুদের নিয়ে, প্রগতিমনা সাহিত্যিকদের নিয়ে তিনি ‘সীমান্ত’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে উদ্যোগী হলেন। তাঁর অসামপ্রদায়িক উদার দৃষ্টিভঙ্গি তিনি আমৃত্যু লালন করে গেছেন এই মহতী উদ্যোগ সম্পর্কে তাঁর নিজের ভাষ্যটাই আংশিকভাবে উদ্ধৃত করতে চাই।
১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে বের করি ‘সীমান্ত’- একটি প্রতিবাদী মাসিক পত্রিকা। আমরা যারা, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে দুনিয়া জুড়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়িত করার সংগ্রামে জনগণকে সামনে নিয়ে এসেছি, সামপ্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে দলকে মুক্ত করার সংগ্রাম করেছি, শিল্প-সাহিত্যকে জনগণের কাছে এনে তাদের রুটি-রুজির অধিকারকে সুনিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি, বাম চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রে কাজ করেছি তারা দেশকে এই পশ্চাৎপদতার দিকে ঠেলে দেয়াকে কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারিনি। মুক্তির পথ কোথায়, এর সন্ধানে আমরা ‘সীমান্ত’ কে সামনে নিয়ে এলাম। অসামপ্রদায়িক মানবতাবাদী সংস্কৃতির চর্চা, জাতীয় প্রগতি, বিশ্বশান্তি, শিল্পী-সাহিত্যিকের সৃষ্টি ক্ষমতাকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করা, বাংলা সাহিত্যের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে মূলধারায় এগিয়ে যাওয়া নিয়ে যাওয়া, সবরকম বিকৃতি, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা এবং জাতি ধর্ম বর্ণ ও সমপ্রদায়গত বিভেদের বিরুদ্ধে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই আদর্শকে উচ্চে তুলে সৃষ্টিশীল সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করাই ছিল। ‘সীমান্ত’ এর মূল উদ্দেশ্য।”
ইদানীং উন্নয়ন সাহিত্য বা Development literature বলে আমরা যে একটা অপ্রথাগত অথচ বহুল চর্চিত প্রায় আবশ্যিক ধারা সৃষ্টি করেছি, তার অনুসরণে বলা যায় ওপরের ওই উদ্বৃতিটি ছিল ‘সীমান্ত’ পত্রিকার অথবা মাহবুব উল আলম চৌধুরীর জীবনের ও কর্মের Mission statement যদি শুধু এই সম্পাদকীয় বিবৃতিতে একটু ভেঙে বোঝার চেষ্টা করি, তা হলেই নিজের জন্য এবং সমাজের জন্য তিনি কোন ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, তার একটি সার্বিক ও পরিচ্ছন্ন ধারণা পাওয়া যায়। বোঝা যায়, তিনি সমকালের মূল সমস্যাগুলিকে অনুধাবন করতে পেরেছেন। তাঁর সঙ্গীরা সব পরীক্ষিত বন্ধু, যারা অন্যায়ের প্রতিবাদে আপসহীন। তিনি একদম স্পষ্ট করে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে সারা দুনিয়া জুড়ে, তার প্রতি সমর্থন ও তার সম্ভাবনায় এদেশের সমাজকে এগিয়ে নেবার কথা বলছেন। দেশ স্বাধীন (?) হয়েছে মাত্র তিন মাস আগে এবং মাহবুব উল আলম চৌধুরী ওই দেশবিভাগের মধ্যে ভাঁওতা ও শূন্যতার বিষয় শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।
তিনি বুঝেছিলেন, এই দেশ বিভাগ দেশকে সামপ্রদায়িকতার অভিশাপে জর্জরিত করেছে এবং করবে, তাই একটা সাংস্কৃতিক মঞ্চ দরকার, যা দেশের বা সমাজের অসামপ্রদায়িক চরিত্রকে অক্ষুন্ন রাখবে, ভাতৃহত্যার পাপ থেকে রক্ষা করবে। ওই মঞ্চেরই এক সোচ্চার প্রকাশনা- ‘সীমান্ত। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন একাগ্রভাবে। তাই বুঝেছিলেন, যে শিল্প-সাহিত্য শুধু অভিজাত ব্যক্তিবর্গের আলোচনা বা উচ্চ শিক্ষালয়ের গবেষণার বিষয়, তা কোনোদিন জনগণের স্বার্থের সপক্ষে কাজ করতে পারে না। তিনি শিল্প-সাহিত্যকে জনমানুষের কাছাকাছি আনতে চেয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ঐকতান’ কবিতায় কবির যে সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে আগামীদিনের কবির প্রত্যাশা করেছিলেন, ‘সীমান্ত’ পত্রিকার উদ্যোক্তা ও লেখকবৃন্দ সেই বাণীকে আত্মস্থ করেছিলেন। মাহবুব ভাইয়ের তরুণ কণ্ঠে এমনকি তাদের রুটি-রুজির অধিকারকে সুনিশ্চিত করার কতা বলেছেন। আর সর্বোপরি, তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, পাকিস্তানি শাসন ও সরকারি নীতির প্রবণতা সমাজটাকে পিছন থেকে টানছে, মানবতাবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিতে চায়। তার দ্বারা যা সত্যিই বিনাশের মুখোমুখি হয় তা হল আমাদের হাজার বছরের অসামপ্রদায়িক উদার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে সেই চর্যাপদ থেকে। বড়ু চন্ডীদাস, ভারতচন্দ্র, আবদুল হাকিম, লালন শাহ, হাসন রাজা, মীর মশাররফ হোসেন, বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত- আমরা সবাই এদের উত্তরাধিকারী। মনে পড়ে, ‘সীমান্ত’ প্রকাশনার বেশ কয়েক বছর পরে বদরুদ্দিন উমর সংস্কৃতির সংকট নামক গ্রন্থে এই সংকটের বিশ্লেষণ করেছিলেন। আজও বাংলাদেশের সমাজে ধর্মান্ধ সংস্কৃতির সপক্ষে কথা বলার লোকের অভাব নেই। সমাজে যে পচনশীলতা বিদ্যমান, এটা তারই সাক্ষ্য দেয়। আমৃত্যু মাহবুব উল আলম চৌধুরী এই শক্তির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। অতি সামপ্রতিককালে তাঁর লেখা কলামগুলোতে এ কথার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে। এই মানুষটি আর নেই। তাই নিজেদের কেবল নিঃস্ব ও নিঃসহায় মনে হয়।
লেখক : অধ্যাপক ও লেখক

x