মামলার তদন্তে পিআইবি, নতুন চার্জশিট কয়েক দিনের মধ্যে

ইউপি নির্বাচনকালীন কর্ণফুলীতে জোড়া খুন

শফিউল আজম, পটিয়া

শনিবার , ২৬ মে, ২০১৮ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ
387

২০১৬ সালের ২৮ মে চট্টগ্রামে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন চলাকালীন কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠানের ফকিরনীরহাট কেন্দ্রে দুটি খুনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় একজন মেম্বার প্রার্থী ও একজন রিকশা চালক গুলি ও রাম দায়ের এলোপাতাড়ি কোপে ঘটনাস্থলে নিহত হন। ওই ঘটনায় কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। হামলার ঘটনায় নিহত রিকশা চালক মো. হোসেনের স্ত্রী বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তাতে ১১ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। কর্ণফুলী থানা পুলিশ তদন্ত শেষে মামলা থেকে ৪ জনকে অব্যাহতি দিয়ে গত বছরের ১২ অক্টোবর আদালতে চার্জশিট দেয়। আদালত চার্জশিট গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।

এদিকে নিহত মেম্বার প্রার্থী মো. ইয়াছিনের স্ত্রী সাজু বেগম আদালতে আলাদাভাবে গত বছরের ৯ মে একটি আবেদন করেন। তাতে ওই ওয়ার্ডের মেম্বারসহ (বিগত নির্বাচনে নির্বাচিত) কয়েকজনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেন। আদালত আবেদন গ্রহণ করে তাও পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তাতেই মামলায় নতুন মোড় নেয়। ওই আবেদনকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়েছে কর্ণফুলী থানা আওয়ামী লীগের একাংশ।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ২৮ মে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে বড়উঠান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান দিদারুল আলমকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আরো দুই প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নেন। এদিকে নির্বাচন চলাকালে গুলি করে ও রাম দা দিয়ে কুপিয়ে ফকিরনীরহাট শাহমীরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখলের ঘটনায় এক মেম্বার প্রার্থী ও এক রিকশা চালক নিহত হন। ওই ঘটনায় কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। হামলার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় মোট ১১ জনকে এজাহার নামীয় এবং ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়।

কর্ণফুলী থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ হোসাইন তদন্ত শেষে গত বছরের ১২ অক্টোবর আদালতে চার্জশিট প্রদান করেন। তাতে মোট ৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মামলা তদন্তকালে তিনি একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করেননি। মামলা থাকার পরও এ মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ছিলেন। তবে আদালত চার্জশিট গ্রহণ না করে পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইয়ের এসআই কামরুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করছেন।

এদিকে নিহত মেম্বার প্রার্থীর স্ত্রী সাজু বেগম আদালতে আলাদাভাবে একটি আবেদন করেন। তিনি মামলার বাদী না হলেও নিহত দুজনের মধ্যে একজনের স্ত্রী হিসেবে গত বছরের ৫ মে আদালতে ওই আবেদন করেন। তাতে তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার সাক্ষী গ্রহণ ও ঘটনার দিন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ওই ওয়ার্ডে নির্বাচিত মেম্বার মোহাম্মদ ওসমান ও তার ছেলেসহ কয়েকজনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেন। আদালত তা তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। আবেদনে নিহত মেম্বার প্রার্থীর স্ত্রী সাজু বেগম ওয়ার্ড মেম্বার ওসমান, তার পুত্র কায়সার হামিদ ও গ্রেপ্তার হওয়ার বাহাদুরের নেতৃত্বে খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন।

তিনি জানান, তার স্বামীর পক্ষে তিনি ওই কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সুবাদে তিনি পুরো ঘটনা এবং কারা জড়িত তাও নিজে দেখেছেন বলে দাবি করেন। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন সাক্ষী মামলার তদন্তকারীর কাছে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন বলে জানা গেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের এসআই মোহাম্মদ কামরুল জানান, সাক্ষ্য গ্রহণ ও মামলার তদন্ত কাজ প্রায় শেষ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মামলার নতুন চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বাহাদুর খান ও ফারুকীকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে বাহাদুরকে গ্রেপ্তার করায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে।

এদিকে গত উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দিদার চেয়ারম্যানের সাথে মান্নানের সম্পর্ক ভালো হয়। পরবর্তীতে ৭ ইউপি সদস্য চেয়ারম্যানের বিভিন্ন দুর্নীতি বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের সম্পর্ক অবনতি হয় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান। ওই সময় বড়উঠান ইউপি নির্বাচনে কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন আব্দুল মান্নান খান প্রকাশ কাটা মান্নান। উপজেলা আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন বর্তমান চেয়ারম্যান দিদারুল আলম। কাঠা মান্নানকে নির্বাচনে বিজয় করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ। ১, ২ ও ৩ নং কেন্দ্র পটিয়ার আওতায় হওয়ায় দখল সম্ভব হয়নি এবং কাটা মান্নান নিজ কেন্দ্রে ৪২৫ ভোট পান। দিদার চেয়ারম্যান ওই কেন্দ্রে বিজয়ী হন। ৪, , ৬ ও ৭ নং কেন্দ্র কর্ণফুলী থানায় হওয়ায় কেন্দ্র দখল করেন। ৭ নং কেন্দ্রে ভোটের আগের দিন এক শিশু নিহতসহ কয়েকজন আহত হয়। নির্বাচনের দিন ৬ নং ওয়ার্ড ভোটকেন্দ্রে কাটা মান্নান গ্রুপের সাথে দফায় দফায় দিদার চেয়ারম্যান গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। এতে দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন।

ঘটনার পর দিন দিদারুল আলম চেয়ারম্যান স্থানীয় ইউপি সদস্য ওসমান গনিকে সাথে নিয়ে নিহত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান এবং জানাজায় উপস্থিত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। বড়উঠান ইউনিয়ন পরিষদ হতে বিভিন্ন দানঅনুদানসহ সুযোগ সুবিধা স্থানীয় ইউপি সদস্য দ্বারা প্রদান করেন। কর্ণফুলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ জামাল আহমেদ স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে নিহতদের পরিবারে ৬ মাস ধরে ৫ হাজার টাকা করে প্রদান করেন।

কর্ণফুলী আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, ঘটনার পর দিন নিহত ইব্রাহীমের স্ত্রী সাজু বেগম বাদী হয়ে কর্ণফুলী থানায় ১১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তকারী পুলিশ অফিসার এসআই হোসেন ১ নং আসামিসহ ৪ জনকে বাদ দিয়ে চার্জশিট প্রদান করলে আদালত আবার তদন্তের জন্য প্রেরণ করেন। এতে নিহত ইয়াছিনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ১ নং আসামি কাটা মান্নান দ্বারা প্ররোচিত হয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য ওসমান গনি ও তার ছেলেসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য ওসমান গনি জানান, ১ নং আসামি কাটা মান্নানকে মামলা হতে বাদ দেওয়ার জন্য মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি গ্রুপ। এ ঘটনার সাথে আমি ও আমার ছেলের বিন্দু মাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। আমি অপরাজনীতির স্বীকার।

x