মানবিক মানুষ চাই

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
34

২০১৩ সালে ত্বকী নামে নারায়নগঞ্জের এক মেধাবী ছেলেকে পিটিয়ে মেরে শীতলক্ষার পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। সে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিল না। এ লেভেল পরীক্ষার্থী ছিল, তার বাবা প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এছাড়া তিনি সাংস্কৃতিক কর্মী। ঠিক কি কারণে ত্বকীর মত একজন একেবারেই শান্ত ও সৃষ্টিশীল বালক ক্ষমতাধরদের মাথা ব্যথার কারণ হয়েছিল আজও জানা গেল না। ১৭ বছরের বালকটির মা বাবা বিচার চেয়ে চেয়ে এখন আর বিচার চায়না। সরকার ঐ ক্ষমতাধরদের বিচার করতে সক্ষম নয়।
আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, সামান্য একটা স্ট্যাটাসের কারণে যে দেশে একটা ছেলেকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে সেদেশে মানুষ কিভাবে বাস করে! আমরা দীর্ঘ সময় ধরে এভাবেই বাস করে আসছি। আমাদের বিচার ব্যবস্থা দুঃখজনকভাবে সরকারের কুক্ষিগত। সরকার না চাইলে কোন বিচারই সম্ভব নয়। প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে যে কেউ অপরাধ করেও পার পেতে পারে। এতে আমরা অভ্যস্ত হয়েছি। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অবাধ স্বাধীনতার কারণ কি?
ওরা জানে ওরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। দেশটা এখন ওদের। সরকার রক্ষার দায়িত্ব যেহেতু ওদের সেহেতু ওদের কাজকর্মের স্বাধীনতাও প্রচুর। ভারতের সাথে সম্প্রতি যে চুক্তিগুলো হয়েছে সেগুলো সবার কাছে যৌক্তিক মনে নাও হতে পারে। তাছাড়া ভারতের সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে আমাদের প্রাপ্য সুযোগ সুবিধার তুলনামূলক প্রশ্ন যে কোন নাগরিকের মাথায় আসতেই পারে। তাই বলে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে এ কেমন বর্বরতা! সরকারকে খুশী করার জন্য, জানানোর জন্য যে যত যা করেন আমরা আছি অতন্দ্র প্রহরী হয়ে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে সে দেশের ভবিষ্যত অন্ধকার। সরকারের সমালোচনা না থাকলে সেই সরকার তো স্বৈর শাসক হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক। পার্লামেন্ট নেই, বিরোধী দল নেই। কেউ কথা বললেই তার মুখ বন্ধ করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এটা তো হতে পারে না।
প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের আচার আচরনে মনে হয় তাঁরা প্রত্যেকেই ছাত্রলীগে নাম লিখিয়েছেন। তাঁরাও যেন ছাত্র লীগের কর্মী। সরকারের তোষামোদ পদ পদবী ঠিক রাখা ছাড়া যেন আর কোন কাজ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন প্রতিটি ছাত্র ছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। হলে হলে টর্চার সেল গড়ে তুলবে, প্রশাসন জেনেও কোন ব্যবস্থা নেবে না এটা কিভাবে মানা যায়? জনগণের টাকায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের সুযোগ সুবিধার কথা চিন্তা না করে শুধুমাত্র নিজেদের ভাগ্য গড়ার কাজে ব্যস্ত থাকলে এমন আরও বহু আবরার ফাহাদের এমনতর মৃত্যুর দায় নিয়ে বাঁচতে হবে মাননীয়দের। শিক্ষিত মেধাবী মানুষগুলো যখন ক্ষমতার কাছে নতজানু হয় তখন খুব হতাশ হয়ে পড়ি। জাতির বিবেক হয়ে কথা বলার মানুষগুলো কি ফুরিয়ে গেল ? আবরার ফাহাদ হত্যা ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশে যেভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, সমাজে অসহিষ্ণুতা ও নৃশংসতা যেভাবে বেড়ে চলেছে এটা তারই পরিণতি মাত্র। একথাটা মানতেই হয় দেশের সেরা ছাত্ররাই বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। তারা তাদের সেরাটাই দেশকে দেবে, পরিবারকে দেবে, সমাজকে দেবে এটাই মানুষের প্রত্যাশা থাকে, সেখানে যদি এমন প্রাণহীন নির্দয় প্রোডাক্ট তৈরি হয় তাহলে সেই সেরা আমাদের প্রয়োজন নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানবিক মানুষ তৈরির কাজে হাত দিক। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয় সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একই কথা প্রযোজ্য। নির্মমতায় ভরা সমাজ প্রতিদিন ক্লেদাক্ত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। ভিন্নমত বা সমালোচনা শুধু গণতন্ত্র নয় সভ্য সমাজের অপরিহার্য অংশ। আমরা যদি নিজেদের সভ্য বলে দাবি করি তাহলে অন্যের মত শুনতে হবে। কারো বক্তব্য যদি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে তবে যে কেউ আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।
সত্যিকারের রাজনীতি এখন আর নেই। রাজনীতি এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। ছাত্ররা রাজনীতি করে এখন শুধু ক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত লাভের জন্য। কোন আদর্শের জন্য নয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। যাদের কাছ থেকে রাজনীতির দীক্ষা নিয়েছিলাম তাঁরা আমাদেরকে রাজনীতির একটা স্বচ্ছ ধারণা দিয়েছিলেন। আমাদের দুচোখে সমাজ পরিবর্তনের রোমাঞ্চকর স্বপ্ন ভরে দিয়েছিলেন। আমাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। মানুষের কল্যাণের কথা বলেছেন। বড় বড় মনীষীদের জীবনাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করেছেন। প্রতিপক্ষের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ নয় সুস্থ প্রতিযোগিতার কথা বলেছেন, চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি তখনও স্পর্শ করেনি ছাত্র রাজনীতিকে। আশির দশকে রাজনীতির এতটা অধপতন হয়নি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র পরিষদের নির্বাচন হতো। তথাকথিত গণতন্ত্রের ধারা শুরু হওয়ার পর থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। গণতন্ত্রের চর্চা, নেতৃত্ব তৈরি, মেধা বিকাশ ও সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের দাবি দাওয়া সুবিধা অসুবিধা জানানোর সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র সংসদকে কেন এত ভয় আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর?
রাতারাতি সরকারের স্বভাব বদলে আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার করবে এটা বিশ্বাস করা কঠিন। এর আগে এমন কোন দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে নেই। তারপরেও খুনের বিচার হোক, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক এটা জনগণের দাবি ও প্রত্যাশা। দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি সারাদেশে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে তার অবসান হওয়া জরুরি। ছাত্র রাজনীতির নামে এই ঘৃণ্য তৎপরতা বন্ধ হোক।

x