মানবতার ডাকে শীতার্তদের পাশে

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
63

এখন জানুয়ারি মাস, বাংলা ঋতু পরিক্রমায় চলছে শীত কাল। শহুরে নাগরিক জীবনে শীত নিবারনে নানা অনুষঙ্গ আর নাগরিক কোলাহলের ভীড়ে শীতের কাঁপুনি টের পাওয়া একটু দুরুহই বটে। যদিও সন্ধ্যার মৃদুমন্দ ঠান্ডা হাওয়া, মাঝরাতে শীতের একটুখানি কাঁপুনি আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা ভোর আমাদের জানান দিয়ে যায়, শহরতলি আর গ্রামে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে শীত আছে প্রবল বেগে!
প্রতি বছর প্রকৃতি’র স্বাভাবিক নিয়মে যখন শীত আসে, তখন আমরা শুনি শীতার্ত মানুষ, শৈত্যপ্রবাহ সহ বিভিন্ন শব্দগুচ্ছ। তখন আমাদের অনেকেরই মনে হয়, গরীব-অসহায় মানুষগুলোর জন্য কিছু করি, আর এই ভাবনা ভাবতে ভাবতেই প্রতিদিন আমরা শীতের গরম কাপড় জড়িয়ে বাসা থেকে বের হই আর বাসায় ফিরি, এভাবে একটা সময় আমাদের ভাবনাকে ভাবনার জায়গায় রেখে একটা সময় আবার শীত চলেও যায়। কিন্তু, কাঁপিয়ে আর নাড়িয়ে দিয়ে যায় দেশের অসহায় ও দুঃখি মানুষগুলোকে। যৎসামান্য সাহায্য ও গরম কাপড় হয়তো ঘর নাই চালা নাই এমন অনেকে পায়, কিন্তু সকলেই কী পায়?
আমরা কী একবারও নিজেকে কল্পনায় ভেবে দেখেছি (যদিও এমন কখনোই কারও সাথে এমনকি কোন শত্রুর সাথেও যেন না হয়), যদি এমন হতো কনকনে শীতের খোলা আকাশের নিচে আমি আপনি আর আমাদের প্রিয় পরিবার! ভাবতে পারেন, গায়ে পাতলা জামা জড়িয়ে আমাদের প্রিয় হাসিমুখগুলো কোনমতে শুয়ে আছে রাস্তায়, ক্ষণে ক্ষণে ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে উঠছে বৃদ্ধ বাবা-মা, প্রিয় সন্তান! পাশে কুকুর বিড়ালের আনাগোনা! না, এমন ভাবনা বা দিন আমাদের জীবনে কখনোই না আসুক। কিন্তু, এমন অসহায়ত্ব আর করুন দশা যাদের, পথের যে শিশু আমার আপনার সন্তানের সমবয়সী, ফুটপাতের যে বৃদ্ধ আর বৃদ্ধা আমাদের প্রিয় মা-বাবা’র বয়সী, তাঁদের জন্য কী আমাদের কিছুই করণীয় নেই? বলা হয়, প্রাণ আছে এমন সব প্রাণী শ্রম দিয়েই পৃথিবীতে বেঁচে থাকে, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকা শুধু শ্রম বিলিয়ে নয়, নিজেকে বিভিন্নভাবে বিকশিত করেই আমাদের বাঁচতে হয়। আর ‘মানুষ’ হওয়ার সাধনায় নিজেকে বিকশিত করতে হয় মানবিক গুণাবলি অর্জনের মধ্য দিয়ে। ইদানিংকার আমরা অনেকেই ফেসবুক আর ব্যাক্তি আড্ডায় ভালো ভালো কথা আর মানবিকতার ফুলঝুঁড়ি ঝরাই। কিন্তু, দিনের শেষে ব্যস্ততার অজুহাতে মানবিক কাজগুলোকে অনেকেই এড়িয়ে যায়। যদিও সকলেই এরকম মানবিক কাজকে এড়িয়ে যায় না।
আমাদের ফেসবুক/সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি নিয়ে অনেকেরই নানা করুন ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাতে ভালো কাজও হচ্ছে নিয়মিত, যা আশা জাগানিয়া। বিগত বছরকয়েক আগে এসএসসি ’৯৫-এইচএসসি ’৯৭ ব্যাচের কিছু উদ্যমী আর চৌকস বন্ধুদের উদ্যোগে পুরনো হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের আবারও খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্‌ক্ষায় আর বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার মানসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তৈরী করা হয় এসএসসি-এইচএসসি ’৯৫-’৯৭ গ্রুপ। যা আজ প্রায় ১৩০০০ জনের অধিক সদস্যের বিশাল এক পরিবার। ভাবতে ভালোই লাগে তাঁদের এই বন্ধন ফেসবুকে নিজেদের গন্ডি ছাড়িয়ে এখন বিভিন্ন মানবিক কাজেও অগ্রগামী। আর তাইতো মানবিকতা আর সহমর্মিতার বোধ নিয়ে ব্যাচ ৯৫-৯৭’র বন্ধুরা অন্য অনেকের মতোই এগিয়ে এসেছে গরীব শীতার্তদের পাশে। তাঁদের এই মহতী উদ্যোগ সম্পর্কে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের গরীব শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরনের উদ্দেশ্যে তাঁরা অনেকদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর অংশ হিসেবে তাঁরা শুধুমাত্র তাঁদের প্রবাসী বন্ধুদের কাছ থেকে নগদ টাকা নিয়েছে যা দিয়ে তাঁরা এখান থেকে শীত বস্ত্র কিনেছেন আর দেশে অবস্থানরত বন্ধুদের কাছ থেকে সরাসরি কম্বল কিংবা শীতের পোষাক নিয়েছেন। সব মিলিয়ে তাঁরা প্রায় ৪০০০ পিসের অধিক কম্বল ও বাচ্চাদের জন্য বেশ কিছু শীতের পোষাক কিনেছেন। তাঁদের নিজ খরচে তাঁরা শীতবস্ত্রগুলো জানুয়ারি মাসের ১১-১২ তারিখ নীলফামারী’র ডিমলা, রংপুরের ভুরুঙ্গামারি, মিঠাপুকুর সাঁওতাল পল্লী, জুম্মাপাড়া, গঙ্গাছড়া সহ কুড়িগ্রামের বেশ কিছু জায়গায় বিতরন করবেন। যদিও তাঁরা সকলে মিলেই এই কাজকে এগিয়ে নিয়েছেন, তবুও তাঁদের এই উদ্যোগের যিনি মূল কারিগর তিনি তাঁদের বন্ধু জামান এম. ডি. এম। আর তাঁর এই চাওয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস কাজ করে গেছেন বন্ধু মহসিন, আব্দুল বাসির, হোসনা ফেরদৌস সুমি, ফারজানা মালিক নিম্মি, হাজী চান্দু মিয়া, ইকবাল হাসান চৌধুরী, মইনুল হোসেন তপু, সর্দার ফারুক ফয়সাল, তানিম, মাসুম হোসেন চৌধুরী, রেজোয়ানুল আলম, নাজমুল হক, ফয়সাল চৌধুরী, ওয়াসিম আহমেদ সহ নাম উল্লেখ না হওয়া এমন অসংখ্য বন্ধু।
৯৫-৯৭ ব্যাচের এরকম মানবিক উদ্যোগ আমাদের গর্বিত ও আশাবাদী করে। আমাদের আশা, এমন মানবিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে যাবে সবার মাঝে। পরিশেষে, এর সাথে সম্পৃক্ত সকলকেই ভালোবাসা আর অশেষ কৃতজ্ঞতা।

x