মাদকের আখড়া থেকে এখন চোরাই পণ্য কেনা বেচার আস্তানা

চট্টগ্রাম রেল স্টেশন

ঋত্বিক নয়ন

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩০ পূর্বাহ্ণ
221

চট্টগ্রাম রেল স্টেশন কেন্দ্রিক মাদকের আস্তানা ধ্বংস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী। বছর না যেতেই সেই রেল স্টেশনকে কেন্দ্র করে নতুন করে ভাবনায় পড়েছে তারা। মাদক কারবারীরা এলাকা ছাড়ার পর এখন রেল স্টেশন এলাকা হয়ে উঠেছে চোরাই পণ্য কেনা বেচার নিরাপদ আখড়া। গত এক মাসে নগরীতে ছিনতাই ও চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত চোর ও ছিনতাইকারীরা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, পুরি বা ছিনতাইয়ের পর চোরাই পণ্য বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী বিক্রির যাবতীয় লেনদেন চলে রেল স্টেশন এলাকায়।
কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন আজাদীকে বলেন, রেল স্টেশন এলাকায় আমাদের থানার সার্বক্ষণিক একটি টিম মোতায়েন থাকে। এছাড়া সিভিলেও একটি টিম দায়িত্ব পালন করে। একের পর এক চোর ছিনতাইকারীরা যে ধরা পড়ছে, তাতেই আমাদের তৎপরতা প্রমাণিত হয়। কিন্তু সমস্যা হলো জামিনে এসে তারা একই কায়দায় পুরনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান আজাদীকে জানান, স্টেশন এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িতদের পাওয়া মাত্র আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। টিকিট কালোবাজারিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে মাদকসহ বহনকারীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। স্টেশনে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, এ এলাকায় অধিকাংশ মানুষ ভাসমান। বাইরে থেকে এসে কিছুক্ষণ অবস্থান করে সটকে পড়লে অনেক সময় আমরা তাদের নাগাল পাই না। তাই বলে অপরাধপ্রবণ এলাকা বলা যাবে না। গত ২৭ অক্টোবর কোতোয়ালী থানা পুলিশ সুজন ও শ্যামল নামে দুই ছিনতাইকারীকে স্টেশন রোড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃতরা আগের দিন বিপন দাশ (১৬) নামে এক শিক্ষার্থী থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা ছিনতাইয়ের পর মোবাইল ফোন বিক্রি করে স্টেশন এলাকায়। পুরাতন রেল স্টেশন থেকে নতুন রেল স্টেশনের প্রবেশপথ পর্যন্ত ফুটপাতে বেচাকেনা চলে ছিনতাইয়ের পণ্য। মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ থেকে শুরু করে ইলেক্ট্রনিকসের নানা জিনিসপত্র বিক্রি হয় একেবারে কম দামে। সেখানে ১০ হাজার টাকায় পাওয়া যায় আইফোন! অ্যান্ড্রয়েড মিলে দুই থেকে তিন হাজারের মধ্যেও! এসব মালামাল কোথা থেকে আসে জানতে চাইলে শ্যামল বলে, বিভিন্ন এলাকায় চুরি-ছিনতাই হওয়া মালামাল জমা হয় এ মার্কেটে। ফলে কম দামে বিক্রি করে দেয়া হয়। এতে ঝামেলা কেমন জানতে চাইলে সে জানায়, কারো দামি কোনো জিনিস চুরি-ছিনতাই হলে স্টেশন রোডে এসে খোঁজ নেয়। পাওয়া গেলে ঝামেলা হয়। মাঝে-মধ্যে পুলিশও ঝামেলা করে।
স্টেশন এলাকায় ভাসমান এমন কয়েকজন বিক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, চোরাই মার্কেটের সব পণ্যই চুরির নয়। প্রতিদিন চট্টগ্রাম শহরে ছিনতাই ও ডাকাতি হওয়া মালামালও এখানে এনে বিক্রি করা হয়। বিত্তবান ঘরের মাদকাসক্ত ছেলেরা নেশার টাকা যোগাতে বাসার বিভিন্ন মালামাল এনেও বিক্রি করে দেয়। দোকানগুলোয় গিয়ে লক্ষ্য করা গেছে, মোবাইল, সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরসহ বৈদ্যুতিক ফ্যান, মোবাইল, ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, লাইটার প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে।
কোতোয়ালী থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার চোর মানিক জানায়, তাদের গ্রুপটি চুরির পরপরই স্টেশন রোড এলাকায় জনৈক টিপুর কাছে মালামাল বিক্রি করে থাকে। তার মতে, ছিনতাই-চুরির কাজে ভাসমান মানুষকে মদদ দিয়ে আসছে এই এলাকার চোরাই পণ্যের ক্রেতারা। স্টেশন রোড এলাকায় ভাসমান শিশু ও লোকজনদের টার্গেট করে প্রথমে মাদকে আসক্ত করানো হয়। এরপর মাদকের টাকা সংগ্রহে বাধ্য হয়ে ছিনতাই ও চুরি-ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়ে। সে নিজেও মাদকের টাকার জন্যই চুরি পেশায় জড়িয়েছে বলে জানায়।
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামান আজাদীকে বলেন, ধরা পড়া বেশ কয়েকজনকে জেরা করে ছিনতাইয়ের পেছনে মাদকের বিষয়টিই উঠে এসেছে। মাদক কিনতে টাকা জোগাড়ের জন্য বেশিরভাগ ছিনতাই হচ্ছে। একটা সময় চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার অদূরেই ছিল চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় মাদকের আখড়া বরিশাল কলোনি। এলাকাটি মূলত রেলওয়ের নিজস্ব জমি। সেটি উচ্ছেদ করার পরও মাদক ব্যবসা চলছিল। এ কলোনিতে রেলওয়ের কিছু সংখ্যক কর্মচারী বসবাস করেন। বসবাসকারী কর্মচারীরা তাদের বাসার আশপাশে অনেকগুলো খুপড়ি ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছিলেন। সেখানেই ছিল মাদকের আড্ডাখানা। বিস্তীর্ণ এ এলাকা অত্যন্ত নোংরা, ঘনবসতিপূর্ণ এবং ঝোঁপঝাড়ে পূর্ণ হওয়ায় এখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তেমন একটা আনাগোনা ছিল না। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এসব ঝোঁপের মাঝে মাটির নিচে লুকানো থাকতো আন্ডারগ্রাউন্ড পকেট বক্স। এসব বক্সে লুকিয়ে রাখা হত মদ, ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ নানান মাদকদ্রব্য। কিন্তু দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে এলাকা থেকে মাদক ব্যবসায়ীদের বিতাড়িত করেছে আইনশৃক্সখলা বাহিনী। কিন্তু নতুন করে চোরাই পণ্যের রমরমা ব্যবসার কারণে স্টেশন এলাকা আবারো অপরাধীদের দখলে চলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।

x