মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জনগণ চান নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ

মঙ্গলবার , ৩০ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
124

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। গত রোববার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।

মহেশখালীর মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নের ১৪১৪ একর জমিতে জাপান সরকারের সহযোগিতায় এবং জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। মাতারবাড়ির এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প। পাশাপাশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় যে বন্দর নির্মাণ করা হবে, পরে তাকে গভীর সমুদ্র বন্দরে রূপান্তরিত করা হবে। নতুন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠলে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে দেখা যায় ১৯৪৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত শাসককর্তারা মূলত প্রাইভেট সেক্টরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতেন যা ১৭টি প্রাদেশিক রাজ্যে সীমিত আকারে ব্যবহৃত হত। সর্বমোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল পর্যায়ক্রমে সর্বোচ্চ ১৭ মে::। পাবলিক সেক্টরে প্রথম বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয় ১৯৬০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জে (স্টীম টারবাইন)। পরবর্তী সময়ে একে একে আরও বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়। ১৯৬২ সালে ৪০ মে:: ক্ষমতা নিয়ে স্থাপিত হয় কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ। এর ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে ১৯৮৮ সালে দাঁড়ায় ২২০ মে::। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা বিবেচনা করলে ১৯৭০, ১৯৮০, ১৯৯০, ২০০০, ২০১১ এবং ২০১২ সালে ছিল যথাক্রমে ২২৫, ৬২৫, ১৮০৪, ৪০০৫, ৫৮০০, ৭৮১৪ এবং ৮০৯৯ মেগাওয়াট। এসময়ে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১১, ২০, ৭০, ১২০, ২১২ এবং ২১৫ কিলোওয়াট।

পরিসংখ্যানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০১৩ সালে ডিসেম্বরে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ২৩৩৯২৯ মেগাওয়াট। যা ছিল সমগ্র পৃথিবীর উৎপাদনের নিরিখে চতুর্থ। এ ছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টগুলোতেও তৈরি হয় ৩৪,৪৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। অনেক বড় বড় কারখানা, যেমন ইস্পাত বা সিমেন্ট তৈরির কারখানা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজনে নিজেদের কারখানার চৌহদ্দির মধ্যেই ছোট পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র খোলে। এগুলোকেই বলা হয়ে থাকে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট। এগুলো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। পুনর্নবীকরণযোগ্য নয় অর্থাৎ কয়লা, গ্যাস প্রভৃতি তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ক্ষমতা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ৮৭.৫৫ শতাংশ। অন্য দিকে পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা মোট উৎপাদন ক্ষমতার ১২.৪৫ শতাংশ। এই পুনর্নবীকরণযোগ্য বলতে বোঝানো হচ্ছে অপ্রচলিত বিদ্যুৎ শক্তি যেমন সৌরবিদ্যুৎ বায়ুবিদ্যুৎ বা ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ছোট ছোট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ২০১২১৩ অর্থবর্ষে দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ৯১১ বিলিয়ন ইউনিট। এই হিসাবের মধ্যে অবশ্য পুনর্নবীকরণযোগ্য বিদ্যুৎ এবং ক্যাপটিভ প্লান্টগুলিতেও উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্তর্ভুক্ত নয়। জ্বালানি বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ৫৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎতের ৯ শতাংশ। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ শতাংশ এবং অপ্রচলিত শক্তির উৎপাদন ক্ষমতা ৯ শতাংশ।

আর প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পাওয়া যায় সাম্প্রতিক তথ্য। তিনি বলেছেন, ২০০১ সালে আমরা ৪ হাজার ৩শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশে রেখে যাই আর ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় দেখি সে বিদ্যুৎ ৩ হাজার ২শ’ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। আর এখন দেশ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২০ সাল নাগাদ সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬,০০০ মেগাওয়াটেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তারপরও ২০২১ সালের মধ্যে ২৪,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতিহাস বলছে, পরিকল্পিত প্রকল্পের ৫০ ভাগ পর্যন্তই বাস্তবায়ন করতে পারে পিডিবি। এমনকি এই গতিতে এগুলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যায়। তাই পরিকল্পনায় সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা নির্ধারণ করা হয় গ্রাহক সংখ্যার ভিত্তিতে। এ পর্যন্ত বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা আড়াই কোটির বেশি দাবি করা হয় , দেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ এ মুহূর্তে বিদ্যুতের সুবিধার আওতায়। কিন্তু জনগণের মনে যে প্রশ্নটি বারবার ঘোরে, সেটি হলো, সরাসরি কত মানুষ বিদ্যুৎ পান? আর যাঁরা পান, তাঁরা নিরবচ্ছিন্নভাবে পান কিনা!

x