মহামৃত্যুঞ্জয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

মঙ্গলবার , ১৭ মার্চ, ২০২০ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
32

ফুলের মতো পাখির মতো যে নাম জুড়ায় প্রাণ
নদীর মতো নিরবধি সে-নাম বহমান
প্রাণের চেয়েও প্রিয় যে নাম মুজিব রহমান।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। একটি ইতিহাস। একটি আদর্শ, চেতনা ও দর্শনের নাম। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। আজ ১৭ মার্চ তাঁর জন্মশতবার্ষিকী। একই সঙ্গে সরকারিভাবে দিবসটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের অবিসংবাদিত এই নেতা। তাঁর সাহসী ও আপসহীন নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হয়েই পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি জাতি।
বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব হল তিনি শুধু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের একজন স্বপ্নদ্রষ্টাই ছিলেন না, তিনি বাঙালি জাতিকে অনন্যসাধারণ ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে হাজার বছরের বাঙালি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আমরা জানি, এদেশের মানুষ দীর্ঘকাল থেকেই লড়াই করেছে স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতা ছিল বাঙালির দীর্ঘকালের স্বপ্ন। সেই অগ্নিযুগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। সেই বীর শহীদদের রক্তের মিলিত স্রোতধারাই স্বাধীন বাংলাদেশের রূপায়নে মিলিত শক্তি হয়ে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই মহান পথ প্রদর্শক, যিনি জাতিকে একটি অভীষ্ঠ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাঁর সঠিক নেতৃত্বে জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে। স্বাধীনতার ডাক তিনি দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ: ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, যার যা আছে, তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো; ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’। এসব অবিস্মরণীয় অমোঘ বাক্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি দেখতে পেয়েছিল আগামী দিনের আশা। আগামী দিনের দিশা। এরপর ২৫ মার্চ রাতে তিনি ঘোষণা করেন স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন সেই নেতা, যিনি প্রত্যেক বাঙালির চোখে স্বপ্ন এঁেক দিতে পেরেছিলেন। এই স্বাধীনতার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন। প্রতিটি কাজে তিনি দিয়েছিলেন সাহসিকতার পরিচয়। ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: ‘ইয়াহিয়া খান আমার ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন। আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। বাঙালিরা একবারই মরতে জানে। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতিস্বীকার করবো না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। তাদের আরো বলেছি, তোমরা মারলে ক্ষতি নেই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ো’। এই বাক্যটার ভিতর দিয়েই বোঝা যায় তিনি কত সাহসী ও আপসহীন ছিলেন। বোঝা যায়, দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাঁর কী পরিমাণ মমতা লুকিয়েছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গবন্ধুর আগে ও পরে বহু খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ এসেছেন; কিন্তু এমন করে কেউ বাঙালিকে জাগাতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বের সম্মোহনী শক্তির এক জাদুকরি স্পর্শে ঘুমন্ত ও পদাণত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। অতঃপর বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে পরাধীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করে তিনি এনে দিয়েছেন রক্তিম লাল-সবুজের পতাকা খচিত স্বাধীন সার্বভৌম এক বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ছিল তার অকৃত্রিম ভালোবাসা।
ড. মো. আমির হোসেন তাঁর এক লেখায় বলেছেন, শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গৌরবময় ও অবিস্মরণীয় দ্বিতীয় অধ্যায়। বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ও আত্মপরিচয় নির্মাণ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপাখ্যান। আদর্শ ও নীতিতে অটল অবিচল থেকে, মানুষের হৃদয়কে উজ্জীবিত করে তিনি সামাজিক শক্তির বিকাশ ঘটান। বাঙালির স্বপ্ন, ভাবনা, চেতনা ও লক্ষ্য ধারণ করে হয়ে ওঠেন জনগণের মুখপাত্র, বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষ, বিকাশ, ব্যাপ্তি, সফলতার মূল স্থপতি এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির অখণ্ডিত সত্তা ও শক্তির প্রতীক।
তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা কেবল বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলাদেশ’-এর অর্থ ব্যাপক। সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হলে অবশ্যই সোনার মানুষ তৈরি করা অতীব জরুরি।