মহাত্মা গান্ধী ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ

তপন চক্রবর্তী

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
44

বিশ্ব ইতিহাসে ক্রান্তদর্শী এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের বিশাল অবদান কখনো বিস্মৃত হওয়ার নয়। উভয়ের জন্ম উনিশ শতকের ছয়ের দশকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬১ সালে ও মোহনদাস করমচান্দ গান্ধী ১৮৬৯ সালে জন্মেছিলেন। বিশ্বকবি ভারতের স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। তাঁর দেহাবসান হয় ১৯৪১ সালে। ১৯৪৮ সালের ২রা অক্টোবর আততায়ীর বুলেটে মহাত্মা গান্ধির জীবনাবসান ঘটে।
বাংলাদেশ ২০১১ সালে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবর্ষ সাড়ম্বরে উদ্‌যাপন করে। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন ও গ্রন্থপ্রকাশের মাধ্যমে কবি ও তাঁর সৃষ্টিকর্মের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেছে। এই বছর গান্ধীজীর সার্ধশত জন্মবর্ষেও ভারত সহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তাঁকে ও তাঁর অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর নানা আয়োজন হচ্ছে। ১৯১৮ সালের ২ অক্টোবর তাঁর সার্ধশতজন্মবর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অসাধারণ অবদানকে স্মরণ করছে এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছে।
মহাত্মা গান্ধির জীবন কর্ম বহু চর্চিত। তাঁর অসাধারণ জীবনযাপন প্রণালি ও বিশাল কর্মকাণ্ড নিয়ে বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। পৃথিবীর নানা দেশে এখনও তাঁর ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নানা মিডিয়ায় আলোচনা, শ্রদ্ধা নিবেদন, স্মৃতিচারণ ইত্যাদি চলছে। বক্ষ্যমান নিবন্ধে আমি ভারতের দুই মহান ব্যক্তির পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও বিরোধ সম্পর্কে জানার চেষ্ঠা করেছি। বিষয়টি স্পর্শকাতর। আমার কোনো বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক, অবিবেচনাপ্রসূত ও ভ্রমাত্মক হলে অনুগ্রহ করে আমার অজ্ঞতা ক্ষমা করবেন এবং ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ দিয়ে আমাকে বাধিত করবেন।
ঠাকুর ও গান্ধিজীর পারস্পরিক বন্ধুত্ব খুবই গভীর ছিল। উভয়ের গুণমুগ্ধ ইংরেজ পাদরি, মিশনারি, সমাজ সংস্কারক ও মহাত্মা-বিশ্বকবির ঘনিষ্ট বন্ধু পাদরি সি. এফ. এন্ড্রুজ বলেছিলেন বিশ্বকবি আধুনিক আর গান্ধিজী দ্বাদশ শতকের উদারপন্থী বিশপ সেন্ট ফ্রান্সিস অ্যাসিসি। উল্লেখ্য যে, গান্ধিজী আফ্রিকায় যখন কালো চামড়ার মানুষের ভোটাধিকার সহ সকল প্রকারের অধিকার আদায়ে নির্যাতন, ঘৃণা তুচ্ছ করে লড়াই করে সফল হচ্ছিলেন, তখন গোপাল কৃষ্ণ গোখেলে ১৯১৫ সালে সি. এফ. এন্ড্রুজ মারফত গান্ধিজীকে ভারতে এসে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। রবীন্দ্রনাথও আফ্রিকায় গান্ধিজীর বিশাল কর্মযজ্ঞের ব্যাপারে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন। তিনি পিয়ারসন ও এন্ড্রুজের মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন ও আশিস জানিয়েছিলেন।
গান্ধিজী তাঁর পারিষদবর্গ সহ ভারতে ফিরেই প্রথমে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন আশ্রমে ওঠেন এবং আশ্রমে প্রায় এক মাস (কারো মতে ৭দিন) সময় কাটান। ১৯১৪ সালে আফ্রিকায় গান্ধিজীর গুণমুগ্ধ ভক্ত ও সাথীরাও তাঁকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দান করেছিলেন জানা যায়। ভারতে বিশ্বকবিই প্রথম তাঁকে ‘মহাত্মা’ সম্বোধন করে তিনি যে কতো বড় মাপের মানুষ তা ভারতবাসীকে জানিয়ে দেন। গান্ধিজীও কবিকে ‘গুরুদেব’-এর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন।
বাহুল্য বলা যে, ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান লক্ষ্যে গান্ধিজী অনুসৃত রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজ সংস্কারের প্রশ্নে বিশ্বকবি প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছিলেন। এতদসত্বেও উভয়ের মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধুত্ব ও পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য ও প্রীতি জীবনভর বজায় ছিল। এই দুই মহান ব্যক্তির জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করে আমরা এই সত্যে পৌঁছাই যে, তাঁদের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা নিখাদ ছিল এবং উভয়ের কেউ আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন না। উভয়েরই ধ্যানধারণা ভারতের মুক্তি। কিন্তু উভয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে পরস্পর ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করেছিলেন। ১৯১৫ সালে মহাত্মার সঙ্গে গুরুদেবের সাক্ষাতের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে উভয়ের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলেছিল।
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে গান্ধিজীর অবস্থান আকাশ-ছোঁয়া।তাঁর কর্মধারায় বোঝা যাচ্ছিল তিনি দেশীয় জাতীয়তাবাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথও একজন বিশ্ববন্দিত কবি। তিনি স্থানীয় বিখ্যাত ‘মডার্ন রিভিউ’ সাময়িকীর ১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায়, মহাত্মার চরকা আন্দোলনকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি এই সূত্রে গান্ধিজীর অসহযোগ আন্দোলন, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের আদর্শকেও আঘাত করেন। বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে পরস্পরের মধ্যে অসহযোগ আন্দোলন, চরকার গুরুত্ব, স্বরাজ, বিজ্ঞান ও কুসংস্কার নিয়ে মতদ্বৈততা ছিল। পূর্বেও বলেছি, পরস্পরের মতের অমিল থাকলেও ব্যক্তি সম্পর্কে এর প্রভাব পড়েনি। ১৯২০ সালে গুজরাটের বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলনে গান্ধিজীই রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভে অসহযোগ আন্দেলন কোনো কার্যকর সমাধান বলে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন না। তিনি গান্ধিজীর ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি ও উর্দু করার প্রস্তাবেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কবির মতে, দক্ষিণ ভারতের মানুষরা এতে সমস্যায় পড়বেন। এই প্রসঙ্গে গান্ধিজী কবির, নানক, শিবাজীকে রাজা রামমোহন রায় ও বাল গঙ্গাধর তিলকের চেয়ে মহত্তর বলাতেও কবি প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন মহাত্মার এই নীতি এক ধরনের মারাত্মক আত্মশ্লাঘা যা কোনো কোনো মহৎ মানুষের মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু রাওলাট অ্যাক্ট পাশ হলে কবি আবার গান্ধির পাশে এসে দাঁড়ান।
১৯১৯ সালের ১০ মার্চ দিল্লি বৃটিশ আইনসভা তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সিডনী রাওলাটের নেতৃত্বে গঠিত সুপারিশ অনুসারে যে বিধান পাশ করা হয় এর নাম রাওলাট অ্যাক্ট নামে পরিচিত। অ্যাক্ট অনুসারে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সন্দেহে যে কানো ব্যক্তিকে, আন্দোলন সংঘটক বা আন্দোলনকারীকে বিনা বিচারে দুই বছর কারাবাসের দণ্ড দেয়া যেতো। ভারতীয়রা একে কালাকানুন আখ্যায়িত করে এবং এর বিরুদ্ধে ভারতে আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। মহাত্মা গান্ধি রাওল্যাক্ট অ্যাক্টের তীব্র প্রতিবাদ করেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁর সমর্থন করেন। ১৯১৯ সালের ৮ এপ্রিল গান্ধিজীকে বন্দি করে সাত বছরের কারাবাসের দণ্ড দেওয়া হয়। এতে আন্দোলন আরও তুঙ্গে ওঠে। পাঞ্জাবে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠলে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল, জেনারেল ডায়ার্স পাঞ্জাবের অমৃতসরে নৃশংসভাবে অসংখ্য মানুষ হত্যা করে। এতে সমগ্র ভারতর্ষের মানুষ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। নির্বিচার এই গণহত্যার প্রতিবাদে বিশ্বকবি বৃটিশরাজ প্রদত্ত নাইট উপাধি বর্জন করেন। কারাবন্দি গান্ধিজীকে খোলা চিঠির মাধ্যমে কবি জানান, গান্ধিজীর নেতৃত্বেই ভারতের মুক্তি ঘটবে।
মহাত্মা গান্ধি ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। তখন কবি ভারতের বাইরে ছিলেন। তিনি ভারতে ফিরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিখ্যাত ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনকে আক্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভাষণের শিরোনাম দিয়েছিলেন সত্যাগ্রহম বা সত্যের আহ্বান। তিনি অসহযোগ আন্দোলনকে রাজনৈতিক সন্ন্যাস বলে পরিহাস করেন। তাঁর মতে, অসহযোগের পরিবর্তে পৃথিবীর মানুষকে সহযোগিতাদান আবশ্যক। তিনি আরও লিখেন যে, অসহযোগ সত্যকে আহত করে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মিলনে ভালোবাসাই হলো চূড়ান্ত সত্য।
কবি জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের মধ্যেও তফাৎ দেখতে পান। গান্ধি জাতীয়তাবাদী ছিলেন। ঠাকুরের বক্তব্য হলো জাতীয়দাবাদীরা সবসময় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে নীতিভ্রষ্টতার পথে চলেন। বিদেশী কাপড় পোড়ানো আত্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ। গান্ধি জবাবে বলেন যে, জাতীয়তাবাদী না হলে কেউ আন্তর্জাতিকতাবাদী হতে পারেন না। গান্ধিজীর বন্ধু সি. এফ এন্ড্রুজও কিন্তু কবির বক্তব্য সমর্থন করেন। তাঁদের ধারণা হয়েছিল যে, এতে জনগণের মধ্যে ঘৃণা ও বিশৃঙ্খলার মনোভাব সৃষ্টি করবে।
গান্ধি কবির সমালোচনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘কবির উদ্বেগ’ শীর্ষক এক নিবন্ধ লিখেন। এতে তিনি ঠাকুরের রচনার প্রশংসা করে বলেন যে, এশিয়ার কবি তাঁর কাব্যিক ব্যখ্যার মাধ্যমে ভারতের সেবা করেছেন। ভারত ভুল পথে পা ফেলছে ভেবে কবি উৎকন্ঠিত। কবিকে অভয় দিচ্ছি আমরা বিচ্ছিন্নতা, হীনমন্যতা ও সংকীর্ণতার পথে অগ্রসর হচ্ছি না। আমার কার্যক্রম কবির কাছে নেতিবাচক ও হতাশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছে। তিনি লিখেন “কবি ভাবছেন অসহযোগ যেনো ভারত ও পাশ্চাত্যের মধ্যে চীনের দেয়াল। কবির সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ঐচ্ছিক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর অসহযোগ আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত। অজ্ঞাতসারে ও অনিচ্ছায় অসতের যোগসাজশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলো অসহযোগ।”
শিক্ষার্থীরা স্কুল ত্যাগ করে অসহযোগে যোগ দেওয়ায় কবি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। শিক্ষার্থীরা সরকারি স্কুল বর্জন করে অসহযোগে সামিল হওয়ায় তিনি কঠোর ভাষায় গান্ধিজীর সমালোচনা করেন। গান্ধি উত্তরে বলেন যে, তিনি নিশ্চিত যে, সরকারি স্কুল শিক্ষার্থীদেরকে অশালীন আচরণ শিক্ষা দিচ্ছে। তাঁরা আমাদের মনে অতৃপ্তি ছড়াচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীকে তাঁদের কাজে লাগাবার স্বার্থে কেরানি ও দোভাষী তৈরি করছেন। তাঁরা সবসময় আমাদেরকে দাস হিসাবেই দেখতে চান। আমাদের শিক্ষার্থীদের তাঁদের স্কুলে পাঠানো পাপ মনে করি। আমাদের অসহযোগ মানে সরকারকে আমন্ত্রণ জানানো যাতে আমাদের শর্তে আমরা তাঁদেরকে সহযোগিতা দান করতে পারি। প্রতি জাতির এই অধিকার রয়েছে। সরকারেরও এই ব্যাপারে দায়িত্ব রয়েছে। কবি ও মহাত্মার যুক্তি- প্রতিযুক্তি যথাক্রমে ‘মডার্ন বিভিউ ’ ও ‘ইয়ং ইন্ডিয়ায় ছাপা হয়েছিল।
কবির ‘সত্যের আহ্বান’ শীর্ষক বক্তৃতা ‘১৯২১ সালের ‘মডার্ন রিভিউতে প্রকাশিত হয়েছিল। কবি প্রবন্ধে তিনি আরও লিখেছিলেন যে, সকল মানুষ পরিবেশের পরজীবী। তাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি প্রকৃতির কাছে নিবেদিত। ঠাকুর যুক্তি দিয়ে বলেন, মানুষ তার অন্তরে স্বাধীনতা উপভোগ করে। ফলে এই মানুষের জন্য কিছুই অসাধ্য নয়। প্রথমে তার অভ্যন্তরীণ পরিবেশে যদি সে স্বরাজ লাভ করতে না পারে, তবে, বাইরের পৃথিবী থেকেও সে স্বরাজ লাভে বঞ্চিত হবে। অনবরত প্রার্থনা, আবেদন ইত্যাদির বোঝা সৃষ্টির পরিবর্তে মানুষের অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা অধিকতর মূল্যবান। কবি সতর্ক করে বলেন যে, গান্ধিজী দেশকে ভালোবাসার পরিবর্তে বিদেশীদের ঘৃণা করতে শেখাচ্ছেন।
নানা উপায়ে অসহযোগ প্রদর্শন করা হয়েছিল। যেমন, নাগরিক আইন অমান্য আন্দোলন, লবন সত্যাগ্রহ, অনশন, স্বরাজ, বিদেশী কাপড় পোড়ানো, ও বিদেশী কাপড় পরার পরিবর্তে স্বহস্তে চরকায় বোনা স্বদেশী কাপড় পরা, হরতাল, সরকারের খাজনা দান বন্ধ করা ইত্যাদি। কবি গান্ধির এই সকল কর্মকাণ্ডকে সংকীর্ণতার পরিচায়ক বলতেন। কবি ‘সত্যের আহ্বান’ রচনায় এই সকল আন্দোলন বিদেশীদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির সহায়ক বলেছিলেন। উভয়ের হিতৈষী এন্ড্রুজও কাপড় পোড়ানোর ব্যাপারে কবিকে সমর্থন জানান। কবির বক্তব্য, “ যে কোনো প্রকারের ক্ষমতা প্রদর্শন অযৌক্তিক।” এটি ঘোড়ার গাড়ির মতো জনগণকে অন্ধভাবে টেনে নিয়ে চলে। তিনি কাপড় পোড়ানো ও চরকা চালানোকে সমালোচনা করে বলেছিলেন এতে আমরা ধ্বংসের দিকে যাবো এবং আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতির দ্বার রুদ্ধ হবে। তিনি আরো বলেন, “ স্বরাজ মানে কেবল স্বদেশী কাপড় নির্মাণে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া নয়। এর সত্যিকারের অবস্থান আমাদের হৃদয়ে, বহুগামী শক্তিসম্পন্ন মন, এর নিজের জন্য স্বরাজ নির্মাণ করতে থাকে।” কবি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, তিনি আমি বিদেশী কাপড় পোড়ানোর আদেশ মানি না, কারণ অন্ধভাবে মানার বিরুদ্ধে আমি কঠিন সংগ্রাম করি। দ্বিতীয়ত, যে কাপড় পোড়াচ্ছি তা আমার নিজের নয়, এইগুলো যাদের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রয়োজন তাদের। আমি উদোম শরীর দেখতে পারি না। কাপড়ের অভাবে আমদের মা-বোনেরা ঘরের বাইরে যেতে পারে না। তারা গৃহবন্দি। দেশসমূহের মধ্যে স্বৈরতন্ত্র, বিশৃঙ্খলা ও ঘৃণার জন্ম দেওয়ার জন্যই অসহযোগ ও খাদি আন্দোলন বলে কবি এই সবের তীব্র সমালেচনা করেন। ‘সত্যের আহ্বান’-এ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতার কথা বলে তিনি পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে ভারতকে বিশাল পরিধির মধ্যে দেখার বাসনা ব্যক্ত করেন। তিনি ‘সত্যের আহ্বান’-এ বিশ্বমানবতার জরুরি আহ্বানেরও জবাব পেতে আগ্রহী ছিলেন। কবি-মহাত্মার বিরোধের মূল ভিত্তি হলো স্বরাজের দুটি বিষয় । কবির বক্তব্য ভারত এমন এক নেতা নির্বচন করতে চায়, যিনি ভারতকে ধ্বংসের পথে নয়, বিকাশের পথে নিয়ে যেতে পারবেন। কারণ ভারতবাসী কোনো লক্ষ্য না জেনে তাঁকে অন্ধভাবে অনুসরণ করবে। কবি আরও বলেন যে, মহাত্মাজীর শিক্ষা আন্তর্জাতিকতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং তিনি পাশ্চাত্য জগতের অগ্রগতি বিষয়ে সম্যক অবহিত না হয়ে ভারতের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন।
১৯২১ সালের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’য় গান্ধিজী কবির ‘সত্যের আহ্বানে’-এর জবাবে ‘অতন্দ্র প্রহরী’ প্রবন্ধে কবির চরকা সমালোচনা এবং এর বিরুদ্ধে দৃঢ় বিদ্রোহ ও জনগণের অন্ধভাবে তাঁর নেতৃত্ব অনুসরণ ইত্যাদি বক্তব্যের প্রশংসা করেন। গান্ধিজীর মতে, সত্যিকারের ঘটনা হলো শিক্ষিত জনগণ চরকায় সূতা কাটা ও কাপড় বুননের অন্তর্নিহিত সত্য অনুধাবন করতে পারেননি। ঠাকুর যেমন, অতন্দ্র প্রহরীর মতো জনগণকে অসহিষ্ণু না হয়ে তাঁদের ধৈর্যধারণের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে গান্ধির ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা ও অজ্ঞতা সম্বন্ধে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন। গান্ধি তাঁর প্রবন্ধে সংযতভাবে ঠাকুরের প্রতিটি বক্তব্যের জবাব দেন। গান্ধি বিশ্বাস করতেন যে চরকা প্রচুর সাহায্য করতে পারে। চরকা দর্শনের প্রেক্ষাপটে তিনি এই সত্য তুলে ধরেছেন যে, ভারত নামের ঘরটি আগুনের ওপর বসে আছে, এতে মানুষ নিত্যদিন ঝলসে যাচ্ছে। মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় মরছে, মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। গান্ধির দৃষ্টিতে শুধু শহর নিয়ে ভারত নয়, ভারতে সাত হাজার পাঁচশ গ্রাম রয়েছে। ভারত দিন দিন দরিদ্র হচ্ছে। যদি আমরা সেদিকে দৃষ্টি না দেই, পুরো ভারত ধ্বংস হয়ে যাবে।
গান্ধি বলেন, ঠাকুর তাঁর স্বসৃষ্ট জগতে স্বীয় আদর্শে অবিসংবাদী চিন্তাবিদ, আর আমি কারো উদ্ভাবিত চরকা নামক যন্ত্রের দাস। কবি একজন সৃৃষ্টিশীল মানুষ। তিনি সৃষ্টি করেন, ধ্বংস করেন, আবার সৃষ্টি করেন। আমি একজন অভিযাত্রী হয়ে এক সৃষ্টি আবিষ্কার করেছি এবং তাতেই লেগে আছি। কবির ভাবনা চরকা জাতির জন্য এক মৃত্যুবাণ। প্রকৃত সত্য হলো চরকা আমাকে অপরিহার্যভাবে একজন রাজপুত্রের মহিমায় অভিষিক্ত করেছে। একজন চাষা ও রাজপুত্রের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। চরকা আমাকে শ্রমের মর্যাদা দান করেছে। কবি কেবল ‘সত্যের আহ্বান’-এ নয়, ‘চরকা স্তুতি’-তেও প্রশ্ন তুলেছেন। কবির প্রশ্ন, আমি কেনো সংকীর্ণভাবে বার বার সূতা কাটা ও কাপড় বোনার কথা বলছি। তাঁর আরও অভিযোগ আমি কেনো দেশের সকল শক্তিকে একত্রিত করে কাজে নামছি না! প্রতিবেশী শস্যভাণ্ডরের মালিককে গ্রাহকের অভাবে উপোসে রেখে বিদেশী কাপড় পরা ও আমেরিকার গম খাওয়াকে আমি পাপ মনে করি। আমার এই পাপ ধুয়ে ফেলার জন্য বিদেশী কাপড়কে পুড়িয়ে উদোম শরীরকে চরকায় তোলা সূতা দিয়ে বোনা কাপড় দিয়ে ঢাকতে চাই। আমার দেশে নগ্ন মানুষকে কাপড় দেওয়ার পরিবর্তে কাজ দেওয়া অবশ্যই শ্রেয় মনে করি। তাদের জন্য কাজের সংস্থান খুব প্রয়োজন। নগ্ন দেহ না ঢেকে অপরিহার্য কাজের সংস্থানকেও আমি পাপ মনে করি, যা আমি করতে পারি না।
গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির যে সংঘাত হয়েছিল তাও স্মর্তব্য। ১৯৩৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিহারে প্রবল ভূমিকম্প হয়। তখন তিনি ‘অস্পৃশ্য’-দের নিয়ে কর্মরত ছিলেন। গান্ধিজী একে দেবতার অভিশাপ গণ্য করেন। কবি ক্রোধভরে গান্ধির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করেন। গান্ধিজী মনে করতেন আধুনিক বিজ্ঞান মানবতাকে ধ্বংস করছে। কেবল কবি নন, জওয়াহেরলাল নেহেরু ও সি. এফ এন্ড্রুজও বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান না করে গান্ধিজীর সবকিছুকে ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাকে সমালোচনা করেন।
আমি আলোচনার শুরুতে পরস্পরের মধ্যে কী পরিমাণ সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্ব ছিল তা উল্লেখ করেছি। এক অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যে ছিলেন তা তাঁদের বাচনভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছিল। ইহুদি-আমেরিকান সাংবাদিক, মহাত্মা গান্ধির জীবনীকার ও গ্রন্থকার লুই ফিশার বলেছিলেন যে দুইজনের প্রকুতির মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে। তাঁর মতে, “ গান্ধি হলেন গম ক্ষেত আর ঠাকুর হলেন ফুলের বাগান।”
দুইজনই বিরাট মাপের ব্যক্তিত্ব। উভয়েই দেশের সঙ্গলের জন্য নিবেদিত ছিলেন। কবি কল্পচিন্তক আর মহাত্মা অনুচিন্তক। উভয়েই সত্য, শিব ও সুন্দরের পূজারী। কবি বিশ্বজনীনতা ও মানবতার জন্য উৎসারিত সঙ্গীতের জন্য পরিচিত ছিলেন। যে সঙ্গীত স্বদেশী আন্দেলনকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মহাত্মাও এই সকল সঙ্গীত শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। .
ফ্রান্সের মহান দার্শনিক ও ঔপন্যাসিক রোমা রোঁলা এই দুই মহামানবের মধ্যেকার ভাব বিনিময়কে বলেন, “মহান বিতর্ক”। তিনি আরও বলেন, তাঁদের বিতর্ক,
“বসনৎধপবং ঃযব যিড়ষব বধৎঃয, ধহফ ঃযব যিড়ষব যঁসধহরঃু লড়রহং রহ ঃযরং ধঁমঁংঃ ফরংঢ়ঁঃবচ আলোচনার প্রথম ভাগে উল্লেখ করেছি মহাত্মা গান্ধি ও গুরুদেবের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ সত্বেও তাঁরা শিষ্টাচারের লক্ষ্মণরেখা কখনো অতিক্রম করেননি। কারণ পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে কিন্তু উভয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য ভারতকে পরাধীনতার জিঞ্জির থেকে মুক্ত করা। গান্ধিজী ও গুরুদেবের সম্পর্ক সম্বন্ধে মহাত্মাজী ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’র ১৯২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় লিখেছিলেন, “ আমি অনেক বিষয়ে কবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করিনি। কোনো দ্বিমত না থাকাটাই বিস্ময়ের…। প্রকৃতপক্ষে আমাদের পরস্পরের বন্ধুত্ব সবসময় সমৃদ্ধ, তবে বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে সত্যিই তফাৎ ছিল।”
উভয়ের সম্পর্কের গভীরতা কোন পর্যায়ে ছিল তা নিচের কয়টি চিঠি থেকে বোঝা যায়।
আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে গান্ধিজী ১৯৩২ সালের ৩ জানুয়ারি বম্বের (বর্তমান মুম্বাই) ল্যবারনাম রোড থেকে কবিকে লিখছেন, ্তুউবধৎ এঁৎঁফবা, ও ধস লঁংঃ ংঃৎবঃপযরহম সু ঃরৎবফ ষরসনং ড়হ ঃযব সধঃঃৎবংং ধহফ ধং ও ঃৎু ঃড় ংঃবধষ ধ রিহশ ড়ভ ংষববঢ়, ও ঃযরহশ ড়ভ ুড়ঁ. ও ধিহঃ ুড়ঁ ঃড় মরাব ুড়ঁৎ নবংঃ ঃড় ঃযব ংধপৎরভরপরধষ ভরৎব ঃযধঃ রং নবরহম ষরমযঃবফ. ডরঃয ষড়াব গক এধহফযর্থ চিঠিখানা ্তুঞযব চড়বঃ ধহফ ঃযব ঈযধৎশযধ্থ শিরোনামে ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’র ১৯২৫ নভেম্‌র সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের কোনো এক তারিখে গুরুদের অসুস্থ থাকাকালীন সময়ে, ৬ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, কলিকাতা থেকে গান্ধিজীকে লিখেন, গধযধঃসধ এধহফযর, ডধৎফযধণড়ঁৎ পড়হংঃধহঃ মড়ড়ফ রিংযবং যধাব নৎড়ঁমযঃ সব নধপশ ভৎড়স ফরব ষধহফ ড়ভ ফধৎশহবংং রহঃড় ঃযব ষধহফ ড়ভ ষরমযঃ ধহফ ষরভব ধহফ সু ভরৎংঃ ড়ভভবৎরহম ড়ভ ঃযধহশং মড়বং ড়ঁঃ ঃড় ুড়ঁ. জধনরহফৎধহধঃয গান্ধিজী ১৯৪১ সালের ১৩ এপ্রিল তার যোগে কবির জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেন, ্তুএঁৎঁফবা, ঝযধহঃরহরশবঃধহ ঋড়ঁৎ ংপড়ৎব হড়ঃ বহড়ঁময সধু ুড়ঁ ভরহরংয ভরাব. খড়াব এধহফযর্থ ঠাকুর উত্তরে মহাত্মাজীকে জানান, ্তুঞযধহশং সবংংধমব নঁঃ ভড়ঁৎ ংপড়ৎব রং রসঢ়বৎঃরহবহপব, ভরাব ংপড়ৎব রহঃড়ষবৎধনষব. জধনরহফৎধহধঃয্থ গান্ধিজীর ডান হাত অচল হলে তিনি কষ্ট করে ওয়ার্দা আশ্রম থেকে ১৯৩৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কবিকে লিখেছিলেন, ্তুউবধৎ এঁৎঁফবা, ণড়ঁৎ ঢ়ৎবপরড়ঁং ষবঃঃবৎ রং নবভড়ৎব সব. ণড়ঁ যধাব ধহঃরপরঢ়ধঃবফ সব. ও ধিহঃবফ ঃড় ৎিরঃব ধং ংড়ড়হ ধং ঝরৎ ঘরষৎধঃধহ ংবহঃ সব যরং ষধংঃ ৎবধংংঁৎরহম রিৎব. ইঁঃ সু ৎরমযঃ যধহফ হববফং ৎবংঃ. ও ফরফ হড়ঃ ধিহঃ ঃড় ফরপঃধঃব. ঞযব ষবভঃ যধহফ ড়িৎশং ংষড়.ি ঞযরং রং সবৎবষু ঃড় ংযড় িুড়ঁ যিধঃ ষড়াব ংড়সব ড়ভ ঁং নবধৎ ঃড়ধিৎফং ুড়ঁ. ও াবৎরষু নবষরবাব ঃযধঃ ঃযব ংরষবহঃ ঢ়ৎধুবৎং ভৎড়স ঃযব যবধৎঃং ড়ভ ুড়ঁৎ ধফসরৎবৎং যধাব নববহ যবধৎফ ধহফ ুড়ঁ ধৎব ংঃরষষ রিঃয ঁং. ণড়ঁ ধৎব হড়ঃ ধ সবৎব ংরহমবৎ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ. ণড়ঁৎ ষরারহম ড়িৎফ রং ধ মঁরফব ধহফ ধহ রহংঢ়রৎধঃরড়হ ঃড় ঃযড়ঁংধহফং. গধু ুড়ঁ নব ংঢ়ধৎবফ ভড়ৎ সধহু ধ ষড়হম ুবধৎ ুবঃ ঃড় পড়সব. ডরঃয ফববঢ় ষড়াব, ণড়ঁৎং ংরহপবৎবষু, গ.ক. এধহফযর্থ দুই বিশাল মাপের দুজন চিন্তাবিদ ও কর্মীর মধ্যে দেশপ্রেম, অসহযোগ, জাতীয়তাবাদ, স্বরাজ ও চরকা নিয়ে যে সহনশীল, শ্রদ্ধা-উদ্রেককর ও সৌজন্যমূলক আচরণ প্রদর্শিত হয়েছিল তাই স্বাধীনোত্তর উপমহাদেশের রাজনীতির ভিত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। দুর্ভাগ্য, বর্তমানে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সহনশীলতা বিসর্জিত হয়েছে। সেইসঙ্গে শিষ্টাচারও নির্বাসনে গেছে।

x