মহাজাগতিক বিস্ময়

রেজাউল করিম

১৫০ বছর পর

বুধবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
227

চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই। তারপরও চাঁদকে নিয়ে গানছড়াকবিতা লেখা হয়েছে অসংখ্য। ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ।’ চাঁদ কি বাঁশবাগানে থাকে! না মোটেও নয়।‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে।’ চাঁদ হাসেও না।‘চাঁদের খবর বলছি শোনো/ চাঁদেও আছে পানি/ মানুষ চাঁদে ঘর বাঁধবে বলেছে বিজ্ঞানী/ কিন্তু চাঁদের বুড়ি/ চড়কা দিয়ে সুতো কাটে এবং ওড়ায় ঘুড়ি/ সেই বুড়িটির খবর কি ভাই? আছে তোমার জানা?/ তার ঠিকানায় বিজ্ঞানীরা দিয়েছে কি হানা/ ছেলে ভুলানো গল্প ওসব, সত্যি কিছুই নয়/ দত্যি দানো পেত্নি বুড়ি রূপকথাতে হয়/ চাঁদে কোনো গাছপালা নেই/ নেই কোনো এক বুড়ি/ মিথ্যে কথা মিথ্যে কথা/ শুনবো না ধুত্তুরি/ চাঁদে আছে চড়কা বুড়ি এবং পরী/ পরীর ডানায় চড়কা বুড়ি রোজ মেখে দেয় জড়ি/ দাদু জানে মামা জানে আরো সবাই জানে/ বিজ্ঞানীরা শুধু শুধু মিথ্যে খবর আনে/ চাঁদে আছে চড়কা বুড়ি খুঁজলে পাবে ঠিক/ বিজ্ঞানীদের সাথে যদি পাঠায় সাংবাদিক।’

জোছনাবিলাসী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি থাকলে হয়তো আরো অনেক গান বা উপন্যাসই লিখে ফেলতেন। তাঁর প্রায় সৃষ্টিতে চাঁদকে নানাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। চাঁদকে নিয়ে এতো কথার কারণ হচ্ছে, আজ পৃথিবীবাসী উপভোগ করবে চন্দ্রগ্রহণ। তবে এটা কোনো সাধারণ গ্রহণ নয়। গত দেড়শ বছরের মধ্যে প্রথমবার হতে যাচ্ছে ‘সুপার ব্লু ব্লাড মুন’। সহজভাবে বলতে গেলে, এদিন পূর্ণ পূর্ণিমার আলো দেবে চাঁদ। তবে চিরাচরিত সাদা হবে চাঁদের সে জোছনার রঙ। পূর্ণ রক্তিম রঙে নিজেকে সেদিন রাঙিয়ে নেবে চাঁদ মামা। ‘আয় আয় চাঁদ মামা/ টিপ দিয়ে যা’।

বৈজ্ঞানিক ভাষায়, আজ সূর্যকে পুরোপুরি গ্রাস করবে চাঁদ। পৃথিবী আর সূর্যের মাঝে চাঁদ অবস্থান করবে এক সরলরেখায়। আর এতেই সূর্যের ‘কমলা’ আভায় নিজে রক্তিম হয়ে উঠবে চাঁদ। সূর্য এবং চাঁদের মাঝ দিয়ে পরিক্রমার সময় পৃথিবীর ছায়া পড়বে চাঁদের ওপর । আর তখনই দেখা যাবে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। এ এক বিস্ময়কর মহাজাগতিক দৃশ্য। বিজ্ঞানীদের মতে, এ সময় পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ, পাশাপাশি চাঁদকে স্বাভাবিকের তুলনায় আকারে প্রায় ১৫ ভাগ বড় এবং ৩০ ভাগ উজ্জ্বল ও লালচেকমলা দেখাবে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে সুপার ব্লু ব্লাড মুন এক্লিপস বলে। এদিন চাঁদ আসলে নীল নয়, লাল আভার মতো একটি জ্বলন্ত কমলা রঙের দৃশ্য চাঁদে উপস্থিত হবে বলে এর বৈজ্ঞানিক নামটি এরকম। চন্দ্রগ্রহণের সময় সূর্যের পরোক্ষ আলো চাঁদের ওপর পড়ার পর পৃথিবী বাযুমন্ডলের ভেতর দিয়ে তার পথ তৈরি করে। যেখানে বেশিরভাগ ছড়িয়ে থাকা নীল রঙের আলো ফিল্টার হয়। ফলে পৃথিবী থেকে চাঁদকে রক্ত লাল, গাঢ় বাদামি বা ধূসর রঙে দেখা যেতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বর্ষপঞ্জি অনুসারে এটি দ্বিতীয় সুপার মুন, যেটি পৃথিবীর খুব কাছে অবস্থান করবে। নাসার বৈজ্ঞানিক, আর্নেস্ট রাইটের মতে, ৩৫ বছর আগে এরকম ঘটনা ঘটেছিল। বৈজ্ঞানিক ফ্রেড এসপেনাক জানান, ১৯৮২ সালের ৩০ ডিসেম্বর আংশিক ব্লু সুপার মুন ও চন্দ্রগ্রহণের শেষ দেখা মেলে। কিন্তু পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ ও ব্লু সুপার মুন একসঙ্গে শেষ দেখা মেলে দেড়শ বছর আগে, ১৮৬৬ সালের ৩১ মার্চ। মধ্য ও পূর্ব এশিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা, ইন্দোনেশিয়া, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্র, আলাস্কা, উত্তর পশ্চিম কানাডা, ভারত এবং বাংলাদেশে এরকম দেখা যাবে।

চাঁদ নিয়ে যারা ঘাটাঘাটি করেন চাঁদের এই ‘রক্তাক্ত রূপ’ দেখতে নড়েচড়ে বসেছেন তারা। নড়েচড়ে না বসে উপায়ও নেই অবশ্য। পরবর্তী পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হবে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এরপর ২০৩৭ সালের ৩১ জানুয়ারি। তবে সে চন্দ্রগ্রহণগুলোও আজকের মত লাল হবে না। আর সে কারণেই দুনিয়াজুড়ে এত উৎসাহ উদ্দীপনা।

আবার চলতি বছরের ২৭ জুলাই, দ্বিতীয়বারের মতো মঙ্গলকেও দেখা যাবে জ্বলজ্বলে চেহারায়। পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ থাকবে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ। অনেকে বলবেন, এর আগেও পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ হয়েছে। কিন্তু তখন কেন এরকম লালচে দেখায়নি চাঁদকে। তার কারণ, এবারের পূর্ণগ্রাস হবে সুপার মুনে, যার অর্থ, এই দিন চাঁদ পৃথিবীর কক্ষপথের অনেকটাই কাছাকাছি আসবে, সে জন্য চাঁদকে আরও বড় এবং উজ্জ্বল দেখাবে। বেশি কাছাকাছি থাকায় পৃথিবীর মাটির প্রতিফলন হবে চাঁদের বুকে, যা চাঁদের রং পাল্টে লালচে করে দেবে। আর ব্লু মুনের অর্থ, যদি কোনো বছর ১২টার বদলে ১৩টা পূর্ণিমা হয় বা এক মাসে যদি দুবার পূর্ণিমা দেখা যায়, তাহলে সেই দ্বিতীয় পূর্ণিমাকে ব্লু মুন বলা হয়। এর সঙ্গে চাঁদের রং নীলচে হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। যেহেতু এবার জানুয়ারিতে দুটো পূর্ণিমা, তাই দ্বিতীয় পূর্ণিমা বা ব্লু মুনেই হবে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ।

x